Barak UpdatesHappeningsBreaking News
বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চের দাবি অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত, লিখেছেন চম্পক সাহা

// চম্পক সাহা //
বিচারপ্রাপ্তির অধিকার প্রতিটি নাগরিকের সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। কিন্তু স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর পেরিয়েও অসমের বরাক উপত্যকা ও ডিমা হাসাও জেলার মানুষদের জন্য এই অধিকার এক দূরূহ সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। মামলার শুনানির জন্য, আইনি পরামর্শের জন্য, ন্যায়বিচারের আশায় এই অঞ্চলের মানুষকে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে গুয়াহাটিতে যেতে হয়। এই ভৌগোলিক দূরত্ব, বিপুল অর্থব্যয় এবং শারীরিক ও মানসিক হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘদিন ধরে বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবিতে সরব স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্প্রতি এই দাবিকে আরও জোরদার ও গণমুখী করে তুলতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে ‘হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি বাস্তবায়ন কমিটি, কাছাড় জেলা কমিটি’। কমিটির উদ্যোগে উপত্যকার বিভিন্ন প্রান্তে লাগাতার সচেতনতা সভা ও গণস্বাক্ষর অভিযান চলছে। এই আন্দোলন আজ আর কেবল আইনজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে।
কমিটির চলমান কর্মসূচিগুলিতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী থেকে শুরু করে ছাত্র-যুব প্রতিনিধি, বিভিন্ন পেশার সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছেন।

সম্প্রতি আয়োজিত সচেতনতা সভাগুলিতে উপস্থিত থেকে আন্দোলনের ধার-ভার বাড়িয়েছেন বরিষ্ঠ আইনজীবী নীহারেন্দ্র নারায়ণ ঠাকুর, দুলাল মিত্র, প্রসেনজিৎ দেব, শান্তনু নায়েক, ধ্রুবকুমার সাহা, ধর্মানন্দ দেব, রজত ঘোষ, সুমিতা পোদ্দার, দেবমিতা চক্রবর্তী, তুহিনা শর্মা, টিংকু বৈদ্য প্রমুখ। উধারবন্দের বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা, সাময়িক প্রসঙ্গ পত্রিকার সম্পাদক তৈমুর রাজা চৌধুরী ও সাংবাদিক উত্তম কুমার সাহাও শামিল হয়েছেন এই আন্দোলনে। অংশ নিচ্ছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. বিভাস দেব, ড. সুমিত্রা ঘোষ, ক্ষৌণীশ চক্রবর্তী, সমাজকর্মী, রসরাজ দাস, মানস ভট্টাচার্য সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
তাঁরা একসুরে উল্লেখ করেন যে, বরাক উপত্যকায় হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার দাবি অত্যন্ত সময়োপযোগী, ন্যায়সঙ্গত এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। সংবিধান প্রদত্ত ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বরাকবাসীর এই লড়াই সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত।
‘হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি বাস্তবায়ন কমিটি’, কাছাড় জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট ধ্রুব কুমার সাহার বক্তব্যে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের বাস্তব দুর্ভোগের চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বরাক উপত্যকা এবং এনসি হিলসের প্রায় আটচল্লিশ লক্ষ মানুষের জন্য একটি স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ সময়ের দাবি। বিচার সংক্রান্ত অতি সাধারণ কাজেও মানুষকে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে গুয়াহাটি ছুটতে হয়। এতে একদিকে যেমন সময়, অর্থ ও শ্রমের চরম অপচয় ঘটে, অন্যদিকে অনেক দরিদ্র বিচারপ্রার্থী খরচের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মাঝপথেই আইনি লড়াই ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ফলে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আন্দোলনের মঞ্চ থেকে কেবল বর্তমান সমস্যার কথাই বলা হচ্ছে না, বরং উত্তর পূর্ব ভারতের বিচারব্যবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হচ্ছে। সচেতনতা সভাগুলিতে বক্তারা ব্রিটিশ আমলে ফোর্ট উইলিয়াম কোর্ট’ প্রতিষ্ঠা, পরবর্তীতে শিলংয়ে উচ্চ আদালতের কার্যক্রমের সূচনা, এবং স্বাধীনোত্তর কালে গৌহাটি হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা সহ সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চলে বিচার ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সময়ের প্রয়োজনে এবং জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে বিচারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ ও নতুন বেঞ্চ গঠন এই দেশে সবসময়ই হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে জনসংখ্যার অনুপাতে একাধিক হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হলেও, বরাক উপত্যকার এই দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবিটি উপেক্ষিত রয়ে গেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক।
আন্দোলনের উদ্যোক্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই আন্দোলন কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চালিত নয়। এটি কোনও নির্দিষ্ট দলের বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার লড়াই নয়। এটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, গণমুখী এবং জনস্বার্থমূলক দাবি। এটি বরাক উপত্যকার মানুষের বেঁচে থাকার এবং সমঅধিকার পাওয়ার লড়াই।
একথা আজ আর নতুন করে উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না যে, গুয়াহাটির সঙ্গে বরাক উপত্যকার যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্গম ও সময় সাপেক্ষ। তাই বরাক ও ডিমা হাসাও জেলার প্রায় ৪৮ লক্ষ মানুষের জন্য আইনি সহায়তার একটি কেন্দ্র প্রয়োজন। গৌহাটি হাইকোর্টে এই অঞ্চল থেকে যাওয়া মামলার সংখ্যা বিপুল, সেসবের দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। বেঞ্চ স্থাপন করা হলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত বিচার প্রার্থীদের আইনি খরচ বহু কমে যাবে।
বরাক উপত্যকার মানুষের দীর্ঘদিনের এই বঞ্চনার অবসান ঘটানোর সময় এবার এসেছে। বর্তমান সচেতনতা সভা ও গণস্বাক্ষর অভিযান সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। উপত্যকার সর্বস্তরের মানুষের এই ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, ব্যাপক গণসমর্থন এবং ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমেই এই ন্যায্য দাবি একদিন অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। হাইকোর্ট, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আর কালক্ষেপ না করে এই গণদাবিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন, এটাই আজ সমগ্র উপত্যকাবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।


