Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

স্বাধীনতা আন্দোলনে বড়খলা, লিখেছেন বিবেকানন্দ মোহন্ত

বঙ্গ সাহিত্যের কেন্দ্রীয় সমিতির সাধারণ সভা উপলক্ষে এই বিশেষ নিবন্ধ

//বিবেকানন্দ মোহন্ত//

  সপ্তম- অষ্টম শতকীয় প্রাচীন বঙ্গ-সমতট অঞ্চলের (প্রাচীন কুমিল্লা -কর্মান্তবাসক – ত্রিপুরা -শ্রীহট্ট ) মহাসামন্ত অধিপতি লোকনাথ-মরুণ্ডনাথ রাজবৃত্তের অধীন জয়তুঙ্গবর্ষ অর্থাৎ জাটিঙ্গা বিধৌত ” সুবঙ্গ বিষয়াধীন” অঞ্চলের কেন্দ্রস্থল বর্তমানকালের সমৃদ্ধ জনপদ বড়খলায় ” বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনে”র পক্ষ থেকে অনুষ্ঠিত হওয়া আজকের এই বার্ষিক সাধারণ সভায় শারীরিক অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে না পেরে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। এই অঞ্চলের ফেলে আসা দিনগুলোর বিষয়ে কিঞ্চিৎ রেখাপাত করার উদ্দেশ্যেই লিপিবদ্ধ করছি দু-একটি লাইন।

  সুপ্রাচীনকালের জয়তুঙ্গবর্ষ বিভিন্ন রাজন্যবৃত্তের হাত ঘুরে এবং বিভিন্ন উত্থান – পতনের সাক্ষী হয়েও জাটিঙ্গা- সুবঙ্গ বিষয়াধীন এই অঞ্চল সমগ্র বরাক উপত্যকার আর্থ-সামাজিক , সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং শিক্ষাগত দিক দিয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছিল । এমনকি এই অঞ্চল অনেক সংস্কৃতজ্ঞ ও নৈয়ায়িকশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, গবেষক, কবি, সাহিত্যিক তথা বরেণ্য স্বাধীনতাসংগ্রামীকেও বরণ করে নিয়েছিল, যাঁর মধ্যে অন্যতম ছিলেন রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য সাহিত্য সরস্বতী, তিনি ঋগ্বেদ সংহিতা বাংলা পয়ার ছন্দে অনুবাদ করেছিলেন বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন পর্বে। কবিগুরু প্রদত্ত সাহিত্য সরস্বতী উপাধি তাঁর এই সাহিত্য কর্মেরই ফসল। তাঁর গায়ে জড়ানো ধবধবে সাদা আলখাল্লা, একই বর্ণের দীর্ঘ কেশরাশি ,সশ্রু-গুম্ফ এবং তার গোটা অবয়বই ছিল কবিগুরুর মতনই । সিলেট জেলার অন্তর্গত বিশ্বনাথ থানার কাশীপুর গ্রামের এই সুসন্তান বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন পর্বে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ অধীন সিলেটের জাতীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি নিরলস সাহিত্যচর্চা করে গিয়েছিলেন । একসময় ব্রিটিশের রোষানলে পড়ে জাতীয় বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে পড়ার পর রমেশচন্দ্র সপরিবারে চলে আসেন কাছাড়ের সমৃদ্ধশালী গ্রাম বড়খলাতে। এখানেই ” চান্দ লস্করের বেটা মণিরাম উজিরের” সুযোগ্য উত্তরাধিকারী বিপিনচন্দ্র দেব লস্কর ও যতীন্দ্রমোহন দেব লস্কর পরিবারের সক্রিয় সহযোগিতায় এবং পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯২০ সালে এখানে গড়ে তুলেন “বড়খলা জাতীয় বিদ্যালয়।” এটিই ছিল তৎকালীন কাছাড়ের প্রথম জাতীয় বিদ্যালয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে National Council of Education অধীন জাতীয় বিদ্যালয়ের অবদান ছিল অপরিসীম ।

 ১৯২১-‘২২ সালটি ছিল সর্বভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মাইলফলক। মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত এই আন্দোলনের প্রভাব যথাসময়েই এসে পৌঁছেছিল প্রাচীন জয়তুঙ্গবর্ষের এই জনপদে। অসহযোগ আন্দোলনের এই পর্বে নির্লিপ্ত থাকেনি বড়খলা অঞ্চলের জনপদ ও জনজীবন। জাতীয় বিদ্যালয় প্রধান রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের যোগ্য নেতৃত্বে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তরুন তুর্কি যতীন্দ্রমোহন দেব লস্কর, ইরমান মিঞা সহ অন্যান্যরা। ব্রিটিশ পুলিশ অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী এই তিনজনকে বন্দি করে শিলচরের জেলহাজতে পাঠায়। পরবর্তীতে কাছাড়ের জেলাধিপতি তথা ন্যায়দণ্ডাধীশের বিচারে তাঁদের প্রত্যেকের ৫০০ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে তিনমাসের সহজ কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

 কারাবাস কাটিয়ে কাছাড় জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের দ্বিতীয়া পত্নী সুরবালা দেবী যতীন্দ্রমোহন দেব লস্করের আর্থিক সহযোগিতায় নারী সমাজের সুতা কাটা ও বস্ত্র বয়ন প্রবর্তনের জন্য ১৯২২ সালে শিলচরের গড়ে তোলেন ” নারী শিল্পাশ্রম”। সুরবালা দেবী ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষা এবং শ্যামাচরণ দেবের সহধর্মিণী সৌদামিনী দেবী ছিলেন এটির তত্ত্বাবধায়ক। একসময় সরকারি রোষানলে পড়ে পার্ক রোডের ( বর্তমান রেডক্রস হাসপাতালের স্থানে) নারী শিল্পাশ্রমটি । ১৯২৩ সালের ২ জানুয়ারি এই প্রতিষ্ঠানটির উপর রাইফেলধারী গোর্খা সৈন্য সহযোগে হামলা চালান তদানীন্তন জেলাশাসক এবং পুলিশ অধীক্ষক। নারী শিল্পাশ্রমটিও তখন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আনন্দবাজার, সার্ভেন্ট, জনশক্তি পত্রিকায় এই পাশবিক অভিযানের কাহিনী বিস্তৃতভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল।

 রমেশচন্দ্র সাহিত্য-সরস্বতী, তাঁর অনুজপ্রতীম যতীন্দ্রমোহন দেব লস্কর, অসহযোগ সমকালীন বড়খলা-শিলচর ইত্যাদি বিষয় একটি স্বতন্ত্র প্রতিবেদনের দাবি রাখে।

   যাই হোক, প্রায় বছর তিনেক কাছাড় জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য পাকাপাকিভাবে চলে যান করিমগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত ব্রাহ্মণশাসন গ্রামে। অপরদিকে তাঁর বহুধা বিস্তৃত কর্মযজ্ঞের একনিষ্ঠ সহযোগী তথা সহযাত্রী যতীন্দ্রমোহন সমগ্র বড়খলা তথা বৃহত্তর কাছাড়ের রাজনৈতিক মহাকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বিচরণ করে গিয়েছিলেন আমৃত্যু। এমনকি ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং সিলেট রেফারেন্ডামের ঊর্মিমুখর দিনগুলোতেও তিনি নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকেননি। যথারীতি বড়খলা অঞ্চলের স্বেচ্ছাসেবক, তরুণসমাজকে নিয়ে সিলেটবাসী জনগণের পাশে গিয়েও দাঁড়িয়েছিলেন নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় ক্যানভাসিঙের পাশাপাশি ভীতসন্ত্রস্ত জনগণকে যুগিয়ে গিয়েছিলেন ভরসা ।

   আজ বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের আহূত এবং বড়খলায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনের বার্ষিক সাধারণ সভা উপলক্ষে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করে প্রণতি জানাই রমেশচন্দ্র সাহিত্য -সরস্বতী এবং মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী যতীন্দ্রমোহন দেব লস্করের উদ্দেশ্যে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker