Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story
অধ্যাপক জগন্নাথ রায়চৌধুরী স্মরণে লিখেছেন সঞ্জীব দেবলস্কর

// সঞ্জীব দেবলস্কর//
উনিশ শো পঁচাত্তরের গ্রীষ্মের কোনও এক দুপুরের কথা বলি, ক্লাসভর্তি পড়ুয়াদের চোখের সামনে তিনি উপস্থাপন করেছিলেন বীরভূমের রুক্ষ, রিক্ত মাঠের দিকে তৃষাতপ্ত মানুষের চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকার দৃশ্য। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই কথাগুলো বলছেন তিনি– এরকম প্রখর তপন তাপে পুড়ে যাওয়া, জ্বলে যাওয়া মাঠে চৈত্রের দুপুর কিংবা খরবৈশাখে হঠাৎ কালো মেঘের ভ্রুকুটি আর গুরু গুরু গর্জনের সঙ্গে ঝড়ো হাওয়ার তাণ্ডব! নিপুণ চিত্রকরের মতো শব্দ দিয়ে, বাক্য দিয়ে এরকম একটা দৃশ্যপট যখন রচনা করছেন অধ্যাপক জগন্নাথ রায়চৌধুরী, তখনও আমরা বুঝতে পারছি না তিনি যে রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতা পড়ানোর আয়োজন করছেন। তারপর তিনি শুরু করলেন—
ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে
জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভরভসে
ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা
শ্যামগম্ভীর সরসা।
পরবর্তী একটি ঘন্টা আমরা ক্লাসরুমে বসে গ্রীষ্মের ছবি প্রত্যক্ষ করলাম, মনে মনে চলে গেলাম থেকে অনেক দূরে– নিজেদের গ্রাম, বাগান, শহরতলির অভিজ্ঞতায়। কবিগুরুর বর্ণনা, জগন্নাথ স্যারের উপস্থাপনা, আর আমাদের মানসভ্রমণ সবকিছুর নিট ফল হল, আমরা নিজের দেশের নিসর্গ, পরিবেশ-প্রকৃতিকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। অনুভব করলাম কবিতা, বিশেষ করে রবীন্দ্র কবিতা কোনও কল্পনা বিলাস নয়। বর্ষামঙ্গলের প্রতিটি শব্দের ভিতরে যে লুকিয়ে আছে এতদিন না-দেখা জগৎ, জগৎটি বুঝি একান্তই জগন্নাথ স্যারের উপহার। তাঁর সেই সুনির্বাচিত অজস্র শব্দে পরিপূর্ণ কথনে মিশে রয়েছে আমাদের শ্রুত এবং অশ্রুত রবীন্দ্রসংগীতের ভিতর লুকিয়ে থাকা অসংখ্য চিত্রকল্পও।

আমাদের পাঠক্রমে ছিল ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ গ্রন্থে সংকলিত ‘নববর্ষা’, ‘আষাঢ়’, কিংবা ‘কেকাধ্বনি’র অনুষঙ্গ, যেখানে তাঁর অনায়াস বিচরণ, যেখান থেকে তিনি এ সম্পদগুলি কথার এখানে-ওখানে গুঁজে দিচ্ছেন। বর্ষার অনুষঙ্গে তিনি আনছেন কালিদাসের মেঘদূতের প্রসঙ্গ, রামগিরি পর্বতে নির্বাসন দণ্ডে দণ্ডিত বিরহী যক্ষের অন্তর্বেদনা। তিনি বলছেন, আষাঢ়ের প্রথম দিনে যারা প্রিয়ার কণ্ঠলগ্না হয়ে আছেন তাদেরই উতলা হয়ে যাওয়া মনের কথা, ইঙ্গিত করছেন যে-আছে দূর বিদেশে তাঁর দুঃসহ মর্ম বেদনার দিকে। এ অবস্থায় নির্বাসিত প্রেমিক যক্ষ মাথার উপর আকাশে বিচরণশীল মেঘকেই তাঁর দূত হিসেবে অলকাপুরিতে প্রিয়ার কাছে তাঁর বার্তা নিয়ে যেতে অনুনয় করছে। শুধু অনুনয়ই নয় — কোন পথে অলকাপুরিতে যেতে হবে এবং পথিমধ্যে কোথায় কোথায় কী দেখতে পাবে তারও অনুপুঙ্খ বর্ণনাও দিয়ে যাচ্ছে যক্ষ। এ অনুপম কাব্যকথা শুনতে শুনতে আমরা যে মহাকবি কালিদাসের কালে দক্ষিণভারত থেকে উত্তরে হিমালয় পর্যন্ত ভৌগোলিক অঞ্চলের একটি চিত্র পেয়ে গেলাম, এ আমাদের অতিরিক্ত পাওনা।
তবে ‘বিচিত্র প্রবন্ধে’র পাঠগুলো পড়ানোর দায়িত্ব অবশ্য ছিল শ্রদ্ধেয় সুধীর সেন স্যারের। তাই বোধহয় সৌজন্যবসত জগন্নাথ স্যার এখানে বেশিক্ষণ স্থিতি নিতেন না। তবে সাহিত্যের নানা দিকে আমাদের কৌতূহলটা উসকে দেওয়াই ছিল বোধহয় তাঁর প্রধান কাজ।
এমনটিই তিনি বলেছিলেন আমাদের গ্রামের স্কুলে বাহাত্তর সালে, ঋষি অরবিন্দ জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে– যেখানে সূচনায় ছিল তাঁর সবিনয় উক্তি: ‘আমি কি এত বড় একজন মনীষীকে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে পারব? তবে আমি চেষ্টা করব শিক্ষক শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী সহ বয়োজ্যেষ্ঠ অতিথিদের মনে এ মনীষীর জীবন, সাধনা ও কর্ম সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ কৌতূহল জাগিয়ে তোলার।’ অতিথির আসনে রাজা স্কুল ছাড়াও পার্শ্ববর্তী স্কুলের শিক্ষকরা এবং শিলচর থেকে আগত রাধামাধব কলেজের অধ্যক্ষ রথীন্দ্র ব্রহ্মচারী, সংগীত শিল্পী শিবানী ব্রহ্মচারী (উদ্বোধনী সংগীত তিনিই গেয়েছিলেন)। মনে আছে পরবর্তী একটি ঘন্টা ছিল হলভর্তি অভিভাবকসহ গ্রামীন ছাত্রছাত্রীদের বিষ্ময়াবিষ্ট শ্রবণ। এতে এসেছে বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত এবং অগ্নিযুগের সংগ্রামীদের কথা, এসেছে আলিপুর বোমার মামলা, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের কথা, অরবিন্দ ঘোষের প্রথম জীবন এবং সেখান থেকে তাঁর ঋষি অরবিন্দে উত্তরণের কথা, আর ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘সার্থক জনম’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফলে’র কলি উচ্চারণে দেশপ্রেমের জোয়ারে সারা স্কুলবাড়ির ইট-কাঠ-পাথর ছাড়িয়ে সবুজ ঘাসের মাঠ ভাসিয়ে দেওয়া। এ অনুভূতি সদ্য মাধ্যমিক পাশ করা এ ছাত্রের দেহমনে যে রোমাঞ্চ জাগিয়ে তুলেছিল সেই দিন, এ স্মৃতি আজও সজীব।
সেই রাতে তিনি আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন আমাদের বাড়িতে। তাঁর উপস্থিতি অবশ্যই বাড়িটিকে উৎসবমুখর করে তুলেছিল। অনেক রাত পর্যন্ত আমাদের পিতৃদেবের সঙ্গে তিনি কী গল্প করলেন জানি না, পরদিন বিদায় নেবার সময় দুজনের সেই উষ্ণ আলিঙ্গনের দৃশ্য চোখে ভাসছে আজও।
জগন্নাথ স্যারের পাঠদানের প্রসঙ্গে আরও একটু যাই। তাঁর কাছে নজরুল ইসলামের কবিতা ‘বিদ্রোহী’র পাঠ নেওয়ার স্মৃতি আজও শরীরে রোমাঞ্চ জাগায়। পরপর কয়েক দিন টানা পাঠের শেষে কবিতা যখন সমাপ্তির দিকে এগিয়ে ছিল, এল সেই অমোঘ পঙক্তি ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত’, এবং পরে আবার কবিতাটির মুখটি যখন ঘুরে যাচ্ছিল সূচনা বিন্দুর দিকে, স্যার পাঠ বন্ধ করে বলে উঠলেন ‘এ বিদ্রোহ শেষ হয়নি, তাই কবিতার গতি চক্রাকারে আবার সূচনার দিকে চলছে–।’… ‘এখনও বিদ্রোহীর ক্লান্ত হবার, ক্ষান্ত হবার সময় আসেনি। কারণ? অত্যাচারীর খড়্গ কৃপান এখনও ভীম রণভূমে রণিছে, তাই cyclic order এ কবিতার এই প্যাটার্ন।’
এ দীর্ঘ অগ্নিঝরা কবিতাটি কাজি সব্যসাচীর কণ্ঠে শুনেছি রেকর্ড চালিয়ে, শিলচর জেলা গ্রন্থাগারে বসে শুনেছি দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও। তবু জগন্নাথ স্যারের ক্লাসে ভাষ্য সহ সেই শোনা–এ তো আজও আমার (অবশ্যই আরও অনেকেরই) শ্রবণকে আচ্ছন্ন করে আছে। সেই অবধি ‘শ্রবণ আমার সেই গভীর সুরে হয়েছে মগন।’
এ হেন মাস্টারমশাই এত দিন বেঁচে ছিলেন সেটা আমাদের গোচরে এল তিনি প্রয়াত হবার পর ২২ মে। মনে এল রবিগানের কলিটি—
এল যখন সাড়াটি নাই গেল চলে জানাল তাই।
এমন করে আমারে হায় কে বা কাঁদায় সে জন ভিন্ন।
আক্ষেপ হয়, আমাদের এ নির্বাসিতা ভূমিকে আপন করে ছিলেন যতদিন কর্ম উপলক্ষ্যে তিনি এখানে ছিলেন, তিনি কয়েকটি প্রজন্মের মুখে জুগিয়েছেন ভাষা—আজ তিনি নেই কিন্তু সবার মুখে কত কথা। ভাষা সাহিত্য শিক্ষার জগতে তিনি যে এক কিংবদন্তি স্বরূপ এটা আমরা শুনছি, আরও শুনব। কিন্তু তাঁর জন্য না কোনও সম্মাননা, না একখানা সম্মাননাগ্রন্থ– কিছুরই সংস্থান করতে পারলাম না আমরা। চোখের সামনে দু’দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটল, বলতে কুন্ঠা নেই, বঙ্গসাহিত্যেরও শ্রীবৃদ্ধি হল, আমরা তাঁকে মনে রাখিনি। তিনি তো আমাদের সুযোগ দিয়েছিলেন, যেমন সুযোগ দিয়েছিলেন পুরো একশোটি বছর আমাদের মধ্যে বেঁচে থেকে আরেক কিংবদন্তি শিক্ষক অমরেশ দত্ত। আজ এরা এসবের উর্ধ্বে। গুরুঋণ শোধ করা যায় না, কিন্তু আমরা এ ঋণটুকু স্বীকার করেও উঠতে পারিনি এ আমাদের সামূহিক লজ্জা।
কিঞ্চিৎ কুণ্ঠার সঙ্গেই জানাই ১৯৭৭ সালে শিলচর জেলা গ্রন্থাগারে ‘কাছাড় বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’-এর (তখনও বর্তমান নামে প্রতিষ্ঠানটির উত্তরণ হয়নি) ৮ ও ৯ জানুয়ারিতে দুই দিবসীয় অধিবেশনের শেষদিন অনুষ্ঠিত প্রকাশ্য অধিবেশনে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অতি প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবের উপস্থাপক ছিলেন এই অধ্যাপক জগন্নাথ রায়চোধুরী। প্রস্তাবটি ছিল নিম্নরূপ:
“অসম প্রকাশনী এ যাবৎকাল আসামে বাংলা ভাষায় লিখিত পুস্তকাদি প্রকাশ করে নাই। এই পরিপ্রেক্ষিতে সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, অসম প্রকাশনীকে আসামে বাংলাভাষায় লিখিত উপযুক্ত এবং উন্নত মানের পুস্তকাদি প্রকাশের ব্যাপারে আগ্রহী হইতে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে অনুরোধ করা হউক।” প্রস্তাবটির সমর্থক ছিলেন প্রভাতরঞ্জন চন্দ। ওই অধিবেশন-সভাপতির আসনে ছিলেন এ অঞ্চলের সুসন্তান, পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত কবি রামেন্দ্র দেশমুখ্য।



