India & World UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে অবক্ষয় (২), লিখেছেন ড. মনোজ কুমার পাল

//ডমনোজ কুমার পাল //

(গতকালের পর)

যুক্তি, মিডিয়া ও জনআস্থার সংকট

আজকের গণতান্ত্রিক সমাজে প্রযুক্তি ও মিডিয়ার ভূমিকা সংসদীয় কর্ম কাণ্ডকে সরাসরি জনসমক্ষে এনে দিয়েছে। সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের ক্ষেত্র নয়, এটি জাতীয় নীতি ও মূল্যবোধের প্রতিফলনও বটে। টেলিভিশন ক্যামেরা ও সামাজিক মাধ্যমের লাইভ আপডেটের কারণে প্রতিটি বক্তব্য ও আচরণ নাগরিকদের নজরে আসে। এই স্বচ্ছতা যেমন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, তেমনি নানা সমস্যার জন্ম দেয়। সংসদে গঠনমূলক বিতর্কের পরিবর্তে শৃঙ্খলাভঙ্গ, হট্টগোল বা অশালীন মন্তব্য দেখা গেলে নাগরিকরা হতাশ হন এবং মনে করেন কর দাতাদের অর্থ অপচয় হচ্ছে। ফল স্বরূপ সংসদের প্রতি জনআস্থা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, বর্তমান সময়ে মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমের তাৎক্ষণিক আলোচনায় নেতারা সংসদের ভেতরের আলোচনার তুলনায় টেলিভিশন বিতর্ক বা টুইটার পোস্টে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর ফলে সংসদীয় পরিসর প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, ভারতের বহু সংবাদমাধ্যম—টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র—খোলাখুলি কোনো বিশেষ দলের মুখপাত্রে পরিণত হচ্ছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের মিডিয়া সেলের মাধ্যমে নিজেদের দলের মহীমার প্রচার করছে, ভুল তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে এবং একই সময়ে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে ব্যস্ত। সেন্টার ফর মিডিয়া স্টাডিজ (২০১৯)-এর গবেষণায় দেখা যায় নির্বাচনী সংবাদগুলির প্রায় ৭০% শাসক দলের পক্ষে ইতিবাচক কাভারেজ দিয়েছিল। একইভাবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও টিআরপি প্রতিযোগিতার কারণে সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। ফলে গণতন্ত্রে জনআস্থার সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।

ভোট পরবর্তী দায়িত্ব ও জবাবদিহি

ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে ভোট প্রদান শুধুমাত্র নাগরিকদের দায়িত্বের অর্ধেক অংশ মাত্র। ভোট দেওয়ার মাধ্যমে মানুষ নির্বাচিত প্রতিনিধির প্রতি আস্থা প্রদর্শন করে, কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় যে ভোট দেওয়ার পর তারা তাদের নাগরিক দায়িত্ব শেষ মনে করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড, বিল প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং জনস্বার্থ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণের জন্য জনসাধারণ যথেষ্ট সক্রিয় থাকে না। ২০১৯–২০২৪ সালের লোকসভা অধিবেশনের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ বিল এবং প্রকল্প সম্পর্কিত জনস্বার্থ সংক্রান্ত তথ্য বা জবাব পেতে সাধারণ মানুষকে প্রায়ই সংবাদমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম বা বিশেষ বিশ্লেষকের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। এর ফলে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্বাধীনভাবে নীতি নির্ধারণে বাধ্য হন না, বরং দলীয় হুইপ, কর্পোরেট লবি বা আঞ্চলিক গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন। এই প্রক্রিয়ায় জন নেতাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কমে যায়। গণতান্ত্রিক সমাজে এই ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা হ্রাস করে, সংসদের কার্যক্ষমতা সীমিত করে এবং নীতি-নির্ধারণের প্রকৃত উদ্দেশ্য—জনস্বার্থকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ—প্রভাবিত হয় (The Diplomat, 2023)।

অবক্ষয়ের প্রভাব

সংসদীয় অবক্ষয় সরাসরি ভারতের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। প্রথমত, আইন প্রণয়নের মান ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। সংবিধানিক ও সামাজিক নীতিমালা তৈরি হওয়ার সময় পর্যাপ্ত গবেষণা ও গণমত সংগ্রহের পরিবর্তে রাজনৈতিক স্বার্থ, অর্থ বা দফতরি চাপ প্রাধান্য পাচ্ছে। এর ফলে প্রণীত আইনগুলো জনমুখী না থেকে কেবল অংশ বিশেষের স্বার্থ রক্ষা করছে। দ্বিতীয়ত, নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কমে যাচ্ছে। সংসদে শৃঙ্খলাভঙ্গ, হট্টগোল বা বিল পর্যালোচনার সময় নষ্ট হওয়া জনমতকে বিভ্রান্ত করছে এবং প্রশাসনিক দক্ষতা কমাচ্ছে। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষ ক্রমশ সংসদের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। এভাবে জনমত ও সামাজিক বিশ্বাসের অবনতি রাষ্ট্রকে কর্তৃত্ববাদী নীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে বা গোষ্ঠী নির্ভর রাজনীতিকে উত্সাহিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই অবক্ষয় গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং দেশের নৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ক্ষতি ঘটায়।

সমাধানের পথ

সংসদীয় অবক্ষয় রোধে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।

প্রথমত, নির্বাচনী সংস্কার প্রয়োজন—অর্থ ও অপরাধী প্রার্থীর প্রভাব সীমিত করা, ব্যয়ের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা।

দ্বিতীয়ত, সংসদীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের কঠোর শাস্তি ও কার্যকর সময় ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক অর্থায়নকে স্বচ্ছ করা অপরিহার্য; অস্বচ্ছ ব্যবস্থাকে বাতিল করে সকল অর্থায়নের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

চতুর্থত, দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে হুইপ বা গোষ্ঠীর অতিরিক্ত প্রভাব কমানো যায়।

পঞ্চমত, প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে ডিজিটাল স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।

এ ছাড়াও, সংবাদমাধ্যমকে নিরপেক্ষ রাখতে উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যাতে রাজনৈতিক দলের প্রভাব বা বিজ্ঞাপন-নির্ভরতা জনমতকে বিভ্রান্ত না করে। নাগরিক পর্যবেক্ষণ ও জনপরিষদ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধি ও নীতি প্রণয়নের জবাবদিহি বাড়ানো যায়। শিক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাধীন কমিশন ও তদারকি প্রতিষ্ঠান গঠনেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পাশাপাশি, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ এবং শিক্ষিত ও নৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করলে সংসদের কার্যকারিতা পুনঃস্থাপন সম্ভব। সবশেষে বলতে হয় ভারতের সংসদ একসময় ছিল বিশ্বগণতন্ত্রের জন্য অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আজকের সংকটে সেটি তার গৌরবময় ঐতিহ্য থেকে সরে আসছে। এই অবক্ষয়কে যদি এখনই প্রতিরোধ করা না যায়, তবে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে যাবে। জনগণের প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় জনআস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতা, দল, নাগরিক সমাজ—সবাইকে নিতে হবে। সংসদ যদি পুনরায় নীতি, নৈতিকতা ও জবাবদিহির কেন্দ্রস্থল হয়, তবে ভারতীয় গণতন্ত্র তার আসল মর্যাদা ফিরে পাবে।

এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে নিচের তথ্যসূত্র ব্যবহার করা যেতে পারে

1. PRS India. (2023). The cost of parliamentary disruption. Retrieved from https://prsindia.org/articles-by-prs-team/the-cost-of-parliamentary-disruption

2. Association for Democratic Reforms (ADR). (2024). Shocking ADR report shows candidates with criminal cases in Lok Sabha 2024 had far better chances of winning. Retrieved from https://adrindia.org/content/shocking-adr-report-shows-candidates-with-criminal-cases-in-lok-sabha-2024-had-far-better-chances-of-winning

3. Times of India. (2024). Lok Sabha elections 2024: Electoral bonds explained – Transparency and anonymity in political funding. Retrieved from https://timesofindia.indiatimes.com/india/lok-sabha-elections-2024-electoral-bonds-explained-transparency-and-anonymity-in-political-funding/articleshow/108646815.cms

4. The Diplomat. (2023). The progressive decline of the Indian Parliament. Retrieved from https://thediplomat.com/2023/03/the-progressive-decline-of-the-indian-parliament

5. Stimson Center. (2024). India’s Electoral Bond Conundrum. Retrieved from https://www.stimson.org/2024/indias-electoral-bond-conundrum

6. Civil Daily. (2023). Declining productivity: Is the Indian Parliament losing its edge? Retrieved from https://www.civilsdaily.com/declining-productivity-is-the-indian-parliament-losing-its-edge

7. Basu, D. D. (2019). Indian government and politics (PDF). HMM College. Retrieved from https://hmmcollege.ac.in/uploads/dept_teaching_plan/Indian_Government_and_Politics_%28_PDFDrive_%29.pdf

8. IIPA. (2018). Indian polity and governance: Constitution, political system, and administration (PDF). Indian Institute of Public Administration. Retrieved from https://www.iipa.org.in/upload/IPG_const.pdf

9. Chandra, B., Mukherjee, M., & Mukherjee, A. (2019). Politics in India since independence (PDF). Afeias Publications. Retrieved from https://afeias.com/wp-content/uploads/2019/04/class12_Politics-in-India-since-Independence.pdf

10. Rude, S. (2006). Explaining Indian democracy: A fifty-year perspective, 1956–2006 (PDF). Archive.org. Retrieved from https://archive.org/details/explainingindian0000rudo

11. Shankar, B. (2005). The Indian Parliament: A democracy at work (PDF). Archive.org. Retrieved from https://archive.org/details/indianparliament0000shan

(শেষ)

(লেখক ড. মনোজ কুমার পাল শিলচর উইমেন্স কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ)

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker