NE UpdatesHappeningsBreaking News

রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য সাহিত্য সরস্বতী (১৮৭০–১৯৬৬): লিখেছেন সঞ্জীব দেবলস্কর

সঞ্জীব দেবলস্কর

রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য সাহিত্য সরস্বতী ছিলেন রবীন্দ্রভাবনায় উদ্বুদ্ধ এক বিশিষ্ট পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ এবং স্বদেশী কর্মী। ১৯২১-২২ সালটি সর্বভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে ছিল একটি মাইলফলক বিশেষ। মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত এ আন্দোলনের ঢেউ এসে পৌঁছেছিল গ্রাম কাছাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার অন্তর্গত কাশীপুর গ্রামের সুসন্তান রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য জাতীয় বিদ্যালয়ের স্বপ্ন নিয়ে ১৯২০ সালে এদিকে এসে শুরু করলেন ‘বড়খলা জাতীয় বিদ্যালয়’, যা ছিল তৎকালীন কাছাড়ের প্রথম জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রয়াস। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন-এর অধীনে এ সব বিদ্যালয়ের অবদান ছিল অপরিসীম।

গ্রামের তরুণ জমিদার যতীন্দ্রমোহন দেবলস্করের তিনি হয়ে উঠলেন অন্যতম অনুপ্রেরণা ও সংগ্রামী পরামর্শদাতা। এরই মাঝে কামিনীকুমার চন্দ এবং অন্যান্যদের উপস্থিতিতে বড়খলা রাজা স্কুলের মাঠে অসহযোগ এবং খিলাফৎ আন্দোলনের সভায় মুন্সি ওয়াজেদ আলী, তারাচরণ চৌধুরী এবং যতীন্দ্রমোহন অংশগ্রহণ করেন এবং তাদের আহ্বানে ১৪ জন ছাত্র বইখাতা নিয়ে স্কুল বর্জন করে আন্দোলনে সামিল হলে সারা গ্রাম উত্তাল হয়ে ওঠে। অতঃপর রমেশচন্দ্র, যতীন্দ্রমোহন এবং ইরমান মিঞা এবং অন্যান্যরা আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়লে ব্রিটিশ পুলিশ এই তিনজনকে বন্দি করে শিলচর জেল হাজতে প্রেরণ করে। কাছাড়ের জেলাধিপতি তথা ন্যায় দণ্ডাধীশের বিচারে তাঁদের ৫০০ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

কারাবাস কাটিয়ে রমেশচন্দ্র ভট্টচার্য সাহিত্য সরস্বতী কাছাড় জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। তাছাড়াও স্বদেশী শিল্পের প্রসারের জন্য দ্বিতীয়া পত্নী সুরবালা দেবীর সাহচর্যে তিনি ১৯২২ সালে শিলচরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নারী শিল্পাশ্রম’, যার উদ্দেশ্য ছিল নারীদের মধ্যে সূতাকাটা ও বস্ত্রবয়নের প্রসার ঘটানো। এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করেন যতীন্দ্রমোহন দেবলস্কর। শিলচরে জননেতা শ্যামাচরণ দেবের সহধর্মিণী সৌদামিনী দেবীকে এই আশ্রমের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সরকারি রোষানলে পড়ে, এবং ১৯২৩ সালের ২ জানুয়ারি শিলচর পার্ক রোডে অবস্থিত (বর্তমান রেডক্রস হাসপাতালের স্থানে) গোর্খা সেনার হামলায় নারীদের এ ‘শিল্পাশ্রম’ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। সেদিন আনন্দবাজার, জনশক্তি, সার্ভেন্ট প্রভৃতি পত্রিকায় এ প্রতিষ্ঠানের উপর পাশবিক অভিযানের কাহিনি বিস্তৃতভাবেই প্রকাশিত হয়।

রমেশচন্দ্র ছিলেন ভাষা ও সাহিত্যে অসাধারণ ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তি। তাঁর অন্যতম কীর্তি পদ্যছন্দে ‘ঋগ্বেদ সংহিতা’-র অনুবাদ যে কাজটি তিনি বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন পর্বেই করে এসেছিলেন। কবিগুরু ঠাকুরের প্রদত্ত ‘সাহিত্য সরস্বতী’ উপাধিটি সম্ভবত ওই সৃজনশীল কর্মেরই স্বীকৃতি। উল্লেখ্য, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসে আসাম বেঙ্গল রেললাইন দিয়ে সিলেট ভ্রমণে কয়েকদিন অবস্থান করেন।

রমেশচন্দ্র বড়খলায় অবস্থানকালে স্বদেশী ভাবধারার প্রচার, সাহিত্যচর্চা এবং জাতীয় বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছিলেন। কিন্তু কারাবরণের পর বিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডও আর পূর্বের গতিতে এগোতে পারেনি।

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে স্বাধীনতা সংগ্রামী যতীন্দ্রমোহন দেবলস্করের জ্যেষ্ঠ ভগ্নী ব্রহ্মময়ী রাহা ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রেরণা। তাঁর স্বদেশী গানেই অনুপ্রাণিত হয়ে যতীন্দ্রমোহনের স্বদেশমন্ত্রে দীক্ষা এবং পরবর্তী সংগ্রামী জীবনের সূচনা। ব্রহ্মময়ী রাহার মৃত্যুতে স্বাধীনতা সংগ্রামী হুরমৎ আলী বড়লস্কর সম্পাদিত ‘আজাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত শোকবার্তায় রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের প্রসঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই প্রসঙ্গের আরেকটি সূত্র ছিল করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘যুগশক্তি’ পত্রিকার ১৭ আগস্ট ১৯৬৬ সংখ্যায় প্রকাশিত রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের প্রয়াণ-নিবন্ধ।

কয়েক বছর কাছাড় জেলা কংগ্রেসের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে রমেশচন্দ্র চলে যান করিমগঞ্জের ব্রাহ্মণশাসন গ্রামে। সৌভাগ্যক্রমে ওই ব্রাহ্মণশাসন গ্রাম থেকে উদ্ধার হওয়া একটি আলোকচিত্রে রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের অবয়ব ও বেশভূষার একটি ধারণা পাওয়া যায়। মানসিকতায় যেমন তিনি ছিলেন রবীন্দ্রানুরাগী, তেমনি দীর্ঘ শ্মশ্রুগুম্ফ সমন্বিত মুখাবয়ব এবং রবীন্দ্রনাথ-অনুসৃত পোশাক-পরিচ্ছদ, আলখাল্লা ও ধুতি সেই অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।

রমেশচন্দ্রের নাম আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত। ১৯১৩ সালে কাছাড়-সুরমা উপত্যকার বিদ্বজ্জনদের উদ্যোগে লক্ষীপুর অঞ্চলের একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে যে স্বপ্নপ্রকল্প ‘ইউনিভার্সিটি অব বাঁশকান্দি’-র রূপরেখা প্রণীত হয়েছিল, তার নির্বাচিত সিন্ডিকেট সদস্যের  তালিকায় ফ্যাকাল্টি অব আর্টসের মধ্যে পণ্ডিত রমেশচন্দ্র সাহিত্য সরস্বতীর নামও ছিল। উল্লেখযোগ্য যে, এই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও নাম ছিল। কবিগুরু এই উদ্যোগে দ্য ক্র্যাডল সংস অব কাছাড় শীর্ষক একটি একটেনশন লেকচার  এবং একটি আশীর্বাদী কবিতা পাঠের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অনুমান করা যায়, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণেই এই উদ্যোগে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

( সূত্র, বিবেকানন্দ মোহন্ত, “স্বাধীনতা আন্দোলনে বড়খলা” , way2barak.com, 22 June, 2025; “উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঠাকুর পরিবার: প্রাক্‌ রবীন্দ্র থেকে রবীন্দ্রোত্তর পর্ব: ইতিহাসের সূত্র সংকেত” , আকাদেমি পত্রিকা, vol-IV, no. 4 বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, শিলচর ২০১১; হিমু লস্কর “ নির্বাসিত উপত্যকার স্বপ্ন বিপ্লব: ইউনিভার্সিটি অব বাঁশকান্দি: বরাকের বুকে নালান্দা গড়ার বিস্মৃত ইতিহাস” সাময়িক প্রসঙ্গ, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬; সঞ্জীব দেবলস্কর, ‘ষষ্ঠীতৎপুরুষনামা’, (উপন্যাস) সোপান, কলকাতা, ২০২৩, a Document on the University of Banskandi, 1923-24, Issued by Chancellor Rai Bipinchandra Dev Laskar Bahadur, MLC, Vice-Chancellor, Maulavi Rasid Ali Laskar, BA, BL, MLC, Academic Registrar Maulavi Arjan Ali, BA, BL, Registrar, Jogendranath Dutta, BA BL, recovered from the personal archive of AK Chanda, in his residence at Calcutta )

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker