Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story
কালভৈরবের তেঁতুলতলায় কয়েকটি মাসের কাহিনি—লিখেছেন সঞ্জীব দেবলস্কর

//সঞ্জীব দেবলস্কর//
‘(আহা), তেরে সিওয়া কৌন মেরে কিষণ কানহাইয়া,
ভগবান কিনারে সে লগা দো মেরে নাইয়া…।’
একটি বা দুটি কলি। কখনও সুরে, কখনও বেসুরে, কখনও এমন যন্ত্রবৎ ভঙ্গিতে যে মনে হতো, গান নয়, বহু দূরের কোনও অচেনা স্মৃতি তার গলার ভিতর থেকে উঠে আসছে।
লোকটি গেয়ে গেয়ে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করত।
কে সে? কোথা থেকে এসেছিল? কেউ জানত না।
সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষ। পরনে একটুকরো মার্কিন কাপড়, উর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। মুখভর্তি উসকোখুসকো দাড়ি। চোখদুটো কেমন যেন গভীর, অথচ নির্বিকার। গ্রামের কেউ তাকে সাধু বলত, কেউ পাগল, কেউ আবার চুপিচুপি বলত, লোকটা নিশ্চয়ই কোথাও থেকে পালিয়ে এসেছে।
কিন্তু আমাদের কাছে সে ছিল এক রহস্য।
তার আশ্রয় হয়েছিল আমাদের গ্রামের নৃমাতাবাড়ির মণ্ডপে।
নৃমাতাবাড়ি তখন আজকের মতো ছিল না। চারদিকে কোনও বেড়া ছিল না। যে কোনও দিক দিয়ে ঢুকে পড়া যেত মন্দিরচত্বরে। একটি পুরোনো পুকুর, তার ঘাটে ঝামা পাথর। পশ্চিম দিকে বিরাট ঝাঁকড়াওয়ালা এক বটগাছ। একটু দূরে জারুল। আর মন্দিরের পাশে সেই তেঁতুলগাছ।
বৃদ্ধরা বলতেন, ওই তেঁতুলগাছ সাধারণ গাছ নয়।
আমরা অবশ্য তখন এসব কথায় খুব একটা কান দিতাম না।
দিনের বেলা।
রাত নামলে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যেত।
মন্দিরচত্বর তখন কেমন যেন বদলে যেত। বাতাস একটু ভারী মনে হতো। বটগাছের ডালপালা অন্ধকারে এমনভাবে নড়ত, যেন কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। পুকুরের জল থেকে মাঝে মাঝে অকারণে শব্দ উঠত। আর দূরে কোথাও শিয়াল ডাকলে মনে হতো, সেই ডাকের উত্তর যেন অন্য কোথাও থেকে আসছে।
তার মধ্যেই বাস করত সেই সাধু।
তেঁতুলগাছের নিচে ইট-পাথর জুড়ে সে নিজেই একটি ছোট্ট চুলো বানিয়ে নিয়েছিল। সেখানেই তার রান্না। মন্দিরের পাশে গরুগুলোও রাত হলে এসে আশ্রয় নিত। সাধুর তাতে কোনও আপত্তি ছিল না। বরং গরুগুলোর জন্য জায়গা করে দিত, কখনও তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিত।
আর একটি কাজ সে প্রতিদিন করত।
মণ্ডপ ঝাড়ু দেওয়া।
শুধু মণ্ডপ নয়, গোটা মন্দিরচত্বর।
সকালবেলা আমরা দেখতাম, সাধু হাতে ঝাঁটা নিয়ে একমনে জায়গাটা পরিষ্কার করছে। শুকনো পাতা, খড়কুটো, ধুলোবালি সব সরিয়ে ফেলছে। কাজ শেষ হলে মন্দিরচত্বরটাকে এমন পরিষ্কার দেখাত, যেন সেখানে কেউ রাতভর পুজোর আয়োজন করেছে।
নৃমাতা-ভৈরবের মন্দিরের পাশে সামান্য যে খোলা জায়গা, রাত হলে সেখানেই তার শয্যা পাতত।
একটুকরো চাদর।
বৃষ্টি এলে সেই চাদরই তার ছাউনি। বৃষ্টির ছাট গায়ে লাগলেও সে বিশেষ বিচলিত হতো না।
শীত নামার পর অবশ্য তার আস্তানা আরও আরামদায়ক হয়ে উঠল।
তেঁতুলগাছের নিচে খড়কুটো বিছিয়ে লম্বা করে শোওয়ার ব্যবস্থা। সন্ধ্যার পর বাইরে আগুন জ্বলত। আগুনের পাশে বসে সাধু চা খেত। বাজারের তন্দুরি থেকে কিনে আনা বনরুটি, সঙ্গে চা।
আমরা ছেলেরা দূরে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখতাম।
সাধু আমাদের দিকে তাকাত না।
কখনও কখনও আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকত। আগুনের শিখা তার দাড়িতে লালচে আলো ফেলত। তখন তাকে আর ভিখারী বলে মনে হতো না। মনে হতো, সে যেন কোনও অজানা কাহিনির মানুষ, ভুল করে আমাদের গ্রামে এসে পড়েছে।
কিন্তু সেই তেঁতুলগাছ নিয়ে একটা কথা আমরা জানতাম।
সাধু বোধহয় জানত না।
গাছটি নাকি কালভৈরবের অধিকারে।
বহু বছর আগে এক পশ্চিমি ব্যবসায়ী ওই গাছের গা ঘেঁষে একটি দোতলা বাড়ি তৈরি করেছিলেন। বেশ বড়সড় বাড়ি। গৃহপ্রবেশের দিন ধুমধাম হয়েছিল।
কিন্তু প্রথম রাতেই সব শেষ।
গভীর রাতে বাড়ির ভিতর থেকে চিৎকার শোনা গেল।
তারপর দরজা খুলে ব্যবসায়ী ছুটে বেরিয়ে এলেন।
লোকটির মুখ সাদা।
তিনি শুধু বলেছিলেন, ঘরের ভিতরে কে একজন দাঁড়িয়ে ছিল।
বাঘছাল পরা।
তারপর আর কিছু বলতে পারেননি।
কে সে, তা বুঝতে গ্রামের কারও বাকি রইল না।
কালভৈরব।
এরপর বাড়িটি দিনের বেলা ব্যবহার করা হলেও সেখানে কেউ রাত কাটাত না।
সেই বাড়িতে একবার রামলীলার দল এসে উঠেছিল। জনা দশেক লোক। নিজেদের হ্যাজাক, সাজপোশাকের বাক্স, রান্নার সরঞ্জাম সব সঙ্গে।
রাত্রিবাসের জন্য বাড়িটির চেয়ে ভালো জায়গা আর কোথায়?
সেই রাতেও মাঝরাতে বাড়ির ভিতর থেকে অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল।
কেউ বলল, দরজা কাঁপছে।
কেউ বলল, মেঝে কাঁপছে।
আর তারপরই আট দশটি গলা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
“হে রামা! হে রামা!”
পরদিন ভোরেই রামলীলার দলটি বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।
এসব গল্প শুনে আমরা তেঁতুলগাছটির দিকে একটু অন্য চোখে তাকাতাম।
সাধু অবশ্য নির্বিকার।
সে সেখানে থাকত।
আগুন জ্বালত।
চা খেত।
গান গাইত।
আর গভীর রাতে সেই গানই কখনও কখনও অন্যরকম হয়ে উঠত।
আমরা লেপের নিচে শুয়ে থাকতাম।
দূরের মন্দিরচত্বর থেকে ভেসে আসত সাধুর গলা।
প্রথমে স্বাভাবিক।
তারপর হঠাৎ সুরে কেমন একটা কাঁপুনি।
একটা দীর্ঘ টান।
তারপর গলা যেন একটু থেমে গেল।
আমরা কান পেতে থাকতাম।
আবার গান।
কিন্তু এবার সেই গলায় একটা অদ্ভুত কম্পন।
আমরা বুঝতাম, কিছু একটা হয়েছে।
কালভৈরব নড়েচড়ে বসেছেন।
অবশ্য সাধু কখনও কাউকে কিছু বলেনি।
শুধু পরদিন সকালে তাকে যথারীতি মন্দির ঝাড়ু দিতে দেখা যেত।
আর তখনই আমাদের মনে হতো, হয়তো কালভৈরব খুব রাগটাগ করেননি।
কারণ সাধুটি তো তেঁতুলগাছের মাথায় নয়, তাঁর চরণতলেই আশ্রয় নিয়েছিল।
—
নৃমাতাকে ঘিরে আরও একটি গল্প ছিল। মায়ের মুখে শুনতাম।
গভীর রাতে নাকি তাঁর একটি বাহন মন্দিরচত্বর ছেড়ে সারা গ্রামে ঘুরে বেড়াত।
সাদা বাঘ।
কেউ তাকে দেখেছে বলে দাবি করত না। কিন্তু কেউ দেখেনি, এমন কথাও জোর দিয়ে বলত না।
বৃদ্ধরা বলতেন, নৃমাতা সদাজাগ্রত। সাদা বাঘের পিঠে চড়ে তিনি গ্রাম পরিক্রমা করেন। নদীর ওপারে আছেন এ দেবীর মতো আরেক দেবী, খড়্গরূপিনী মা রণচণ্ডী। কোন এক সুদূর অতীতে কাছাড়ি রাজা স্বপ্নাদেশে নদীর জলে ভাসমান এক সর্পের লেজ স্পর্শ করে লাভ করেন এ দেবী- প্রতীকী অস্ত্র যা মহারাজকে সুরক্ষা দিয়ে এসেছিল দীর্ঘ দিন। শত্রু হস্তে নিধনের সময় এ আশীর্বাদী সমরাস্ত্র রাজার সঙ্গে ছিল না এটাই গল্প। কে জানে কী ভাবে কবে ওই খড়্গ জাটিঙ্গার ওপারে অধিষ্ঠিত হল? তিনিও মা নৃমাতার মতো এ গ্রামে পূজা পেয়ে আসছেন। তাঁর প্রতি এ অঞ্চলের বিশেষ করে ডিমাসা বর্মন জনগোষ্ঠীর অগাধ আস্থা। রণচণ্ডীর কোন বাহন নেই তাই বুঝি নৃমাতা ব্যাঘ্র বাহনে নদী পেরিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসেন।
প্রতি রবিবার দুটো মন্দিরে পুজো হতো। আজও হয়।
নৃমাতার মন্দিরে অবশ্য বলিও হতো। পাঁঠা না হলে হাঁস।
হাঁসও না হলে অন্তত একটি কবুতর।
দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা বলি নিয়ে আসতেন।
কখনও যদি সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও বলি না এলে , তখন নাকি কথা অনুযায়ী সেবায়েতের বাড়িতে খবর যেত। তবে এর কোন প্রয়োজন হয়নি। মা নিজেই বলির ব্যবস্থা করে গেছেন।
দেবীর পুজো বলি ছাড়া শেষ করা যাবে না।
অন্তত এক ফোঁটা রক্ত।
সেই রক্ত নিবেদন করেই সেদিনের পুজো শেষ হতো।
এসব কথা আমরা শুনতাম।
বিশ্বাস করতাম কি না, জানি না।
কিন্তু সন্ধ্যার পর মন্দিরচত্বর দিয়ে একা যেতে হলে বুকের ভিতরটা যে একটু ধড়ফড় করত, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ফিরে আসি মন্দিরে আগন্তুকের কথায়। এক বর্ষায় দেখি দৃশ্যপট বদলে গেল।
প্রবল বৃষ্টি।
দিনের পর দিন।
তেঁতুলতলার মাটিতে জল জমে গেল। সাধুর খড়ের বিছানা ভিজে গেল। চুলোর আগুন নিভে গেল।
তারপরএকদিন দেখি, সাধু নেই।
তার চুলো আছে।
কয়েকটি পোড়া কাঠ আছে।
সে অন্য কোথাও চলে গেছে।
কোথায়?
আমরা ভেবেছিলাম, সে আর ফিরবে না।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরে এক সন্ধ্যায় বাজারের দিক থেকে ভেসে এল সেই পরিচিত গলা।
আমরা ছুটে বেরিয়ে এলাম।
সাধু এসেছে।
কিন্তু এবার কণ্ঠ নতুন একটি কলি।
“এসো সোনার বরণী রাণী গো,
শঙ্খকমল করে…”
সুর এখনও বেসুরো।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে গানটি যেন মন্দিরচত্বরের সঙ্গে মিশে গেল।
তারপর আবার একদিন সে চলে গেল। আবার এল।
আবার চলে গেল।
একসময় আসাও বন্ধ হয়ে গেল।
মানুষটি কোথা থেকে এসেছিল, কোথায় গেল, কে জনে না।
অনেক বছর কেটে গেছে।
কাছাড়ের শেষ উজির কমলচরণ প্রতিষ্ঠিত নৃমাতা মন্দিরেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন নতুন দালান উঠেছে। পুরোনো রীতিনীতি বদলেছে। বলি প্রথাও আর নেই। মন্দির এখন অনেক বেশি ঝকঝকে।
কিন্তু মন্দিরের প্রকৃত আভিজাত্য যেন এখনও লুকিয়ে আছে সেই আড়াইশো বছরের পুরোনো চুন-সুরকির জীর্ণ ঘরটির মধ্যে।প্রাচীনেরা জানেন এখানে আসার আগে
উজাননগরে ছিল মায়ের পুরোনো আসন। সেখানেও তাঁর নামে একটি মন্দির আছে। গ্রামবাসীরা সপ্তাহে একদিন সেখানে গান-কীর্তনের মাধ্যমে দেবীকে স্মরণ করেন।
কখনও কখনও ভাবি, পুরোনো সেই মন্দির যদি একদিন ধসে পড়ে?ভক্তদের উদ্যোগে নতুন দালান উঠেছে।
মন্দিরে আজকাল বিদ্যুতের আলো জ্বলছে। দেবী পুরনো পোড়া ইটের ঘর ছেড়ে উঠে এসেছেন ঝাঁ চকচকে মন্দিরে।
কিন্তু সেই ধ্রুপদী আবহ কি আর ফিরে আসবে?
সেই তেঁতুলগাছ?
সেই বটগাছ?
সেই অন্ধকার পুকুর?
সেই রাতের ঘণ্টাধ্বনি?
আর সেই আগন্তুক ভিখারী?
—
আজও শীতের কোনও গভীর রাতে হঠাৎ দূর থেকে কোনও বেসুরো ভজন শুনলে মনে হয়, শব্দটা যেন বহু বছর পেরিয়ে আমাদের সেই মন্দিরচত্বর থেকেই ভেসে আসছে।
“তেরে সিওয়া কৌন মেরে কিষণ কানহাইয়া…”
তারপর খুব আস্তে, যেন বাতাসের সঙ্গে মেশে,
“এসো সোনার বরণী রাণী গো,
শঙ্খকমল করে…।” সেই বেসুরো মানুষটি আর নেই।
কোথায় হারিয়ে গেছে, তাও জানি না।
কিন্তু কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের কণ্ঠস্বর কোথাও থেকে যায়।
হয়তো সেই তেঁতুলগাছের পাতায়।
হয়তো পুরোনো মন্দিরের চুন-সুরকির দেওয়ালে।
হয়তো কালভৈরবের নিঃশব্দ পাহারায়।
আর হয়তো কোনও শীতের রাতে, যখন গোটা গ্রাম ঘুমিয়ে থাকে, সেই অদৃশ্য সাদা বাঘের পিঠে চড়ে নৃমাতা যখন তাঁর পুরোনো গ্রাম পরিক্রমা করেন, তখন পথের কোনও এক অন্ধকার বাঁকে এখনও দাঁড়িয়ে থাকে সেই আগন্তুক সাধু।
হাতে তার ঝাঁটা।
আর অন্ধকারের মধ্যে ভেসে আসে তার বেসুরো গলা,
“ভগবান কিনারে সে লগা দো মেরে নাইয়া…”।
(স্কেচ সঞ্জয় দেবলস্কর)


