India & World UpdatesHappeningsBreaking News
আমাদের একে অপরকে ধর্মান্তরিত করার প্রয়োজন নেই, লন্ডনে বললেন মোহন ভাগবত

ওয়েটুবরাক, ৮ সেপ্টেম্বর: “তীব্র ঘৃণা” নয়, “বিশুদ্ধ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই” আরএসএস-এর মূল ভিত্তি। সঙ্ঘপ্রধান মোহন ভাগবত রবিবার রাতে ব্রিটেনের হার্টফোর্ডশায়ারে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের একথা বললেন।
সংগঠনের কোন বিষয়টি একশো বছর ধরে সময়ের পরীক্ষায় টিকে রয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যদি আমাকে একটি মাত্র নীতির কথা বলতে হয়, তাহলে সেটি হল ‘আপনাপন’—অর্থাৎ একাত্মতার অনুভূতি, প্রত্যেককে নিজের মানুষ হিসেবে দেখা। এটাই ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম’—বিশুদ্ধ ও মহৎ ভালোবাসা।”
আরএসএস-এর শতবর্ষ উপলক্ষে তাঁর প্রচার ও জনসংযোগ সফরের তৃতীয় এবং শেষ পর্যায়ে পটার্স বারের ওশওয়াল সেন্টারে ৩২৬টি ব্রিটিশ প্রবাসী সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠনের ৬০০-রও বেশি নেতার সামনে ভাগবত এই বক্তব্য রাখেন। ব্রিটেনের বৃহত্তম জৈন সংগঠন ওশওয়াল অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ইউকে এই কেন্দ্রটি পরিচালনা করে।
ভাগবত বলেন, “হিন্দু কোনও ব্যক্তি মাত্র নন। তিনি তাঁর পরিবার, তাঁর সম্প্রদায়, তাঁর সমাজ এবং সমগ্র মানবতার অংশ।”
তিনি বলেন, “‘আপনাপন’ বা এই ভালোবাসাই ঐক্যের ভিত্তি। এটাই একমাত্র ‘আধার’ যার ওপর সঙ্ঘ গড়ে উঠেছে। সঙ্ঘে আমরা একটি গান গাই। সেখানে বলা হয়—‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম আপনে কার্য কা আধার হ্যায়’—অর্থাৎ বিশুদ্ধ, নিঃস্বার্থ ও মহৎ ভালোবাসাই আমাদের কাজের মূল ভিত্তি।”
আরএসএস-এর ষষ্ঠ সরসঙ্ঘচালক বলেন, “আমি কিছু মানুষকে বলতে শুনেছি যে তীব্র ঘৃণাই আমাদের কাজের ভিত্তি। আসলে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম’ই আমাদের কাজের ভিত্তি। এটি স্থায়ী এবং ১০০ বছরেও তা ক্ষয় হয়নি। স্বয়ংসেবকদের আচরণে এবং সঙ্ঘের পরিবেশে আপনারা একই ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক ভালোবাসা’ দেখতে পাবেন।”
রবিবারের অনুষ্ঠানটি মূলত আয়োজন করে হিন্দু স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ইউকে। ১৯৬৬ সালে ব্রিটেনে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি একটি হিন্দু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। ইন্টিগ্রালও এতে সহযোগিতা করে।
পশ্চিমা বিশ্বে ‘হিন্দুত্ব’ সম্পর্কে ব্যাপক ভুল ধারণার প্রসঙ্গ তুলে ভাগবত এর প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “কোনও ধর্মীয় আচার বা জীবনযাপনের ভিত্তিতে আমরা ‘হিন্দু’ শব্দটির অর্থ বুঝতে পারি না। হিন্দু হল একটি প্রকৃতি—এমন একটি সমাজ, যার স্বভাব হল সমস্ত বৈচিত্র্যকে গ্রহণ ও সম্মান করা। কারণ, এই সমাজ মনে করে যে বিভিন্ন পথ শেষ পর্যন্ত একই লক্ষ্যে পৌঁছায়।”
পুষ্পদন্ত রচিত বিখ্যাত সংস্কৃত স্তোত্র ‘শিবমহিম্ন স্তোত্রম’-এর একটি শ্লোকের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “মানুষের রুচি ভিন্ন হওয়ার কারণে পথও ভিন্ন হয়। কিন্তু সেই পথ ধরে চলা মানুষের গন্তব্য এক। হে ঈশ্বর, আপনিই সেই গন্তব্য। পৃথিবীতে যে সমস্ত জল পড়ে, শেষ পর্যন্ত তা সমুদ্রে গিয়ে মেশে।”
ভাগবত বলেন, “যখন আমরা বলি হিন্দু কোনও ধর্ম বা উপাসনা নয়, তখন এর অর্থ হল হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন রূপ থাকতে পারে। ধর্মগুলি বলে যে অন্য ধর্মগুলিও সত্য। আমাদের নিজস্ব মত রয়েছে, আপনাদেরও নিজস্ব মত রয়েছে—তাই আপনারাও সঠিক। আমাদের একে অপরকে ধর্মান্তরিত করার প্রয়োজন নেই। আপনার পথ আলাদা বলে আমাদের আলাদা হয়ে থাকার প্রয়োজন নেই; আমরা একসঙ্গে বসবাস করতে পারি।”
তিনি আরও বলেন, “অস্তিত্ব আসলে এক। বাইরে থেকে তা বৈচিত্র্যময় বলে মনে হয়। বৈচিত্র্যই স্বাভাবিক। আমাদের সেটিকে গ্রহণ ও সম্মান করতে হবে এবং বৈচিত্র্যের সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করতে হবে যাতে মনে থাকে যে এই পার্থক্যগুলি আসলে একক অস্তিত্বের বিভিন্ন অলংকার। এক থেকেই বহু হয়েছে, তাই বহুজনকে সম্মান করতে হবে। তাদের সঙ্গে আচরণ করার সময় তাদের আলাদা কিছু হিসেবে দেখা উচিত নয়। সবই এক, আমরা সবাই এক। এই ভিত্তিতেই আমরা সবকিছুর সঙ্গে আচরণ করি।”
‘হিন্দু রাষ্ট্র’ শব্দটির অর্থও তিনি ব্যাখ্যা করেন। পশ্চিমা বিশ্বে এই শব্দটি নিয়েও ব্যাপক ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে বলে মন্তব্য করে ভাগবত বলেন, ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ বলতে কোনও “জাতি-রাষ্ট্র” বোঝানো হয় না।
ভাগবতের কথায়, “এটি এমন একটি জনগোষ্ঠী, যাদের একটি অভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে—আমাদের এমন জীবনযাপন করতে হবে যাতে বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে নিজেদের দেশ ও অঞ্চলে পরিপূর্ণতা এবং নিজস্ব জাতীয় উদ্দেশ্য নিয়ে কীভাবে জীবনযাপন করা যায়, তার পথ খুঁজে পায়। এটাই আমরা ‘রাষ্ট্র’ বলতে বুঝি।”
তিনি বলেন, “জাতীয়তাবাদের অভিজ্ঞতার কারণে মানুষের মধ্যে একটা ভয় তৈরি হয়েছে। কিন্তু ‘রাষ্ট্র’ সেই ধরনের কোনও মিশন নয়। এই মিশন এগিয়ে গেলে কখনও কোনও স্বৈরশাসক বা যুদ্ধ থাকবে না। এর ফলে শান্তি, আনন্দ, সমৃদ্ধি এবং ভ্রাতৃত্ব তৈরি হবে।”
বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিয়েও মন্তব্য করেন ভাগবত। তিনি বলেন, হিন্দু সভ্যতার মূল্যবোধের মধ্যেই এর সমাধান রয়েছে।
তাঁর কথায়, “আমরা যদি এমনভাবে চিন্তা করি যে, আমরা দু’জনেই কিছু পাব এবং আমি যদি কিছু পাই, তাহলে তার কিছুটা আমি অন্যজনকে দেব, তাহলে প্রকৃতিকে জয় করার প্রয়োজন হবে না। আমরা প্রকৃতিরই অংশ। বাঁচো এবং অন্যকেও বাঁচতে দাও, অন্যকে বাঁচতে সাহায্য করো।”
হিন্দুদের এই ভারসাম্যের ধারণা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে আহ্বান জানান তিনি। বলেন, আমরা যদি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে বেশি গুরুত্ব দিই, তাহলে সমাজকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয়। আবার যদি সমাজতন্ত্রের কথা বলি, তাহলে ব্যক্তির অধিকারের প্রশ্ন ওঠে। ব্যক্তি ও সমাজ একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে এবং তার ফলে মানবতাও এগিয়ে যাবে। হিন্দুদের কাছে এর সমাধান রয়েছে এবং তারা ব্যক্তি, সমাজ ও মানবতার একসঙ্গে অগ্রগতির পথ তৈরি করতে পারে।”
‘সেবা’-র অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “সেবা এমন কোনও কাজ নয় যা আপনাকে মহান করে তোলে। সেবা হল ঈশ্বরের আরও কাছে পৌঁছানোর সুযোগ। আপনি কারও উপকার করছেন—বিষয়টি এমন নয়; বরং তারা আপনাকে সেবা করার সুযোগ দিয়ে আপনারই বিরাট উপকার করছেন। তাদের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখতে হবে। ঈশ্বর আপনাকে সেবার মাধ্যমে আপনার পাপ মোচনের সুযোগ দিচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “এমনভাবে দান করা উচিত, যাতে যাকে দেওয়া হচ্ছে সেও একদিন অন্যকে দেওয়ার মতো হয়ে ওঠে। এই ধরনের সেবাই প্রয়োজন।”
ব্রিটেনে বসবাসকারী হিন্দুদের উদ্দেশে ভাগবত বলেন, তাঁদের কখনওই জন্মভূমি ভারত এবং কর্মভূমি ব্রিটেনের মধ্যে সংঘাতের মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্রিটেনের হিন্দুরা ব্রিটেনের পক্ষেই থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “হিন্দুত্বের অবস্থান এ বিষয়ে স্পষ্ট—আপনার কর্মভূমিই হল সেই স্থান, যার প্রতি আপনার আনুগত্য থাকবে। জন্মভূমি থেকে আপনি মূল্যবোধ লাভ করেন এবং কর্মভূমিতে সেই মূল্যবোধ অনুসরণ করে কর্মভূমির সেবা করেন। হিন্দুত্ব কখনও আপনাকে কর্মভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে বলে না, কারণ আপনি সেখানে বসবাস করছেন। তবে আপনার কর্তব্য হল জন্মভূমি থেকে পাওয়া মূল্যবোধকে সম্পূর্ণ ও সঠিকভাবে নিজের জীবনে ধারণ করা, যাতে সমগ্র মানবতা তার সুফল পায়।”
তিনি আরও বলেন, “ভারতে আরএসএস সমাজজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কাজ করছে—খেলাধূলা, শিল্প, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী, এমনকি রাজনীতিতেও। আমাদের স্বনির্ভর হতে হবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও সাহায্য করতে হবে—এটাই আমাদের ‘স্বদেশি’ ধারণা।”
এদিকে, শুক্রবার লন্ডনের একটি গুরুদ্বারে মোহন ভাগবতকে আতিথ্য দেওয়ার জন্য লন্ডনের খালিস্তানপন্থী শিখ সংগঠনগুলি তাদের তীব্র সমালোচনা করেছে।