Barak UpdatesHappeningsBreaking News
ইতিহাসের আলোকে লক্ষীপুর মহকুমা (২য় খণ্ড) : গ্রন্থ আলোচনায় সঞ্জীব দেবলস্কর

//সঞ্জীব দেবলস্কর//
মাঝে মাঝে বিজ্ঞজনের ভাষণে শোনা যায়, আমাদের গ্রামেগঞ্জে ছড়ানো ইতিহাসকে উদ্ধার করে জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন। ইতিহাস-বিহীন একটা জাতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কেউ আবার বঙ্কিমচন্দ্রের উদ্ধৃতি দিয়েও বলেন—‘এই ইতিহাস কে লিখিবে—আমি লিখিব, তুমি লিখিবে’ ইত্যাদি। কথাটি বলা সহজ, কাজে নামাটা তা নয়।
কাছাড় যে একটা সময়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল—এ রাষ্ট্রে প্রাচীন, মধ্যযুগ হয়ে প্রাগাধুনিক কালে একাধিক রাষ্ট্রশক্তি ক্ষমতায় আসেন—এর অসম্পূর্ণ, খণ্ডিত একটা পরিচয় বা আভাস আমরা কিছু কিছু গ্রন্থ, বিক্ষিপ্ত নিবন্ধাদিতে পেয়েছি। কিন্তু অঞ্চলটির বিবর্তন, জনবিন্যাস, রাষ্ট্রনৈতিক ভৌগোলিক অবয়বের কোনও সুস্পষ্ট চিত্র আমাদের সামনে না থাকায় প্রাক্-স্বাধীনতা কাল থেকেই নানা জনের প্রয়াস, অপপ্রয়াসে এখানকার ইতিহাসের তথ্য বিকৃতি ঘটে চলেছে। বলা বাহুল্য, ঔপনিবেশিক আমলে বাংলা প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত প্রশাসনিক ইউনিট সুরমা ভ্যালির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার এ প্রয়াস অদ্যাবধি জারি আছে। কাছাড়ে (বরাক উপত্যকা) গ্রামসৃষ্টি, জনবিন্যাস এবং সামাজিক বিবর্তনের ধারাবাহিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে রাখার কোনও প্রয়াস না থাকায় বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে অঞ্চলটির যথার্থ পরিচিতি ঝাপসা করে দেওয়ার চক্রান্ত খুবই সচল।
এমতাবস্থায় কোনও প্রাতিষ্ঠানিক অবশ্যকৃত্য হিসেবে বা অন্য কোনও চাপে নয় নিজের দেশ, জাতি এবং সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতায় বৃহত্তর লক্ষীপুর মহকুমাকে ভিত্তি করে একেবারে একক প্রয়াসে শিক্ষাবিদ আবিদ রাজা মজুমদার রচনা করলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ তাঁর magnum opusই বলব একে, যেখানে বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের উপর এ প্রতিবেদন বিশেষ আশার সঞ্চার করে। একাধারে লোকসংস্কৃতি গবেষক, ভাষাতাত্ত্বিক অভিধানকার, রাজনীতি সচেতন নিরপেক্ষ সমাজকর্মী জয়পুর-রাজাবাজারের ভূমিপুত্র ভাষা আন্দোলনের সেনানী আবিদ রাজা আলোচ্য গ্রন্থটি নানা কারণে বরাক উপত্যকার সমাজ ইতিহাসের একটি আকরগ্রন্থই বটে। ইতিপূর্বে তিনি অবশ্য প্রশাসনিক স্তরে লক্ষীপুর মহকুমা গঠনের ইতিহাস নিয়ে একটি প্রাথমিক (১ম খণ্ড) কাজ সেরে রেখেছেন। বর্তমান গ্রন্থটি এরই সম্প্রসারিত পর্ব।
গ্রন্থের নান্দীপাঠে অতি বিনীত ভাবে লেখক বলেছেন—“উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ মহাশয় যে আগ্রহ এবং ঐকান্তিক অনুসন্ধান দ্বারা তথ্য সংগ্রহ করে ‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন, সে নিয়ে আমরা কাছাড়ের ইতিহাস অনুসন্ধানে ব্রতী হতে পারছি না বলে কাছাড় বা হেড়ম্ব রাজ্যের আরও সমৃদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করতে পারছি না।” উপেন্দ্রচন্দ্রের পর প্রকৃতপক্ষে একান্তভাবে এ কাজে ব্রতী হওয়া আমাদের আর হয়ে ওঠেনি, এটা সত্য। এরপর অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি মশাইয়ের ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের পরিশিষ্টে সামান্য উল্লেখ নিয়েই কাছাড়কে তৃপ্ত থাকতে হল। তবে আধুনিক পদ্ধতিতে তথ্য এবং তত্ত্বের সংমিশ্রনে ইতিহাসবিদ সুজিৎ চৌধুরী এবং জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্য এ অঞ্চলটির প্রাচীন, মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন—সমাজ এবং রাষ্ট্রগঠনের প্রাথমিক স্তর নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানও করেছেন, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার কাজ অদ্যাবধি অধরাই রয়ে গেল। উপরিউক্ত দুজনের কাজই মূলত macro level-এ। আবিদরাজা মজুমদারের কাজটি এখানে একটি ব্যতিক্রমী। তিনি একটি বৃহৎ প্রেক্ষাপট চোখের সামনে রেখে সমাজের প্রান্তবর্তী, নিচু, অর্থাৎ তৃণমূল স্তর থেকে ইতিহাস রচনায় হাত দিলেন। এটাকে বলা চলে micro level-এর ইতিহাস। নিম্নবর্গীয় ইতিহাসবেত্তাদের মতো এও এক নিম্নবর্গীয় অর্থাৎ sub-altern ইতিহাস। বলা প্রয়োজন, বিষয়টিকে অবশ্য তিনি কোনও ভাবেই তত্ত্বায়িত করার চেষ্টা করেননি।
অনেকগুলো পর্বে বিভাজিত বইটির অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জনবসতির প্রেক্ষাপট। লক্ষীপুর তাঁর অভীষ্ট হলেও উপত্যকার অপরাপর অঞ্চলের জনবিন্যাস, বিভিন্ন জনজাতির কথা উঠে এসেছে এখানে। ডিমাসা, মার, কুকি, নাগা, কোচ রাজবংশী, খাসিয়া, নেপালি, চিরু ইত্যাদি ইন্দো-ইউরোপীয়, তিব্বত-চিনা, তিব্বত–বার্মা এবং অস্ট্রিক-দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর সন্ধান দিয়েছেন এ লেখক। এ সঙ্গে উত্তর, মধ্য এবং দক্ষিণ ভারত থেকে চা শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত মুণ্ডা/মূঢ়া, সাওতাল, ভূমিজ, শবর, কুরক খাড়িয়া, কোল, গোঁড় জনগোষ্ঠীর সন্ধান তিনি দিয়েছেন। আমরা কি এসব জানতাম? সাধারণত একটি চা বাগানে ‘চা-শ্রমিক’ পরিচিতির আচ্ছাদনে বিচিত্র জনগোষ্ঠীকে গড়ে একটি বিশেষ অভিধা দিয়ে চিহ্নিত করে এদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ঢেকে ফেলা হয় (রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এ কাজটি অমানবিক তো বটেই)। আবিদ রাজা মশাই এদিকে খুব সচেতন। ব্রিটিশ প্রশাসক-গবেষকদের গ্রন্থে এ সব তথ্য রয়েছে। কে আর এসব খুঁজে দেখবে, কেনই বা দেখবে? আমাদের দেশীয় প্রশাসকদের অত সময়ই বা কই? তবে মজুমদার স্যারের হাতে পর্যাপ্ত সময় বোঝা গেল। নইলে এসব Social Anthropologyর বিষয় খুঁজে খুঁজে বের করা কি সহজ কম্ম? তাঁকে তো আর কেউ গামোছা বেঁধে ফটো তুলবে না, গাঁটের কড়ি খরচা করে প্রকাশ করা তাঁর বই কে-ই বা কিনে পড়বে? তবে হ্যাঁ, এরকম উদ্যোগের পেছনে দাঁড়ানোর মানুষও মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। ‘ভ্যালি হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ অবশ্যই। ‘মালতি প্রিন্টার্সে’র প্রতি কৃতজ্ঞতাও এক্ষুণিই জানিয়ে রাখি। মনে আসছে গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগে দীর্ঘদিন ‘দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গে’র রবিবারের পাতায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল এ ইতিবৃত্ত। কিন্তু বইতে এ কথাটির উল্লেখ নেই কেন জানি না। এসব কথা অবশ্য পরেও বলা যেত। তবে পাঠক, আমার কথাটি এখানেই শেষ হচ্ছে না। আরও দুটো কথা যে না-বললেই নয়।
বলছিলাম লেখক তাঁর নির্ধারিত অঞ্চলটির অন্দরে কন্দরে পাহাড়তলি, বস্তি, পুঞ্জি, গ্রাম বস্তিতে পায়ে হেঁটে বিচরণ করে মানুষজনকে দেখে, এদের সঙ্গে মেলামেশা করে তবেই বইটি লিখেছেন। তাঁকে ‘আর্ম চেয়ার হিস্টরিয়ান’ বলা যাবে না।
আরেকটি দিক হচ্ছে এখানে সাবেক কাছাড়ের উত্তরে মণিপুর, উত্তর কাছাড় এবং সীমানা পেরিয়ে বার্মা কিংবা নাগারাজ্য এবং লুসাই পাহাড়ের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী রাস্তার সুলুক সন্ধান। খ্রিস্টপূর্বাব্দেও এ অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনার কথা লেখক বলেছেন এবং এতে লক্ষীপুরকে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন। প্রকৃত পক্ষে মণিপুর হয়ে পূর্বদেশ, উত্তর-কাছাড়ের পার্বত্যভূমি হয়ে আরও পূর্বাভিমুখী সংযোগের যে রাস্তা লক্ষীপুর ছুঁইয়ে কাছাড়ের প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছেছে এ পথরেখাটি মোটামুটি স্পষ্টভাবেই তিনি চিহ্নিত করেছেন। বি, সি অ্যালেন, পেমবার্টন –এর প্রতিবেদন অনুসরণ করে শুধু কাছাড়-মণিপুর, কাছাড়-নাগাল্যান্ড যোগাযোগের পথ সন্ধানই নয়, রাজারবাজার লাংগ-মাহুর সড়ক, বাঁশকান্দি-জয়নগর-আকুই পথ, বাঁশকান্দি-কওপুম-লুমগান্টন রাস্তার ধারণাও স্পষ্ট করেছেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুথিগত বিদ্যার সংমিশ্রনেই কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।
মণিপুর থাওবান-মুরে কুবো হয়ে নিংথি নদীবন্দর কিংবা নাগা পাহাড়ের দক্ষিণাঞ্চল, এবং মণিপুর-লুশাই রাজ্যের মধ্যে প্রাচীন নৌবাণিজ্য পথের হদিশ আছে এখানে। ফুলেরতলের পাশে প্রসিদ্ধ যে মার্কুলিন স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এই একই নামে সিলেটে একটি স্টিমার স্টেশনের উল্লেখ করে আবিদ রাজা বলছেন, সিলেট জেলার কুশিয়ারা-সুরমা সঙ্গম স্থলে ‘মার্কলি’নদী বন্দরের অনুকরণে ফুলের তলের ‘মার্কুলিন’ হওয়া অস্বাভাবিক না হতেই পারে।
আবিদ রাজা কাছাড়ে জনজাতিদের বিভিন্ন সংগঠন সংস্থার হদিসও দিয়েছেন—ডিমাসাদের প্রগতিবাদী সংগঠন ‘নিখিল কাছাড় হৈড়ম্ব বর্মণ সমিতি’, ‘মার ন্যাশনেল ইউনিয়ন’, , ‘কাছাড় হিল ফেডারেশন’, ‘মার লিটারেচার সোসাইটি’ এসবের খবর উপত্যকাবাসী কয়জনই বা রাখে! এছাড়াও তিনি অসংখ্য পুঞ্জি, উপজাতি বস্তির তালিকা তো দিয়েছেনই, সে সঙ্গে লক্ষীপুরের স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের পূর্ণাংগ তালিকাও সংগ্রহ করেছেন। সমতলবাসীরা শহরের চৌহদ্দির বাইরে এসবের খবর রাখাটা জাতীয় সংহতির জন্যও জরুরি।
এ বইটিকে একটি নির্ভরযোগ্য হ্যান্ডবুক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যে সব তথ্য এতে রয়েছে সবগুলোই মূল সূত্র থেকে এবং ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকে লব্ধ। সঙ্গে প্রচুর ফটোগ্রাফিও রয়েছে।
যারা কোন বিদ্যায়তনিক প্রয়োজন ছাড়া নিজ দেশ, নিজ অঞ্চলকে ভালোবাসেন, এদের কাছে এ বই নিত্য সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। এরা কাছাড় জেলার মানুষজন, বৃক্ষ লতাপাতা, নদী নালা, পাহাড় টিলা, ব্রিজ, ধর্মীয় স্থান সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন এ বইয়ের পাতায় পাতায়। লেখকের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ এরকম একটি কাজ করে দেবার জন্য।
(ইতিহাসের আলোকে লক্ষীপুর মহকুমা (২য় খণ্ড), আবিদ রাজা মজুমদার, নতুন দিগন্ত প্রকাশনী, শিলচর)


