Barak UpdatesBreaking NewsFeature Story

অধরা কণার সন্ধানে : অ্যান্টার্কটিকার বরফে নিউট্রিনো শিকার—- লিখেছেন হিমাদ্রি শেখর দাস

শিলচর, ৭ অক্টোবর : এই মুহূর্তে, ঠিক এই সেকেন্ডেই আপনার চোখের পলক ফেলার আগেই প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন কণা আপনার মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড আর পুরো শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেল!

না, কোনো ব্যথা পেলেন না, টেরই পেলেন না বিন্দুবিসর্গ। পদার্থবিজ্ঞানের জগতের সবচেয়ে অধরা, নিভৃতচারী এবং চরম মায়াবী কণা—‘নিউট্রিনো’র রাজত্বে আপনাকে স্বাগতম!

তাকে খাঁচায় বন্দী করবে—এ সাধ্য কার?

তিনি যে পুরোপুরি নিউট্রাল! গায়ে কোনো বৈদ্যুতিক চার্জের দাগটুকু নেই। তাই মহাবিশ্বের কোনো পদার্থের সঙ্গেই সে গায়ে পড়ে ঝুট-ঝামেলায় জড়ায় না। ফাঁক গলে নিঃশব্দে ফসকে যাওয়াই তার আজন্ম স্বভাব। সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত ধেয়ে আসছে এমন কোটি কোটি নিউট্রিনোর অদৃশ্য স্রোত। আমাদের এই আস্ত পৃথিবীটাও তাদের পথ আটকানোর ক্ষমতা রাখে না; যেন আস্ত একটা গ্রহ তার কাছে ফাঁকা মহাশূন্য ছাড়া আর কিছুই নয়!

তবে বুনো ওলের জন্যও তো বাঘা তেঁতুলের দরকার হয়!

বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকার নির্জন, জমে থাকা বরফের ঠিক ১.৫ থেকে ২.৫ কিলোমিটার পাতালে তৈরি করলেন এক মহাজাগতিক ফাঁদ—IceCube Neutrino Observatory। প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফের বুকে গেঁথে দেওয়া হলো ৫,১৬০টি অতি-সংবেদনশীল ডিজিটাল অপটিক্যাল চোখ (DOM)।

নিউট্রিনোকে সেখানে বন্দী করার উপায় নেই, বিজ্ঞানীরা কেবল রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করেন সেই পরম মাহেন্দ্রক্ষণের—কখন কোটি কোটি কণার মধ্যে অন্তত একটা কণা বরফের অণুর সাথে মরণকামড় বসাবে!

আর সেই অসম্ভব যখনই ঘটে, বরফের অতল আঁধারে জ্বলে ওঠে তীব্র এক ঝলক অতিলৌকিক নীল আলো—চেরেনকভ বিকিরণ (Cherenkov radiation)। সেন্সরগুলো খপ করে ধরে ফেলে সেই আলোর পদচিহ্ন। আর সেই আলো বিশ্লেষণ করেই উন্মোচিত হয় কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের ব্ল্যাজার, কৃষ্ণগহ্বর আর মৃত নক্ষত্রদের মহাজাগতিক বিস্ফোরণের গোপন ইতিহাস!

এই অভাবনীয় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার নেপথ্য কারিগর হলেন পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন (Francis Halzen)। অ্যান্টার্কটিকার বরফকে ব্যবহার করে IceCube মানমন্দির গড়ে তোলা এবং মহাবিশ্বের সুদূর প্রান্ত থেকে আসা উচ্চ-শক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো (astrophysical neutrinos) শনাক্ত করে জ্যোতির্বিজ্ঞানে এক সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত—‘নিউট্রিনো অ্যাস্ট্রোনমি’র সূচনা করার ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে তাঁকে।

আলোর গণ্ডি পেরিয়ে আজ নিভৃতচারী এই কণার হাত ধরেই আমরা মহাবিশ্বের অজানা রহস্যের সন্ধান পাচ্ছি। বিজ্ঞানের এত জটিল এক রোমাঞ্চকর গল্প সহজ ভাষায় কতটা ফুটিয়ে তুলতে পারলাম, তা অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker