Barak UpdatesHappeningsBreaking News

“অস্পষ্ট ও এড়িয়ে যাওয়ার মতো উত্তর নয়”—ধর্মানন্দ দেবের আপিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে সতর্ক করল কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন

ওয়েটুবরাক, ৮ আগস্ট: অসম চুক্তির ৬ নম্বর ধারা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মাধ্যমে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির রিপোর্ট, সুপারিশ, কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপ এবং কেন্দ্র ও অসম সরকারের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া নথি সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে শিলচরের আইনজীবী ধর্মানন্দ দেবের দায়ের করা দ্বিতীয় আপিলে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন। প্রধান তথ্য কমিশনার রাজ কুমার গোয়াল মামলাটি নিষ্পত্তি করার সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সিপিআইও-কে সংশ্লিষ্ট আরটিআই আবেদনের বিষয়ে নতুন করে সুস্পষ্ট, যুক্তিসঙ্গত ও পয়েন্টভিত্তিক উত্তর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ধর্মানন্দ দেব গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নর্থ ইস্টার্ন ডিভিশনের সিপিআইওর কাছে একটি আরটিআই আবেদন দাখিল করেন। তাঁর আবেদনে মূলত জানতে চাওয়া হয়েছিল, ১৫ জুলাই ২০১৯ তারিখে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের No. 11012/04/2019-NE.VI নোটিফিকেশনের মাধ্যমে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি সরকারের কাছে কোনও রিপোর্ট জমা দিয়েছে কি না; রিপোর্টে কী কী পরামর্শ বা সুপারিশ করা হয়েছিল; সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ করে অসমের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে; কমিটি ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে কী কী করেসপন্ডেন্স আদান-প্রদান হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কমিটিটি এখনও কার্যকর রয়েছে কি না।

কিন্তু ২১ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে সিপিআইও তাঁর আরটিআই আবেদনের উত্তরে জানান যে, কমিটি তার রিপোর্ট অসম সরকারের কাছে জমা দিয়েছে এবং সেই কারণে সংশ্লিষ্ট তথ্য সিপিআইও-র কাছে উপলব্ধ নেই। আবেদনকারীকে সরাসরি অসম সরকারের কাছে আরটিআইর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই উত্তরে সন্তুষ্ট না হয়ে ধর্মানন্দ দেব একই তারিখে প্রথম আপিল দায়ের করেন। পরবর্তীতে ১৯ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে ফার্স্ট অ্যাপিলেট অথরিটি-ও সিপিআইও-র উত্তর বহাল রেখে জানায় যে, যেহেতু কমিটির রিপোর্ট অসম সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে, তাই সংশ্লিষ্ট তথ্যের জন্য অসম সরকারের কাছে যোগাযোগ করাই যথাযথ।

এরপর ধর্মানন্দ দেব ২২ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনে দ্বিতীয় আপিল দায়ের করেন। তাঁর আপিলে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, তাঁর আরটিআই আবেদনকে শুধুমাত্র কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট চাওয়ার আবেদন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কমিটিটি যেহেতু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল, তাই কমিটির গঠন, কার্যক্রম, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ, রিপোর্ট, রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপ এবং কেন্দ্র ও অসম সরকারের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া নথি ও করেসপন্ডেন্স সম্পর্কেও তিনি তথ্য চেয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির ক্ষেত্রে কেবল “তথ্য আমাদের কাছে নেই” বলে আবেদনকারীকে অন্য একটি সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া আরটিআই আবেদনের যথাযথ নিষ্পত্তি হতে পারে না।

দ্বিতীয় আপিলে ধর্মানন্দ দেব আরও যুক্তি দেন যে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক নিজেই যে কমিটি গঠন করেছিল, সেই কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান জানানো প্রয়োজন। বিশেষ করে কমিটির রিপোর্টের পর কেন্দ্রীয় সরকার কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও অসম সরকারের মধ্যে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনও সরকারি নথি বা করেসপন্ডেন্স রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁর আরটিআই আবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

মামলার শুনানির আগে ধর্মানন্দ দেব ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনে একটি বিস্তারিত লিখিত বক্তব্যও দাখিল করেন। সেখানে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব নোটিফিকেশনের মাধ্যমে গঠিত একটি কমিটির সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্যের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক সম্পূর্ণভাবে তথ্যের অনুপস্থিতির কথা বলে দায় এড়াতে পারে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট অসম সরকারের ওয়েবসাইটে পাওয়া গেলেও তাঁর আরটিআই আবেদন শুধুমাত্র সেই রিপোর্টের একটি কপি পাওয়ার জন্য ছিল না; বরং রিপোর্টের পর কেন্দ্রীয় সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ, নিজেদের সিদ্ধান্ত, করেসপন্ডেন্স এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি সম্পর্কেও তথ্য চাওয়া হয়েছিল।

এই দ্বিতীয় আপিলের শুনানি ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনে অনুষ্ঠিত হয়। আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব কাছাড় জেলাশাসকের কার্যালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষে ডিরেক্টর তথা সিপিআইও অ্যালিশ এ টেটে ব্যক্তিগতভাবে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। কমিশন ধর্মানন্দ দেবের ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের লিখিত বক্তব্যও রেকর্ডে গ্রহণ করে এবং সংশ্লিষ্ট আরটিআই আবেদন, সিপিআইও-র উত্তর, ফার্স্ট অ্যাপিলেট অথরিটির আদেশ এবং দ্বিতীয় আপিলের বিষয়গুলি বিবেচনা করে।

২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে দেওয়া সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন এখন সিপিআইও-কে “revised and cogent point-wise reply” দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কমিশন স্পষ্ট করেছে যে, সংশোধিত উত্তরে আরটিআই অ্যাক্টের বিধান অনুসরণ করে উপলব্ধ তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কোনও তথ্য আরটিআই অ্যাক্টের সেকশন ৮(১)-এর অধীনে প্রকাশ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্য হলে সেই আইনি ভিত্তি যথাযথভাবে উল্লেখ করতে হবে। আবার কোনও তথ্য সত্যিই সিপিআইও-র কাছে উপলব্ধ না থাকলে, সেই বিষয়টিও অস্পষ্টভাবে নয়, যথাযথভাবে জানাতে হবে।

কমিশনের নির্দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এই সংশোধিত উত্তর আবেদনকারী ধর্মানন্দ দেবকে বিনামূল্যে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রদান করতে হবে। একই সঙ্গে সিপিআইওকে সংশোধিত উত্তর প্রদানের বিষয়টি কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনকেও অবহিত করতে হবে। অর্থাৎ, আগের সাধারণ বা অস্পষ্ট উত্তরের পরিবর্তে এবার প্রতিটি প্রশ্নের বিষয়ে আইনসম্মত ও নির্দিষ্ট অবস্থান জানিয়ে পয়েন্টভিত্তিক উত্তর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।

এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন সিপিআইও-কে ভবিষ্যতে আরটিআই আবেদনের ক্ষেত্রে এ ধরনের “ambiguous and seemingly evasive replies” না দেওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। অর্থাৎ, তথ্য চাওয়া হলে এমন কোনও উত্তর দেওয়া যাবে না যা অস্পষ্ট, পরোক্ষ বা তথ্য দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার মতো বলে মনে হতে পারে। একই সঙ্গে ফার্স্ট অ্যাপিলেট অথরিটি-কেও ফার্স্ট আপিলগুলি মেকানিক্যাল ডিসপোজাল না করার জন্য যথাযথভাবে সতর্ক করা হয়েছে। কমিশনের এই পর্যবেক্ষণ আরটিআই ব্যবস্থায় জনসাধারণের তথ্য জানার অধিকার এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতার বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ধর্মানন্দ দেবের এই দ্বিতীয় আপিলের মূল বিষয় ছিল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মাধ্যমে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির রিপোর্ট এবং সেই রিপোর্টের পর কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে আবেদনকারী যেন যথাযথ তথ্য পান। কমিশনের নতুন নির্দেশের ফলে এখন সিপিআইও-কে তাঁর মূল আরটিআই আবেদনের প্রতিটি প্রশ্নের বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। ফলে কমিটির রিপোর্ট, সুপারিশ, কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপ, সংশ্লিষ্ট করেসপন্ডেন্স এবং কমিটির বর্তমান অবস্থান — এই সমস্ত বিষয়েই সংশোধিত উত্তরের মাধ্যমে তথ্যের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন আবেদনটি নিষ্পত্তি করলেও সিপিআইও-র উপর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সংশোধিত উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। সিদ্ধান্তের একটি কপি উভয় পক্ষকে বিনামূল্যে দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২৪ জুলাই ২০২৬-এর এই আদেশে একদিকে যেমন ধর্মানন্দ দেবের আরটিআই আবেদনের বিষয়ে নতুন করে পয়েন্টভিত্তিক উত্তর দেওয়ার নির্দেশ এসেছে, তেমনি অন্যদিকে ভবিষ্যতে আরটিআই আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অস্পষ্ট বা এড়িয়ে যাওয়ার মতো উত্তর না দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সিপিআইও-কে সরাসরি সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker