Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

মনসা পূজা: ইতিহাস, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান, লিখেছেন মনোজ কুমার পাল

//ড. মনোজ কুমার পাল //

বাংলার লোকধর্মের ইতিহাসে মনসা পূজা এক অনন্য আখ্যান। প্রাচীনকাল থেকেই সাপ মানুষের জীবনের ভয় ও বিস্ময়ের প্রতীক। বিষধর সাপের দংশনে মৃত্যু ছিল গ্রামীণ জীবনে নিত্যকার আশঙ্কা, আর সেই ভয়কেই ধর্মীয় আচার ও কল্পনার রূপ দিয়ে মানুষ আত্মরক্ষার পথ খুঁজেছে। মনসা দেবী মূলত নাগদেবী, যিনি বিষহারিনী, জীবন রক্ষক ও সমৃদ্ধির প্রতীক। তাঁকে ঘিরে যে পূজারীতি গড়ে উঠেছে, তা বাংলার লোকবিশ্বাস, নারী ভক্তি, কৃষিজীবন ও সাহিত্যিক ধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

মনসার উৎপত্তি নিয়ে নানা মত প্রচলিত। শৈব পুরাণ, ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ কিংবা মঙ্গলকাব্যের বর্ণনায় তাঁকে কখনও ঋষি কাশ্যপ ও কদ্রুর কন্যা, কখনও নাগরাজ বাসুকীর সহোদরা, আবার কখনও শিবের কন্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিচয় আসলে তাঁর আর্য ও অনার্য উভয় শিকড়কেই নির্দেশ করে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মতত্ত্বে তিনি পূর্ণ মর্যাদা না পেলেও লোকবিশ্বাসে তিনি বিষহরি বা বিষহারিনী—যিনি সর্পদংশনের যন্ত্রণা লাঘব করেন।

ভারতীয় উপমহাদেশে নাগপূজার প্রাচীনতা সুপ্রমাণিত। সিন্ধু সভ্যতার প্রত্ননিদর্শনে সাপ-সম্পর্কিত প্রতীক চিত্রিত আছে। বৈদিক সাহিত্যে সাপকে কখনও ধ্বংসাত্মক শক্তি, কখনও রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মহাভারতের বাসুকি, শেষনাগ কিংবা নাগবংশ এই ঐতিহ্যের অংশ। বাংলার আর্দ্র, নদীবহুল পরিবেশে সাপ মানুষের স্থায়ী সঙ্গী হওয়ায় সাপদেবীর পূজা স্বাভাবিক ভাবেই বিকশিত হয়। ধারণা করা হয়, গুপ্ত যুগ থেকে বাংলায় নাগপূজা চলছিল, যা পরে ব্রাহ্মণ্য আচার, বৌদ্ধ প্রভাব ও লোক বিশ্বাসের মিশ্রণে স্বতন্ত্র রূপ নেয় এবং মনসা দেবীর পূজায় রূপান্তরিত হয়।

বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের ধারায় মনসা মঙ্গল একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। এই কাব্যে দেবী মনসার পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। চাঁদ সদাগর ধনী বণিক। শিবভক্ত হলেও মনসাকে অস্বীকার করেন। দেবী তাঁর ধনসম্পদ ও সন্তানহানি ঘটান। অবশেষে চাঁদের পুত্রবধূ বেহুলার অকুণ্ঠ ভক্তি ও ধৈর্যের ফলে মনসা পূজার স্বীকৃতি পান।

বেহুলা কেবল কাহিনির নায়িকা নন, তিনি নারীর সাহস, প্রেম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। স্বামী লখিন্দরের নাগ দংশনে মৃত্যুর পরও তিনি তাঁকে ভেলায় ভাসিয়ে দেবতাদের দরবারে নিয়ে যান এবং দেবীর কৃপায় পুনর্জীবন দান করান। এই কাহিনি নারীর আস্থা ও সংগ্রামী চেতনার এক অনবদ্য প্রতিচ্ছবি। মঙ্গলকাব্যের উদ্দেশ্য ছিল দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার ও তাঁর পূজার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা। তাই সাহিত্য এখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হলেও, এটি বাংলার নারী-পুরুষ উভয়ের মানসিক জগৎকে আলোড়িত করেছে।

বিজয় গুপ্ত, নরসিংহ দাস প্রমুখ কবিদের রচনায় মনসা মঙ্গল জনপ্রিয়তা পায়। পালাগান, যাত্রা ও পাঠোৎসবের মাধ্যমে এই কাহিনি গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মনসা দেবী কেবল ধর্মীয় পূজার কেন্দ্রীয় চরিত্র নন, তিনি বাংলার সাহিত্য, লোকগান ও নাট্য জগতের প্রাণকেন্দ্রও।

গ্রামীণ বাংলায় মনসা পূজার প্রধান তাৎপর্য ছিল সুরক্ষা। ধানক্ষেত, বাঁশঝাড় বা খড়ের ঘরে লুকিয়ে থাকা সাপ কৃষক জীবনের জন্য স্থায়ী বিপদ ছিল। সাপ দংশনের হাত থেকে মুক্তির আশায় মানুষ দেবীর শরণাপন্ন হতো। ফলে পূজা ছিল নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রার্থনা।

মনসা পূজায় নারীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় বাড়ির মহিলারাই পূজার আয়োজন করতেন। কলা গাছ দাঁড় করিয়ে, আলপনা এঁকে, ফুল-দূর্বা দিয়ে তাঁরা দেবীর আরাধনা করতেন। সন্তান ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় তাঁরা ব্রতকথা পাঠ করতেন এবং ‘মনসার সুতোর ব্রত’ ধারণ করতেন। এভাবেই মনসা পূজা নারীর সামাজিক শক্তি ও পারিবারিক দায়িত্ব বোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। সমাজতাত্ত্বিক ভাবে দেখা যায়, কৃষি কাজের মূল দায়িত্ব ছিল পুরুষের, কিন্তু পরিবারের সুরক্ষা ও মানসিক আশ্রয় জুগিয়েছেন নারী। তাই মনসা পূজার আচার নারীর হাতে গৃহস্থ সংসারের স্থিতি ও মঙ্গলকে প্রতিফলিত করেছে।

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মনসা পূজা ভিন্ন ভিন্ন আকারে পালিত হয়। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ বা মালদহে এটি সমবায় ভিত্তিক আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মাটির প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে মেলার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়। উত্তরবঙ্গের কিছু জেলায় প্রতিমার পরিবর্তে আলপনা আঁকাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দক্ষিণবঙ্গে ব্রতকথা পাঠ ও প্রতিমার শোভাযাত্রা পূজার মূল বৈশিষ্ট্য।

আসামের বরাক উপত্যকায় মনসা পূজা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। পালাগান, মনসার গান আজও গ্রামীণ সমাজের জনপ্রিয় অংশ। কোথাও নারীরা গৃহস্থালি আকারে পূজা পালন করেন, আবার কোথাও গ্রামসমাজ সম্মিলিত ভাবে উৎসব আয়োজন করে। এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে, একই দেবীকে ঘিরে ভিন্ন আঞ্চলিক সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটেছে, যা বাংলার বহুত্ববাদী চেতনার প্রতীক।

মনসা পূজার ইতিহাসে লোকবিশ্বাস ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চাঁদ সদাগর যেমন শাস্ত্রে স্বীকৃত দেবতাকে মান্য করেছিলেন, কিন্তু মনসাকে অস্বীকার করেছিলেন, তেমনি ব্রাহ্মণ সমাজও দীর্ঘদিন তাঁকে পূজার অংশ করে নেয়নি। ফলে মনসা পূজা ছিল এক অর্থে লোকদেবীর স্বীকৃতির জন্য সংগ্রাম। তবে সময়ের সঙ্গে এই টানাপোড়েন কমে যায়। সপ্তদশ–অষ্টাদশ শতক থেকে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা পূজায় যুক্ত হন এবং আচার-অনুষ্ঠানে পুরাণীয় মন্ত্রপাঠ সংযোজিত হয়। তবুও মনসা আজও মূলত লোকায়ত বিশ্বাসের দেবী—যেখানে জাঁক জমক নয়, ভয়, ভক্তি ও আশাই মুখ্য। লোকগান, মঙ্গলকাব্য পাঠ, পালাগান ও নাট্যরূপে মনসা কাহিনি গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। বেহুলা-লখিন্দরের গল্প গ্রামীণ নাট্যমঞ্চ ও যাত্রায় আজও দর্শককে আকর্ষণ করে। ফলে মনসা পূজা কেবল ধর্মীয় আচারের সীমায় আবদ্ধ নয়; এটি সংগীত, সাহিত্য, নাট্য ও চিত্র কলারও উৎস।

আজকের দিনে চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের উন্নতিতে সাপদংশনের ভয় কিছুটা কমেছে। তবু মনসা পূজা গ্রামীণ সমাজে জীবন্ত। আষাঢ়–শ্রাবণে এখনও গ্রামবাংলার উঠোনে বা পুকুরপাড়ে কলাগাছ দাঁড়িয়ে থাকে, দেবীর আরাধনা হয়, ব্রতকথা পাঠ করা হয়। শহুরে সমাজেও এটি সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে—মনসার গান, নৃত্য-নাটক, পালা আজও লোক স্মৃতিকে জাগ্রত রাখে।

এখনও মনসা পূজা কেবল সাপদেবীর আরাধনা নয়, এটি কৃষির উর্বরতার প্রতীক, নারীর শক্তির প্রকাশ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এটি বাংলার সমাজ জীবনের প্রতিফলন, যেখানে ভয়কে ভক্তিতে, আতঙ্ককে আশায় এবং লোকবিশ্বাসকে সংস্কৃতির শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। মনসা পূজা একদিকে প্রাচীন নাগ-আশঙ্কার প্রতিফলন, অন্যদিকে গ্রামীণ সমাজের আস্থা ও ঐক্যের প্রতীক। দেবী মনসা কেবল সাপদেবী নন; তিনি কৃষির সুরক্ষা, পারিবারিক মঙ্গল, নারীর শক্তি ও লোকসাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র। মনসা মঙ্গল কাব্যে বেহুলার প্রতিরূপ বাংলার নারীমনের ধৈর্য ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে চিরকালীন হয়ে আছে। অতএব, মনসা পূজা কেবল একটি আঞ্চলিক দেবীর উপাসনা নয়; এটি বাংলার লোকজ বিশ্বাস, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রতীক। আজও যখন গ্রামীণ গৃহিণী আলপনা আঁকেন, কালগাছ দাঁড় করান বা ব্রতকথা পাঠ করেন, তখন তার ভেতরে জেগে ওঠে সহস্র বছরের এক ধারাবাহিকতা—যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় আচার কেবল আধ্যাত্মিক সাধনা নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন।

তবে আধুনিক সময়ে মনসা পূজার আচার-অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন মাত্রাও যুক্ত হয়েছে। এখন বহু জায়গায় এমনকি পারিবারিক পূজাতেও মণ্ডপে প্রতিস্থাপনের জন্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমা নিয়ে আসা হয়, আবার পূজা শেষে বিসর্জনের সময় ডিজে ও সাউন্ড সিস্টেম সহযোগে রাস্তা জুড়ে জমকালো শোভাযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়। এই নতুন সংযোজন একদিকে সামাজিক উৎসবের আমেজ বাড়ালেও, অন্যদিকে লোকজ আধ্যাত্মিকতার নিস্তব্ধ ভাবগম্ভীরতাকে কখনও কখনও আড়াল করে ফেলে।

একই সঙ্গে, এই পরিবর্তনই প্রমাণ করে, মনসা পূজা কখনও স্থবির নয়, বরং সময়ের সঙ্গে নিজেকে নতুন রূপে প্রকাশ করে চলেছে। দেবীর আরাধনা আজ যেমন কৃষকের মাঠে অন্নের আশীর্বাদ চাওয়া, তেমনি শহুরে সমাজে তা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জাঁকজমক প্রদর্শন। এই বৈচিত্র্যের ভেতর দিয়েই মনসা পূজা আজও জীবন্ত, প্রাসঙ্গিক এবং বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ।

(ড. মনোজ কুমার পাল প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ওমেন্স্ কলেজ, শিলচর)

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker