Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story
তথ্যযুগে গণজ্ঞাপন শিক্ষার গুরুত্ব, লিখেছেন ড. অরিন্দম গুপ্ত
//ড. অরিন্দম গুপ্ত //
তথ্য, ভাবমূর্তি, বক্তব্য ও জনমত। এই চারটি শব্দ আজ আর কেবল সংবাদমাধ্যমের পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, কর্পোরেট ক্ষেত্র, সামাজিক উদ্যোগ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, এমনকি ব্যক্তিগত পেশাগত বিকাশের ক্ষেত্রেও গণজ্ঞাপনের দক্ষতা এখন এক অপরিহার্য সম্পদ। সেই প্রেক্ষিতে বরাক উপত্যকার উচ্চশিক্ষা পরিসরে গণজ্ঞাপন ও সাংবাদিকতার পাঠক্রমের বিস্তার শুধু একটি নতুন বিষয়ের সংযোজন নয়; এটি সময়ের সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বরাক উপত্যকায় স্ব-অর্থায়িত পাঠক্রম হিসেবে গণজ্ঞাপন শিক্ষার বীজ রোপিত হয়েছিল উইমেনস কলেজ, শিলচরের হাত ধরে, ২০১০ সালে। স্নাতক স্তরে এই পাঠক্রম চালুর সেই অগ্রণী উদ্যোগের পর বিষয়টি ধীরে ধীরে রবীন্দ্রসদন গার্লস কলেজ, গুরুচরণ কলেজ (যা আজ গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়) এবং রামানুজ গুপ্ত ডিগ্রি কলেজেও বিস্তার লাভ করে। এখন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর, যার গণজ্ঞাপন বিভাগ উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাচীনতম বিভাগ, স্নাতক স্তরে এই বিষয় চালু করেছে। ফলে স্পষ্ট, বরাক উপত্যকায় গণজ্ঞাপন শিক্ষা আর বিচ্ছিন্ন প্রয়াস নয়; এটি ধীরে ধীরে এক পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাগত পরিসর গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে।
এই মুহূর্তে বিষয়টিকে জাতীয় শিক্ষা নীতির বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখা জরুরি। জাতীয় শিক্ষা নীতি শিক্ষাকে কেবল ডিগ্রি অর্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, বহুবিষয়ক জ্ঞান, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত অভিযোজনের মাধ্যমে মানবসম্পদ গঠনের পথ হিসেবে দেখতে চেয়েছে। সরকারের নানা উদ্যোগেও যুবসমাজকে দক্ষ, প্রযুক্তি-সচেতন, আত্মনির্ভর ও কর্মক্ষম করে তোলার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই বৃহত্তর লক্ষ্যপূরণের সঙ্গে গণজ্ঞাপন ও সাংবাদিকতার মতো বিষয় স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত, কারণ এই পাঠক্রম ভাষা, প্রযুক্তি, সমাজবোধ, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং জনমতের পাঠকে একসঙ্গে ধারণ করে।
গণজ্ঞাপন মানে কেবল সাংবাদিকতা নয়, আর সাংবাদিকতা মানেই কেবল রিপোর্টার হওয়া নয়। সংবাদমাধ্যম অবশ্যই এই শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র; কিন্তু তার বাইরেও রয়েছে বিস্তৃত কর্মভূমি। ডিজিটাল মিডিয়া, জনসংযোগ, কর্পোরেট কমিউনিকেশন, বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক গণজ্ঞাপন, কনটেন্ট রাইটিং, তথ্যচিত্র নির্মাণ, উন্নয়নমূলক গণজ্ঞাপন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজি, পডকাস্ট, ফটোগ্রাফি, মিডিয়া গবেষণা, ব্র্যান্ডিং, সরকারি প্রচার এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গণজ্ঞাপন প্রতিটি ক্ষেত্রেই আজ প্রশিক্ষিত, প্রযুক্তি-সচেতন ও দায়িত্বশীল পেশাদারের চাহিদা বাড়ছে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও গণজ্ঞাপন শিক্ষার গুরুত্ব আজ অসামান্য। আধুনিক রাজনীতি শুধু ভাষণ, মিছিল বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বার্তা নির্মাণ, জনমত বোঝা, তথ্য বিশ্লেষণ, সামাজিক মাধ্যম ব্যবস্থাপনা, প্রচার-পরিকল্পনা, ভাবমূর্তি নির্মাণ, সংকটকালীন বক্তব্য, নির্বাচনী কৌশল, নীতি ব্যাখ্যা এবং নাগরিকের সঙ্গে ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্র। রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সংগঠন এবং নীতি-পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পরিসরে এমন দক্ষ তরুণ-তরুণীর প্রয়োজন বাড়ছে, যারা সমাজের ভাষা বুঝতে পারে, মানুষের চাহিদা পড়তে পারে এবং তথ্যকে দায়িত্বশীল বক্তব্যে রূপ দিতে পারে।
ভারতের মতো গণতন্ত্রে সর্বস্তরের মানুষের চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতা বোঝার জন্য এ ধরনের শিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। গণজ্ঞাপন ছাত্রছাত্রীদের শেখায় কীভাবে জনমতের স্পন্দন ধরতে হয়, কীভাবে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হয়, কীভাবে নীতি, উন্নয়ন, নির্বাচন, আন্দোলন ও সামাজিক পরিবর্তনের ভাষা পড়তে হয়। রাজনৈতিক গণজ্ঞাপন তাই শুধু ক্ষমতার ভাষা নয়; এটি গণতন্ত্রের ভাষা বোঝারও শিক্ষা। যে তরুণ সমাজ এই ভাষা শিখবে, তারা ভবিষ্যতে রাজনীতি, প্রশাসন, গবেষণা, নীতি-পরিকল্পনা, প্রচার, জনসংযোগ এবং নাগরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবে।
ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের কাছে এই বিষয়টির প্রকৃত পরিচয় পৌঁছে দেওয়া আজ অত্যন্ত জরুরি। গণজ্ঞাপন এমন একটি পাঠক্রম, যা একজন শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী করে, ভাষায় দক্ষ করে, প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম করে, সমাজ সম্পর্কে সচেতন করে এবং কর্মজীবনের জন্য বহুমুখী প্রস্তুতি দেয়। সংবাদমাধ্যমে কাজ করা এই শিক্ষার একটি সম্ভাবনা মাত্র। তার পাশাপাশি রয়েছে জনসংযোগ সংস্থা, কর্পোরেট কমিউনিকেশন, সরকারি তথ্য ও প্রচার দফতর, এনজিও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা, গবেষণা প্রকল্প, ডিজিটাল কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম, অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রোডাকশন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, সামাজিক প্রচারাভিযান এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ।
এই বিষয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হল, এটি ছাত্রছাত্রীদের শুধু একটি পেশার জন্য নয়, বহু পেশার জন্য প্রস্তুত করে। ভাষা, লেখনী, বক্তব্য রাখার ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস, তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণী দৃষ্টি, সাক্ষাৎকার গ্রহণের কৌশল, দৃশ্যবোধ, ডিজিটাল প্রোডাকশন, প্রযুক্তির ব্যবহার, দলগত কাজ এবং সমাজ-সংবেদনশীলতা এই সব দক্ষতা আজ কোনও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একবিংশ শতকের কর্মক্ষেত্রে যে তরুণ বা তরুণী স্পষ্টভাবে ভাবতে পারে, শুদ্ধভাবে লিখতে পারে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারে, তথ্যের উৎস যাচাই করতে পারে এবং প্রযুক্তির সাহায্যে বক্তব্যকে দৃশ্য, শব্দ ও পাঠের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে, তার সামনে কর্মক্ষেত্রের একাধিক পথ খুলে যায়।
জাতীয় শিক্ষা নীতি যে বহুমাত্রিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার কথা বলে, গণজ্ঞাপন সেই ভাবনার এক বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র হতে পারে। এখানে সাহিত্য আছে, সমাজবিজ্ঞান আছে, রাজনীতি আছে, অর্থনীতি আছে, প্রযুক্তি আছে, দৃশ্যভাষা আছে, গবেষণা আছে, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা আছে। অর্থাৎ এটি এমন এক বিষয়, যেখানে শ্রেণিকক্ষ, সমাজ এবং কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সরাসরি সেতুবন্ধন তৈরি হয়। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান এখানে মাঠের অভিজ্ঞতায় প্রাণ পায়; তত্ত্ব এখানে সংবাদ, প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার, তথ্যচিত্র, প্রচার-পরিকল্পনা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও জনসচেতনতা কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হয়।
বরাক উপত্যকার প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এই অঞ্চল ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি, সীমান্ত-বাস্তবতা, নাগরিক জীবন, স্মৃতি ও আন্দোলনের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতায় ভরপুর। এখানে গল্প আছে, অভিজ্ঞতা আছে, সমাজে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আছে। সেই বাস্তবতাকে তথ্যনিষ্ঠ, পরিণত, প্রযুক্তিনির্ভর ও সৃজনশীলভাবে প্রকাশ করার জন্য প্রশিক্ষিত ও দক্ষ গণজ্ঞাপনকর্মীর প্রয়োজন অপরিসীম। স্থানীয় বাস্তবতাকে স্থানীয় চোখে দেখা, বোঝা এবং বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার কাজ এই শিক্ষার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হতে পারে।
আজকের ছাত্রছাত্রীরা এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে, যেখানে মোবাইল ফোন একটি ব্যক্তিগত সম্প্রচারমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম একটি জনমত-ক্ষেত্র, এবং তথ্যের গতি অনেক সময় বিচারশক্তির চেয়েও দ্রুত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম, ডিজিটাল প্রচার, ভুয়ো খবর, ছবি ও ভিডিওর কারসাজি এসবের যুগে গণজ্ঞাপন শিক্ষা শুধু পেশাগত প্রশিক্ষণ নয়, নাগরিক শিক্ষাও। কীভাবে সংবাদ পড়তে হয়, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে ছবি, ভাষা ও প্রচারের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে হয়, কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে হয় এসব শেখা আজ গণতান্ত্রিক সমাজেরও প্রয়োজন।
তাই গণজ্ঞাপন ও সাংবাদিকতার পাঠক্রমকে শুধুমাত্র একটি ‘কোর্স’ হিসেবে নয়, একটি দক্ষতা-নির্মাণের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা দরকার। তবেই বিষয়টি বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে জীবন, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হবে।
বিশেষ করে ছাত্রীরা এই বিষয়ের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের শক্তিশালী পথ খুঁজে পেতে পারে। গণজ্ঞাপন শিক্ষা তাদের ভাষা, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস ও পেশাগত স্বাধীনতাকে প্রসারিত করতে পারে। সাংবাদিকতা, গবেষণা, ডিজিটাল মিডিয়া, জনসংযোগ, শিক্ষাদান, উন্নয়ন ক্ষেত্র, কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট, তথ্যচিত্র নির্মাণ, রাজনৈতিক গণজ্ঞাপন এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গণজ্ঞাপন প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের অংশগ্রহণ সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
বরাক উপত্যকার শিক্ষিত সমাজের সামনে এখন একটি সুযোগ রয়েছে। একটি বিষয়কে শুধু প্রচলিত চাকরির ছকে বিচার না করে তার দক্ষতা, মানবিকতা, প্রযুক্তিগত প্রাসঙ্গিকতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ভিতর দিয়ে দেখা। প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত নয়, “এই বিষয় পড়ে শুধু রিপোর্টার হওয়া যাবে কি?” বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, “এই বিষয় কি একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল, দক্ষ, প্রযুক্তি-সচেতন, সমাজসচেতন এবং কর্মক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে?”
উত্তর স্পষ্ট। পারে, যদি ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের সম্ভাবনাকে বিশ্বাস করতে শেখে।
গণজ্ঞাপন ও সাংবাদিকতা কোনও প্রান্তিক বিষয় নয়। এটি সময়ের ভাষা বোঝার শিক্ষা, সমাজকে পড়ার শিক্ষা, রাজনীতির অন্তর্গত জনমত বুঝতে শেখার শিক্ষা, বক্তব্যকে গড়ে তোলার শিক্ষা এবং সত্য ও দায়িত্বের সঙ্গে প্রকাশের শিক্ষা। জাতীয় শিক্ষা নীতির দক্ষতা, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বহুবিষয়ক শিক্ষার যে স্বপ্ন, বরাক উপত্যকার মতো সম্ভাবনাময় অঞ্চলে গণজ্ঞাপন শিক্ষা সেই স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করাতে পারে। এই শিক্ষা ছাত্রছাত্রীদের পেশাগত ভবিষ্যৎকে যেমন প্রসারিত করবে, তেমনি অঞ্চলটির নিজস্ব কণ্ঠকেও আরও সুস্পষ্ট, দৃঢ় ও দূরগামী করে তুলবে।



