NE UpdatesHappeningsBreaking News
৮৩-র দাঙ্গা: চার দশক আগেও অনুপ্রবেশকেই দায়ী করেছিলেন তিওয়ারি

ওয়েটুবরাক, ২৫ নভেম্বর : অসম বিধানসভার শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই পেশ হল ১৯৮৩ দাঙ্গার প্রেক্ষিতে তখনকার সময়ে গঠিত টিপি তিওয়ারি কমিশনের রিপোর্ট৷ একইসঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে বেসরকারি তথা মুক্তি যুঝারু সম্মিলন দ্বারা গঠিত টিইউ মেহতা কমিশনের রিপোর্টও৷
১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত অনুপ্রবেশ বিরোধী আন্দোলনে যত হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে, এ সবের মধ্যে বীভৎসতম হল নেলির গণহত্যা৷ ১৯৮৩ সালে নেলিতে এক রাতে ২১০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল৷
মঙ্গলবার তিওয়ারি কমিশনের রিপোর্ট বিধায়কদের মধ্যে বিতরণ করা হলেও মেহতার রিপোর্ট শুধু অধ্যক্ষের কাছে পেশ করা হয়৷ ১৯৮৩ সালের ১৪ জুলাই গঠিত হয়েছিল অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার টিপি তিওয়ারির কমিশন৷ পরের বছরের মে মাসে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের কাছে তিনি এই রিপোর্ট পেশও করেছিলেন৷ তবে তা বিধানসভায় পেশ হতে সময় লাগে আরও তিন বছর৷ ১৯৮৭ সালে অগপ সরকার সেটি বিধানসভায় জমা করেছিলেন৷
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এ বার জানান, ওই রিপোর্টের কোনও কপি কোনও বিধায়কের কাছে নেই৷ ওই প্রেক্ষিতেই তাঁর মন্ত্রিসভা রিপোর্টের কপি সকল বিধায়কদের বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়৷ তবে সরকারি-বেসরকারি কোনও রিপোর্ট নিয়েই এ দিন বিধানসভায় কোনও আলোচনা হয়নি৷
কী রয়েছে তিওয়ারি কমিশনের ৪২ বছরের পুরনো রিপোর্টে? ৫৫১ পাতা জুড়ে নেলি গণহত্যা সহ সে সময়কার ব্যাপক হিংসাকে বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করে শেষ অধ্যায়ে উপসংহারে তিওয়ারি বলেন, এই সব ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অনুপ্রবেশ ও ভাষা বিতর্ক৷ কয়েক দশক ধরে এগুলো মানুষের মনে আন্দোলিত হচ্ছিল৷ অতীতের নানা ঘটনার প্রেক্ষিতেই তা ব্যাপক হিংসাত্মক রূপ নেয়৷ ১৯৫০, ১৯৫৪, ১৯৬০, ১৯৬৮, ১৯৭২, ১৯৭৭ থেকে প্রতি বছর হিংসার ঘটনা ঘটেছে৷ ফলে নির্বাচনের বিরোধিতা করে আন্দোলন সংগঠিত করার সূত্রে এতসব ঘটলেও নির্বাচনকে সে জন্য দায়ী করতে নারাজ তিওয়ারি কমিশন৷ রিপোর্টে আসু এবং এএজিএসপি-কে দায়ী করে বলা হয়েছে, এরাই নির্বাচনের বিরোধিতা করে দাঙ্গা হাঙ্গামা করেছে৷ দালানবাড়ি, সেতু, সড়ক, রেলট্র্যাকের মতো সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করেছে৷ পরে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়৷ তখনই প্রচুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, বিপুল পরিমাণে সম্পত্তিও ধ্বংস হয়৷ এরা পুরো প্রশাসনিক যন্ত্রটাকেই বিকল করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল৷
তবে তিওয়ারি কমিশন এই হত্যা-হামলাকে শুধুই সাম্প্রদায়িক বা এক জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ বলতে নারাজ৷ রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোথাও যেমন অসমিয়ারা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির ওপর আক্রমণ হয়েছে, কোথাও আবার উল্টোটাও ঘটেছে৷ কিছু এলাকায় আবার অসমিয়াদের নিজেদের মধ্যে মারপিট হয়৷ মুসলমানদের কেউ কেউ আক্রমণকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজেদের মানুষের ক্ষতি করেছে৷
টিপি তিওয়ারির পর্যবেক্ষণ, অনেক ক্ষেত্রেই হিংসা ছড়িয়েছে অর্থনৈতিক কারণে এবং জমি বিবাদের দরুন৷ এর সঙ্গে অসমিয়াদের সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়ার আতঙ্ককে অস্বীকার করা যায় না বলেই মন্তব্য করেছেন কমিশনের চেয়ারম্যান৷ রিপোর্টে আরও রয়েছে, অসমিয়াদের অস্তিত্ব বিপন্ন, জনগণনার নানা পরিসংখ্যানে এর প্রমাণ মেলে৷
অসমে হিংসা প্রতিরোধে তিওয়ারির পরামর্শ, অসমিয়াদের সুরক্ষায় গুরুত্ব প্রদান করা হোক৷ সংখ্যালঘুরা নিজেরা বেরিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের ধরিয়ে দিক৷
তাঁর কথায়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে সুনিশ্চিত হতে পারে না, সে জন্য প্রয়োজন সংখ্যাগুরুদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা৷ একে অপরের ভাবাবেগকে শ্রদ্ধা করতে হবে৷ সেইসঙ্গে শরণার্থী ইস্যুরও দ্রুত সমাধান প্রয়োজন৷ বাংলাদেশে সন্ত্রাসের শিকার হয়ে যারা এসে আশ্রয় নিয়েছেন, সরকার তাদের নাগরিকত্ব দিক এবং শুধুই জমি হড়পের লক্ষ্যে যারা অসমে অনুপ্রবেশ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক৷
অন্যদিকে, মেহতা কমিশনের রিপোর্ট হাতে না পেলেও এক বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে, মেহতা নেলি গণহত্যা সহ তখনকার হাঙ্গামার জন্য পুলিশকে দায়ী করেছেন৷ এ ছাড়া, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন৷ মেহতাও তাঁর রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, অসমে বিদেশি সমস্যার দ্রুত সমাধান করা না হলে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতি বিপন্ন হবে৷


