Barak Updates

ভাষাশহিদদের বাংলাদেশি তকমা চরম অপমানকর : বরাকবঙ্গ

"বরাকে বাঙালির অস্তিত্ব মুছে দিতে নয়া মোড়কে ষড়যন্ত্রের সংকেত"

ওয়েটুবরাক, ২৭ অক্টোবর : ৬১ ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের পিঠে বাংলাদেশী তকমা সেটে দেওয়া এবং এ অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীকে বহিরাগত বলে ডিমাসা লেখক ফোরামের সভাপতি মুক্তেশ্বর কেম্প্রাই অসম সাহিত্য সভার সভাপতির কাছে লিখিতভাবে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তাকে ‘ অনাকাঙ্ক্ষিত ,অনভিপ্রেত ,চরম অপমানকর এবং সুগভীর ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ ‘ বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন।

 সম্মেলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গৌতম প্রসাদ দত্ত সোমবার এক বিবৃতিতে সংগঠনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, মুক্তেশ্বরবাবু লেখালেখির জগতের মানুষ। তবে ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতা বিস্ময়কর। বরাকের জনবিন্যাস এবং সুপ্রাচীন ইতিহাস পাঠের জন্য তাঁকে পরামর্শ দিয়ে সাধারণ সম্পাদক দত্ত বলেছেন, মুক্তেশ্বরবাবু এবং তাঁর মন্ত্রনাদাতাদের এটা জানা উচিত, বাঙালি জনগোষ্ঠী সুদীর্ঘকাল থেকে বরাকে বসবাস করে আসছে। এখানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল বলেই ডিমাসা রাজ্যের রাজধানী মাইবঙে থাকাকালীন সময় থেকেই স্থানীয় জনগণের ভাষা বাংলা সরকারি কাজকর্মে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ভুবনেশ্বর বাচস্পতির মত মহান বাঙালি কবি মাইবঙে ডিমাসা রাজসভা অলংকৃত করেছিলেন। রাজ দরবারে ‘নারদীয় রসামৃত’ ও ‘ব্রহ্মপুরাণ’ ওই সময় বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে খাসপুরে ডিমাসা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও গোবিন্দ চন্দ্র বাংলা ভাষায় কবিতা ও গান রচনায় উৎসাহ দিয়ে গেছেন। ডিমাসা কবি চন্দ্রমোহন বর্মনের বাংলা কবিতা সেই যুগে খুবই লোকপ্রিয় ছিল ।১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ কীর্তিচন্দ্র বরখলার মনিরাম লস্করকে উজির নিয়োগ করে যে দুখানি সনদ প্রদান করেন তা বাংলা ভাষায় লেখা ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ায় বাংলা ভাষায় প্রথম আইন রচনা করেন মহারাজ তাম্রধ্বজ নারায়ন। ওই সময় সরকারি দানপত্র, নিয়োগ পত্র এবং অভয় পত্র বাংলা ভাষায়ই লেখা হতো।

ইতিহাস টেনে বরাকবঙ্গের সাধারণ সম্পাদক দত্ত বিবৃতিতে আরও বলেছেন ,সূর্যকুমার ভূঞা সম্পাদিত কাছাড়ি বরঞ্জিতে উল্লেখ রয়েছে যে কাছাড়ি রাজসভা থেকে আহোম রাজাদের সঙ্গে যে চিঠি বিনিময় হত তার ভাষা ছিল বাংলা। সূর্য কুমার ভূঞা সম্পাদিত ‘ ত্রিপুরা দেশের কথা ‘ গ্রন্থে পরিষ্কার বলা হয়েছে ,১৭০৯ -১০ খ্রিস্টাব্দের বহু আগে থেকেই বাঙালিরা কাছাড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিল। এভাবে আরও অসংখ্য ঐতিহাসিক তথ্য তুলে ধরা যেতে পারে, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে বাঙালিরা এই অঞ্চলে বহিরাগত নন । বরং মাইবঙ থেকেই কাছাড়ি রাজ্যের রাজধানী খাসপুরে স্থানান্তর করা হয়েছিল ১৭ ৪৫ খ্রিস্টাব্দে। এর অনেক আগে থেকেই বাঙালিরা কাছাড়ে বসবাস করছেন কাছাড়ি রাজসভার নথিপত্রই তার প্রমাণ।

বরাকবঙ্গের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক দত্ত বিবৃতিতে এটাও বলেছেন, এ রাজ্যের, এই উপত্যকার বাঙালি জনগোষ্ঠীকে কখনও ‘ঘুসপেটিয়া ‘ কখনও ‘উইপোকা ‘ সরকারি অলিন্দ থেকেই বলা হয়েছে। আবার যখন নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র সরকার বাংলা ও অসমীয়াকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দিয়েছেন তখন শাসকদলের এক নেতা অমিত মালব্য বিবৃতি দিয়ে বলেছেন ,বাংলা আদৌ কোনও ভাষাই নয় । ‘বাংলা বললেই বাংলাদেশী ‘এই রব তুলে অসংখ্য বাঙালি হেনস্তার ঘটনা সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটেছে । যে ভাষা শহিদদের মুক্তেশ্বরবাবু বাংলাদেশী বলে অভিহিত করেছেন তাঁদের জন্ম হয় অখন্ড ভারতে নয়তো স্বাধীনতা হওয়ার অব্যবহিত পরে এদেশেই ,। বাংলাদেশের জন্ম কখন হয়েছিল ইতিহাস থেকে মুক্তেশ্বরবাবু সেটা জেনে নিন। রাজ্য বিধানসভায়ও একসময় বলা হয়েছিল ,৬১তে পুলিশের গুলিতে যাঁরা মারা গেছেন তাঁরা ভাষা শহীদ নন। বিধানসভার কার্যবিবরণীতেই সেসব তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে। সুতরাং মুক্তেশ্বরবাবু বাঙালি বিদ্বেষপ্রসূত যে কথাগুলো বলেছেন তা নতুন কিছু নয়। বাঙালির অস্তিত্ব অস্বীকার করার সুপরিকল্পিত চক্রান্তেরই এটি একটি অঙ্গ। হাল আমলে মুক্তেশ্বরবাবুদের নতুনভাবে এই বিষয়টি উত্থাপনের পেছনে মন্ত্রনাদাতা কে সেটা খুঁজে বের করা উচিত বলে দত্ত সুস্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করে গোটা বিষয়টি সম্পর্কে বরাক উপত্যকা থেকে দুর্বার প্রতিবাদ গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন। পাশাপাশি বরাক উপত্যকা সহ গোটা দক্ষিণ অসমে বাঙালি এবং ডিমাসাদের মধ্যে ঐতিহাসিক কাল থেকে যে সুসম্পর্ক রয়েছে তা যাতে বিঘ্ন না হয় সেজন্য সব পক্ষকে সতর্ক থাকতে বরাকবঙ্গের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবেদন জানিয়েছেন ।

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker