Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

নাট্য পর্যালোচনা : ‘বাজে মাদল বাজে’, লিখেছেন ড. মনোজ কুমার পাল

//ড. মনোজ কুমার পাল//

(প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ওমেন্স কলেজ, শিলচর)

গত ১৬ই নভেম্বর, রবিবার সন্ধ্যায় শিলচর যেন নতুন করে আবিষ্কার করল নাটকের প্রাণ, মানুষকে ভাবতে শেখানোর ক্ষমতা এবং শিল্পের মধ্য দিয়ে সমাজকে দেখা ও বোঝার দায়বোধ। বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের কাছাড় জেলা সমিতির মাসিক ব্যবস্থাপনায় বিবর্তন থিয়েটার গ্রুপের নাট্য–উপস্থাপনা এবার রূপ নিল চিন্তার, আবেগের এবং সাংস্কৃতিক প্রশ্নের এক অনন্য পরিসরে। দুটি নাটকেই উপস্থিত ছিলেন দর্শকের ভিড়; কিন্তু যেভাবে দর্শককে নাড়া দিল ইন্দ্রনীল দে রচিত ‘বাজে মাদল বাজে’, তা নিঃসন্দেহে এই সন্ধ্যার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।

দু’টি নাটক—

১) ‘পেঁপে সেদ্ধ’ (শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে)

২) ‘বাজে মাদল বাজে’ (রচনাঃ ইন্দ্রনীল দে)

নির্দেশনাঃ সায়ন বিশ্বাস

দু’টিই দর্শকপ্রিয়। অথচ দ্বিতীয় নাটকটি যেন দর্শকের হৃদয়ের গভীরতম কোষে গিয়ে আঘাত করল—যা তাকে শুধু বিনোদিত করল না, বরং নিজের ভিতরে প্রশ্ন জাগাতে বাধ্য করল।

নাটকের বিষয়বস্তু: এক তরুণ শিল্পীর হারানো সুর, হারানো পৃথিবী

‘বাজে মাদল বাজে’ মূলত এক চা–বাগানের তরুণ শিল্পীর গল্প। যার জীবন বাঁধা রয়েছে প্রকৃতির সহজ ছন্দে, মাটির নিঃশ্বাসে, আদিবাসী সংস্কৃতির প্রাচীন ঐতিহ্যে। তার হাতে মাদল যেন পৃথিবীর সঙ্গে কথা বলে। ছন্দ উঠলে তার চোখে লেগে থাকা আকাশ, নাচে তার মনের রোদবৃষ্টি।

কিন্তু তার এই সুর পৌঁছে যায় এক শহুরে এজেন্টের কানে—যে লোকসঙ্গীতকে শিল্প নয়, “প্রোডাক্ট” হিসেবে দেখে। শুরু হয় স্বপ্ন দেখানোর পালা। মঞ্চ, আলো, নাম-যশ, অর্থ—এই চকচকে প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়ে সে চলে আসে শহরে।

শহরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি ফিউশন মিউজিক স্টুডিওতে—যেখানে লোকবাদ্যকে ইলেকট্রনিক সাউন্ডের সঙ্গে মিশিয়ে বানানো হচ্ছে বাজার-উপযোগী মিউজিক। মাদলের পাশে বসানো হয়েছে অক্টোপ্যাড; লোকসুরের সামনে শহুরে ডান্স বিট। নৃত্যশিল্পীর শরীরী ছন্দে সুরের গতি নির্ধারিত—অর্থাৎ শিল্পীর নয়, বাজারের নির্দেশে।

এই নতুন দুনিয়ায় ওই তরুণ শিল্পী নিজেকে হারাতে শুরু করে। তার সুরের সঙ্গে শহুরে তাল মেলে না। তার শরীর-মন সেই পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারে না। অবশেষে তাকে অপমানিত হতে হয়—কারণ কর্পোরেটের চোখে শিল্পী নয়, বাজার-যোগ্য সাউন্ডই শেষ কথা।

নাটকের এই বেদনাময় দৃশ্যগুলোই দর্শকের মনের ভিতরে সঞ্চারিত করে এক গভীর প্রশ্ন—

শিল্প কি কেবলই বিক্রি করার বস্তু?

২৫ বছর আগের লেখা—আজ যেন আরও প্রাসঙ্গিক।

নাটকটি প্রথম লেখা হয়েছিল প্রায় ২৫ বছর আগে। তখনও আধুনিকতার ঢেউ শক্তিশালী হচ্ছিল, কিন্তু আজকের মতো এতো নিষ্ঠুর, এতো সর্বগ্রাসী ছিল না। আজ ফিউশন, রিমিক্স, রিটাচ—সবই বাজার কেন্দ্রিক। যে শিল্পে মানুষের মাটি, ইতিহাস, স্মৃতি ও সংস্কৃতি আছে—তা আজ অনেক সময় শহুরে পপ সংস্কৃতির সামনে নীরব হয়ে পড়ে থাকে।

নাটকটি তাই একবিংশ শতকের শিল্প–শোষণের প্রতিচ্ছবি:

 লোকসংস্কৃতির বাজারীকরণ

 আদিবাসী শিল্পীর প্রান্তিকীকরণ

 কর্পোরেট সঙ্গীতের অমানবিকতা

 শিল্পীর আত্মপরিচয়ের হারিয়ে যাওয়া

এই সামাজিক প্রশ্নগুলো নাটকটিকে আজ আরও গভীর, আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে।

অভিনয়: চরিত্র যেন জীবন্ত হয়ে উঠল মঞ্চে

মাধুর্য্য চৌধুরী (বুধু – মাদল বাদক)

মাধুর্য্যের অভিনয় নাটকের আত্মা। তার শরীরী ভাষা, মুখের অভিব্যক্তি, চোখের শূন্যতা—সবকিছু এত স্বতঃস্ফূর্ত ও গভীর যে মঞ্চের প্রতিটি মুহূর্ত যেন সত্যি বলে মনে হয়। বিশেষ করে যখন শহুরে স্টুডিওতে সে তাল হারিয়ে ফেলে—তার মুখের ভাঙা বিশ্বাস, ভয়, বেদনা দর্শককে স্তব্ধ করে দেয়।

শোভন দাস (জগাই – করতাল বাদক)

শোভনের অভিনয়ে ছিল অসাধারণ দীপ্তি। সে গল্পে আনে প্রাণ, হাসি, দুঃখ—সবকিছুই নিখুঁত মাত্রায়। বন্ধুত্বের দৃশ্যগুলোতে তার আন্তরিকতা এবং হতাশার মুহূর্তে তার কণ্ঠের ভার পুরো নাটকের আবেগকে আরও গভীর করে।

অন্যান্য অভিনেতা–অভিনেত্রী

গ্রুপ পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। কেউ চরিত্র ছেড়ে বেরিয়ে আসেননি, কেউ বাড়তি কিছু করেননি। সবাই মিলে যেন এক আদি সঙ্গীতের সমবেত সুর তৈরি করেছেন।

নির্দেশনা: সায়ন বিশ্বাসের অনুভূতি পূর্ণ, সূক্ষ্ম, পরিণত শিল্পদৃষ্টি

সায়ন বিশ্বাস একজন তরুণ নির্দেশক হিসেবে নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন—এই নাটক তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

তার নির্দেশনায় চোখে পড়ে—

 দারুণ সংযম

 নাট্য ভাষার প্রতি সংবেদনশীলতা

 দৃশ্য নির্মাণের স্মার্টনেস

 লোকসংস্কৃতির আবেগ ও শহুরে চটকদারির বৈপরীত্য

মঞ্চে আলো–অন্ধকারের খেলা, সুরের পরিবর্তন, চরিত্রের বৃত্ত—সবকিছুই তিনি তৈরি করেছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে।

একদিকে মাদলের গম্ভীর আদি তান, অন্যদিকে ইলেকট্রনিক তাল—দু’টির সংঘাত যতই বেড়েছে, নাটকের ভিতরে ততই গভীর হয়েছে মানুষের বেদনা।

এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। কিন্তু সায়ন বিশ্বাস তা করেছেন এমন সৌন্দর্যের সঙ্গে—যা দর্শককে শুধু সন্তুষ্ট নয়, বিস্মিতও করে।

নাটকের সামাজিক তাৎপর্য: আমাদের সমাজের লুকানো প্রশ্নগুলো

নাটকটি শেষ হয় না কোনও সহজ সমাধান দিয়ে। বরং প্রশ্ন তোলে—

 লোকসংস্কৃতি কি শহরের প্রদর্শনীতে বদলে যাচ্ছে?

 শিল্পীর জীবন কি কেবলই বাজারের দাস?

 প্রান্তিক মানুষের স্বর কোথায় যাবে?

 সংস্কৃতির শিকড় ছিঁড়ে ফেললে সমাজ কি টিকে থাকবে?

এই প্রশ্নগুলোই নাটকটিকে এক প্রয়োজনীয়, অর্থবহ নাটক হিসেবে বিবর্তনের সন্ধ্যায় আলাদা ভাবে চিহ্নিত করে।

নাটক প্রমাণ করে—

শিল্প শুধু বিনোদন নয়, সমাজের বিবেক। শিল্পের মৃত্যু মানে মানুষের সত্তার মৃত্যু।

পুরোনো স্মৃতি থেকে নতুন উপলব্ধি

২৫ বছর আগে প্রথম দেখেছিলাম নাটকটি—তখনও মনে দাগ কেটেছিল। কিন্তু আজ যখন প্রযুক্তি–নির্ভর জনপ্রিয়তার যুগ, যখন শিল্পকে “ভিউ”, “লাইক”, “শেয়ার”–এর মাপে বিচার করা হয়—তখন এই নাটকের বেদনাবহ সত্য যেন আরও কড়া হয়ে বাজল।

বিবর্তনের শিল্প চর্চা এক নতুন দিশা দেখাল

বিবর্তন থিয়েটার গ্রুপকে, সায়ন বিশ্বাসকে, এবং নাটকের প্রতিটি সদস্যকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

তারা শুধু একটি নাটক মঞ্চস্থ করেননি—

তারা সমাজের সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছেন।

তারা দেখিয়েছেন প্রান্তিক শিল্পীর জীবন কতটা নীরব, কতটা অবহেলিত, কতটা মূল্যবান।

‘বাজে মাদল বাজে’ শুধু নাটক নয়— এ এক সাংস্কৃতিক দলিল, এক মানুষের হৃদয়ের সুর, এক প্রান্তিক সমাজের বেঁচে থাকার আর্তি।

এই নাটক দেখার পর দর্শকমনেও যেন দীর্ঘক্ষণ ধরে বাজতে থাকে— মাদলের সেই বেদনা–ভরা ছন্দ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker