NE UpdatesHappenings
বিশ্ব আলোকচিত্র দিবসে রঘু রাইকে শ্রদ্ধাঞ্জলি উইমেন্স কলেজে
গণজ্ঞাপন বিভাগের দেওয়াল পত্রিকা ‘উইন্ডো’ প্রকাশিত
ওয়েটুবরাক, ১৯ আগস্ট: একটি ছবি কখনও শুধুই একটি মুহূর্তকে ধরে রাখে না, তার ভিতরে জমা থাকে সময়, সমাজ, ইতিহাস, মানুষের আনন্দ-বেদনা আর না-বলা অসংখ্য গল্প। সেই ছবির ভাষাকেই সামনে রেখে বুধবার বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস ২০২৬ উদ্যাপন করল উইমেন্স কলেজ, শিলচর। আয়োজনে কলেজের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগ।
এ দিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিভাগের দেওয়াল পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা, যার এ বছরের নামকরণ করা হয়েছে উইন্ডো। ‘ভারতীয় আলোকচিত্র সাংবাদিকতার কিংবদন্তি, পদ্মশ্রী রঘু রাইয়ের স্মৃতিতে এ বারের ‘উইন্ডো’ উৎসর্গ করেছেন বিভাগের পড়ুয়ারা। গত এপ্রিলে তাঁর প্রয়াণের পর বিশ্ব আলোকচিত্র দিবসে এই শ্রদ্ধার্ঘ্য অনুষ্ঠানকে এনে দেয় এক অন্য আবহ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই রঘু রাইয়ের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন কলেজের অধ্যক্ষ ড. সুজিত তেওয়ারি, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তথা অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্কুল অব ক্রিয়েটিভ আর্টস অ্যান্ড কমিউনিকেশন স্টাডিজের ডিন অধ্যাপক নির্মল কান্তি রায়, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ছাত্রীরা।
পরে অধ্যাপক রায় ও ড. তেওয়ারি যৌথ ভাবে ‘উইন্ডো’ উন্মোচন করেন। উপস্থিত ছিলেন উপাধ্যক্ষ ড. শান্তনু দাস, গ্রন্থাগারিক তথা আইকিউএসি সমন্বয়ক ড. সরিতা ভট্টাচার্য, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং পড়ুয়ারা।
অধ্যক্ষ ড. তেওয়ারি বিশ্ব আলোকচিত্র দিবসকে ঘিরে এমন ভাবনাসমৃদ্ধ আয়োজনের জন্য সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের শিক্ষক ও পড়ুয়াদের অভিনন্দন জানান। তাঁর কথায়, আলোকচিত্রের ক্ষমতা কেবল কোনও দৃশ্যকে থামিয়ে রাখা নয়; স্মৃতি, আবেগ, সময় এবং ইতিহাসকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করাও তার অন্যতম শক্তি।
রঘু রাইয়ের আলোকচিত্রের স্বতন্ত্র ভাষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতীয় আলোকচিত্রকে নিজস্ব দৃষ্টি ও শিল্পবোধে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি। তাঁর ফ্রেমে ধরা পড়েছে মানুষের মুখ, সমাজের পরিবর্তন, সময়ের অভিঘাত আবার কখনও নিঃশব্দ দৈনন্দিনতার মধ্যেই উঠে এসেছে বৃহত্তর জীবনের গল্প।
প্রধান অতিথি অধ্যাপক নির্মল কান্তি রায় তাঁর বক্তব্যে বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস পালনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি আলোকচিত্রকে প্রকাশ, নথিবদ্ধকরণ এবং সমাজকে দেখার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেন।
বিশেষ ভাবে আলোকচিত্র সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি রঘু রাইয়ের কাজের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন। অধ্যাপক রায়ের কথায়, আপাত সাধারণ একটি মুহূর্তকেও এমন ভাবে ফ্রেমবন্দি করতে পারতেন রঘু রাই, যেখানে মানুষের আবেগ, সামাজিক বাস্তবতা এবং সময়ের বহু স্তর এক সঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে উঠত।
রঘু রাইয়ের সাদা-কালো ছবির ব্যবহার, কম্পোজ়িশন, ছবির একাধিক স্তর, আলো-ছায়ার বৈপরীত্য এবং দৃশ্যের গভীরতা নিয়ে পড়ুয়াদের সামনে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, রঘু রাইয়ের ছবি শুধু কোনও ঘটনা বা ব্যক্তির প্রতিকৃতি নয় সেগুলি যেন ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, ইতিহাস এবং মানুষের অন্তর্জগতের এক বিস্তৃত দৃশ্য-আখ্যান।
রঘু রাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনে পাওয়া একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানের কথাও তুলে ধরেন অধ্যাপক রায়। তাঁর আলোচনায় উঠে আসে পদ্মশ্রী, ‘ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’, ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’, আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং ‘অ্যাকাডেমি দে বো-আর্টস’-এর ‘উইলিয়াম ক্লাইন ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড’সহ বিভিন্ন সম্মানের প্রসঙ্গ।
দেওয়াল পত্রিকা ‘উইন্ডো’-য় পড়ুয়াদের তৈরি আলোকচিত্রভিত্তিক উপস্থাপনা এবং রঘু রাইকে ঘিরে সৃজনশীল কাজও প্রশংসা কুড়োয়। বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুশপিতা দাস এবং গ্রন্থাগারিক তথা আইকিউএসি সমন্বয়ক ড. সরিতা ভট্টাচার্য পড়ুয়াদের ভাবনা ও উপস্থাপনার অভিনবত্বের প্রশংসা করেন।
উপাধ্যক্ষ ড. শান্তনু দাস ফিরে যান নিজের স্কুল-কলেজ জীবনের স্মৃতিতে। তিনি জানান, ছাত্রজীবনে রঘু রাইয়ের বহু ছবি দেখলেও তখন সেই সব ছবির অন্তর্নিহিত অর্থ কিংবা দৃশ্যভাষার গভীরতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি। এ দিনের আলোচনা তাঁর পাশাপাশি পড়ুয়াদেরও রঘু রাইয়ের বিশাল ও বহুমাত্রিক সৃষ্টিকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্ব আলোকচিত্র দিবসের অনুষ্ঠানটি ক্যামেরার ফ্রেম কী ভাবে সমাজের দলিল, ইতিহাসের সাক্ষী এবং মানুষের অনুভূতির ভাষা হয়ে ওঠে, ‘উইন্ডো’-র মধ্য দিয়ে সেই কথাই যেন নতুন করে বললেন উইমেন্স কলেজের পড়ুয়ারা।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিভাগের অতিথি শিক্ষক গ্লোরিয়া গ্রেস সিরকার। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিভাগের অতিথি শিক্ষক শিবপ্রিয়া পুরকায়স্থ।

