Barak UpdatesHappeningsBreaking News
উইমেন্স কলেজে ব্যাস পূজা: গুরু–শিষ্য পরম্পরায় মানুষ গড়ার শিক্ষার আহ্বান

ওয়েটুবরাক, ৮ আগস্ট: গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরা, গুরু–শিষ্য ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বকে সামনে রেখে শুক্রবার উইমেন্স কলেজ, শিলচরে অনুষ্ঠিত হল ব্যাস পূজা ও গুরু বন্দনা। উইমেন্স কলেজ, শিলচর এবং ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল, দক্ষিণ অসম প্রান্তের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে শিক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, অবদান ও সমাজের প্রতি তাঁদের মূল্যবান সেবাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ ও সম্মান জানিয়ে চারজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
সংবর্ধিত বিশিষ্টজনেরা হলেন উইমেন্স কলেজ, শিলচরের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. শঙ্কর ভট্টাচার্য, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী শ্রী ত্রিবেণী প্রসাদ চক্রবর্তী; ময়নুল হক চৌধুরী হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা শ্রীমতী সুমিতা ঘোষ, এবং উইমেন্স কলেজ, শিলচরের প্রাক্তন প্রভাষক শ্রীমতী মন্দিরা দত্ত চৌধুরী।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁদের সুদীর্ঘ কর্মজীবনের নিষ্ঠা, আদর্শ, জ্ঞানচর্চা ও অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে তাঁদের অনন্য অবদান, পাশাপাশি সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে তাঁদের মূল্যবান ভূমিকার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবেই এই সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ভারতীয় শিক্ষাদর্শনের সমন্বয় এবং আগামী প্রজন্মের চরিত্র গঠনে শিক্ষকের ভূমিকার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
অনুষ্ঠানের মুখ্য বক্তা গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তথা ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল, দক্ষিণ অসম প্রান্তের অধ্যক্ষ প্রফেসর নিরঞ্জন রায় বলেন, ভারতীয় শিক্ষার মূল লক্ষ্য কখনও কেবল চাকরি অর্জন ছিল না; এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে “মানুষ গঠন ও চরিত্র নির্মাণ”। ঔপনিবেশিক শাসনে ভারতের নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ম্যাকলের শিক্ষানীতির প্রভাবে এমন এক শিক্ষাধারা গড়ে উঠেছিল যা ভারতীয় জ্ঞান, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে শিক্ষার্থীদের ক্রমশ দূরে সরিয়ে দেয়।
“সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ” এবং “সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে”-র ভাবনা তুলে ধরে অধ্যাপক রায় বলেন, শিক্ষা ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এর লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ। জাতীয় শিক্ষানীতিতে যে হোলিস্টিক এডুকেশন-এর কথা বলা হয়েছে, তা ভারতীয় শিক্ষাদর্শনের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তাঁর কথায়, আজকের তরুণ প্রজন্মই ২০৪৭ সালের ভারতকে নেতৃত্ব দেবে এবং তাদের হাত ধরেই আত্মনির্ভর, জ্ঞানসমৃদ্ধ ও ‘বিকশিত ভারত’-এর পুনর্জাগরণ সম্ভব।
স্বাগত বক্তব্যে উইমেন্স কলেজের অধ্যক্ষ ড. সুজিত তেওয়ারি বলেন, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘গুরু’ শব্দের তাৎপর্য এতটাই বিস্তৃত যে তার যথার্থ অর্থকে কয়েকটি শব্দে অনুবাদ করা কঠিন। “গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ, গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ”এই প্রাচীন ভাবনার মধ্যেই সৃষ্টি, পালন, জ্ঞান এবং মানবজীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার গুরুর মহিমা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেন, গুরুপূজন মূলত জ্ঞান ও জীবনবোধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এক পবিত্র পরম্পরা।
উইমেন্স কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. শঙ্কর ভট্টাচার্য ভারতের প্রাচীন গুরুকুল শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলেন, সেই ব্যবস্থায় ধনী-দরিদ্রের বিভাজন ছিল না। রাজপুত্র থেকে সাধারণ কৃষকের সন্তান—সকলেই একই পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করত। সমাজ গুরুকুলের ব্যয়ভার বহন করত এবং শিক্ষার লক্ষ্য ছিল শুধু পুঁথিগত জ্ঞান প্রদান নয়, বরং চরিত্র গঠন, নৈতিক মানের উন্নয়ন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করা। তাঁর মতে, এই শিক্ষাপরম্পরার শক্তির উপর ভর করেই ভারত দীর্ঘকাল বিশ্বে জ্ঞান ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ত্রিবেণী প্রসাদ চক্রবর্তী বলেন, ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত ভাবনা মূলত বিশ্বজনীন। মহর্ষি ব্যাসদেব বেদের জ্ঞানকে সংকলিত ও সুবিন্যস্ত করেছিলেন বলেই তাঁর জন্মতিথি গুরু পূর্ণিমা বা ব্যাস পূর্ণিমা হিসেবে পালিত হয়। তাঁর কথায়, গুরু সেই ব্যক্তি যিনি অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করেন, আর গুরু পূর্ণিমা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়, গুরু ও আচার্যদের দেওয়া জ্ঞানকে আত্মস্থ করে জীবনে প্রয়োগের সংকল্প গ্রহণের দিন।
সোনাবাড়িঘাটের মইনুল হক চৌধুরী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যক্ষা সুমিতা ঘোষ বলেন, ভারতের সনাতন সংস্কৃতিতে গুরুকে কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, একটি ভাব, আদর্শ এবং চিরন্তন মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। তাঁর মতে, গুরু নিজে জ্ঞান ও উপলব্ধিতে পূর্ণ হয়ে শিষ্যের মধ্যেও পূর্ণতার বোধ জাগিয়ে তোলেন। মাতা-পিতাই মানুষের জীবনের প্রথম গুরু। ইতিহাসে চাণক্য থেকে সমর্থ গুরু রামদাস গুরুদের ভূমিকা কেবল ব্যক্তিকে শিক্ষিত করায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণেও তাঁদের গভীর প্রভাব রয়েছে।
উইমেন্স কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক মন্দিরা দত্ত চৌধুরী কলেজে তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতি রোমন্থন করেন এবং গুরু পূর্ণিমার তাৎপর্য নিয়ে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. নৃত্যেন্দু বিকাশ দাস শ্লোক পাঠ করেন। বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. সুষ্পিতা দাস অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। কলেজের বরিষ্ঠ শিক্ষিকা ড. সর্বাণী বিশ্বাস ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রাক্তন শিক্ষক এবং বিপুল সংখ্যক ছাত্রীর উপস্থিতিতে ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।


