Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

অরুণ হাতে নতুন ধাঁচে, লিখেছেন উত্তমকুমার সাহা

//উত্তমকুমার সাহা//

শিলচর শহরের রাঙ্গিরখাড়িতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মূর্তি প্রতিস্থাপন করা হল। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভাস্কর অরুণ যোগীরাজ এটি নির্মাণ করেন। দিন পনেরো আগে মাইশূর থেকে আনা হয় এই মূর্তি। একই লরিতে আসে এর পেডেস্টাল বা বেদী । পাথরে খোদাই করা বেদীর ওপর ব্রোঞ্জে নির্মিত নতুন মূর্তি আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনানায়কের।

রাঙ্গিরখাড়িতে অবশ্য আগে থেকেই নেতাজি মূর্তি বসানো ছিল। সেটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল ১৯৮৩ সালের ২৬ জানুয়ারি। একে বদলে কেন নতুন মূর্তি বসানো হচ্ছে, এর ব্যাখ্যায় বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, শহরের বর্তমান জনসংখ্যা ও আয়তনের তুলনায় পুরনো মূর্তিটিকে খুব ছোট আকারের দেখাচ্ছিল। রাস্তার উচ্চতা বৃদ্ধির দরুন ওই মূর্তিকে উপরে তোলাও জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই তিনি বিধায়ক হওয়ার পর প্রথম নেতাজি জয়ন্তীতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, চার দশক আগে বসানো মূর্তিকে উপরে ওঠানোর কসরত না করে বড় আকারের একটি নতুন মূর্তি ওখানে বসাবেন। সেই ভাবনারই ফসল নতুন এই মূর্তি।

গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর তথা ১৪৩১ বঙ্গাব্দের ১৩ পৌষ রাঙ্গিরখাড়ি থেকে সরানো হয় পুরনো মূর্তিটি। ওই দিনই সেখানে ভূমিপূজনের মাধ্যমে নতুন মূর্তি নির্মাণের বৈদিক সঙ্কল্প করা হয়। পুরনো মূর্তিটি এখন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে গান্ধীবাগে সংস্থাপিত রয়েছে। একে পরবর্তী সময়ে সুভাষনগরে নিয়ে বসানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন দীপায়ন।

অরুণ যোগীরাজ এখন যে মূর্তি তৈরি করেছেন, সেটি পুরনো মূর্তির উচ্চতার প্রায় দ্বিগুণ। সাড়ে ৯ ফুট বেদীর ওপর ১০ ফুট উঁচু নেতাজি সুভাষচন্দ্র।

এই মূর্তি নবনির্মাণকে কেন্দ্র করে আড়াই বছর ধরে প্রায়শই চলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা মূলক অনুষ্ঠান। প্রতিযোগী শিশু-কিশোরদের মূলত নেতাজি চর্চায় মনোনিবেশ করানোই ছিল উদ্দেশ্য।

১৯৩৮ সালের ২৪ এপ্রিল প্রথমবার শিলচরে এসেছিলেন সুভাষচন্দ্র। সেই দিনটির কথা নতুন প্রজন্মকে নতুন করে জানাতে ২০২৩ সালে ওই একই দিনে কাছাড়ের স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে শিলচর গান্ধীভবনে বক্তৃতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রথম,দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারী সহ প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে নগদ পুরস্কার প্রদান করে উৎসাহিত করা হয়। পরের মাসে ২৮ মে ইন্ডিয়া ক্লাব ইন্ডোর স্টেডিয়াম ও সেলিব্রেশন বেনকোয়েট হলে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কাছাড় জেলা ভিত্তিক অঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। চারটি গ্রুপের এই প্রতিযোগিতা উত্তর পূর্ব জুড়ে রেকর্ড গড়ে। মোট ১৭৬০ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেন। এই অঞ্চলে কোনও অঙ্কন প্রতিযোগিতায় এত বিশাল সংখ্যক শিশু-কিশোরের অংশগ্রহণের কথা আমার অন্তত জানা নেই। প্রত্যেক গ্রুপের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারীকে নগদ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে শিলচর ক্যুইজ ফেস্ট-এর সঙ্গে যৌথভাবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও লাচিত বরফুকনের স্মৃতিতে জাতীয় স্তরের ক্যুইজ প্রতিযোগিতাও আয়োজিত হয়।

এর পরেই গত ৭ আগস্ট আরেক রেকর্ড গড়ে বরাক উপত্যকা। সেদিন নেতাজির ওপর রচনা লিখে নবম ও দশম শ্রেণির ৫৫ হাজার ছাত্রছাত্রী। পরে সেখান থেকে মনোনীত ৪০৪ জন ছাত্রছাত্রী গত ১৯ আগস্ট শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থার গ্যালারিতে বসে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এও এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শতদল ভট্টাচার্য, রুমলি ভট্টাচার্য প্রমুখ।

এ সবের সূচনা অবশ্য ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তারিখে হয় । শিলচরের বিশিষ্ট নাগরিকদের রাঙ্গিরখাড়িতে আহ্বান করে বিধায়ক চক্রবর্তী তাঁর ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন সেদিন। সবাই একবাক্যে তাঁর প্রস্তাবে সায় দেন। সেদিনই বৈঠকে বসে মূর্তি নবনির্মাণের রূপরেখা তৈরি করা হয়। উপস্থিত ছিলেন পুরনো মূর্তি নির্মাণের সময়ে গঠিত মর্মর মূর্তি সংস্থাপন সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যও। ওই বৈঠকে পুরনো মূর্তি নিয়ে তিনি তাঁর আবেগের কথা বললেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একে যে সরানো প্রয়োজন, তাও স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেন। ফলে কোনও বিতর্ক ছাড়াই এগিয়েছে নেতাজি মূর্তি নবনির্মাণের কাজ। ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি বিভিন্ন অংশের মানুষকে নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় গঠিত হয় শিলচর নেতাজি মূর্তি নবনির্মাণ ও স্থাপনা কমিটি। আহ্বায়কের গুরুদায়িত্ব প্রদান করা হয় বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তীর কাঁধে। তাঁর সঙ্গে আমাকে মনোনীত করা হয় সহ-আহ্বায়ক পদে। কোষাধ্যক্ষ হন রুদ্র নারায়ণ গুপ্ত। সেদিনের সভায় উপস্থিত থেকে মূর্তি নবনির্মাণের প্রয়াসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন অতীন দাশ, তৈমুর রাজা চৌধুরী, নীহাররঞ্জন পাল, মূলচাঁদ বৈদ, নিত্যভূষণ দে, অংশু কুমার রায়, দেবজ্যোতি স্বামী, অরিজিৎ গোস্বামী, দেবাশিস সোম, মৃণালকান্তি রায় প্রমুখ।

 তবে নানা কারণে মূর্তি উন্মোচনের তারিখ পিছিয়ে দিতে হয়। প্রথমে এ বছরের নেতাজি জয়ন্তীতেই মূর্তি উন্মোচনের জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছিলাম। পরে ২৫ আগস্ট দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৩ সালে এমন দিনেই সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ২৫ আগস্ট সোমবার হওয়ায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, দুই দিন ব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। ২৪ আগস্ট রবিবার মূর্তি উন্মোচন এবং ২৫ আগস্ট নানা অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার অন্য কর্মসূচির জন্য আমাদের এক সপ্তাহ পিছিয়ে আসতে হয়।

শুধু মূর্তি প্রতিস্থাপনেই আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ বলে মনে করিনি। আহ্বায়ক তথা বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তী রোটারি পুনঃনির্মাণ সহ গোটা রাঙ্গিরখাড়ি এলাকাকে সাজিয়ে তোলার জন্য পুরসভা (বর্তমানে পুর নিগম) ও পূর্ত বিভাগ (এনএইচ)-র কাছে সৌন্দর্যায়নের পৃথক দুটি প্রস্তাব দিয়ে মঞ্জুরি আদায় করেন। গোটা বিষয়টিকে এক সূত্রে গেঁথে দেন ইঞ্জিনিয়ার সৌগত সোম। তাঁকে যোগ্য সহযোগিতা করেন সঞ্জয় রায়।

দেশের অন্যতম প্রধান সেনানায়কের মূর্তি বসছে বলেই সব কাজ নির্বিঘ্নে এগিয়েছে, ব্যাপারটি কিন্তু তা নয়। বিদ্যুতের খুঁটি সরানো, পিএইচইর লাইন মেরামত ইত্যাদি কাজে বিভাগীয় কর্তারা সহযোগিতা করলেও সে জন্য কম হ্যাপা পোহাতে হয়নি। সরকারি জমি দখলমুক্ত করে রাস্তার পরিসর বাড়াতে গিয়ে আইন-আদালতও হয়েছে। দফায় দফায় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করতে হয়েছে। এর পরও একেবারে একশো শতাংশ মানুষকে সহমতে এনে এই কাজ করা সম্ভব হয়েছে, এমন দাবি করা যায় না, তা খোলামেলা স্বীকার করে নিচ্ছি।

শুরুর দিকে সভায় গেলেই শুনতাম, মূর্তি নির্মাণের কাজ এই ভাবে করলে ৫০ লক্ষ টাকা ব্যয় হবে, ওই ভাবে করলে আরও ২০ লক্ষ টাকা লাগবে। ভাবতাম, এত টাকা তোলা যাবে! বিধায়ক তথা আহ্বায়ক দীপায়ন বলতেন, কারও কাছে টাকা চাইতে হবে না। নেতাজি মূর্তি নির্মাণের জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় টাকা দিয়ে যাবে। সন্দেহের চাহনিতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতাম। মূর্তি নির্মাণের জন্য অরুণ যোগীরাজের কাছে একটা অঙ্ক অগ্রিম বা বুকিং হিসেবে পাঠাতে হয়, তহবিলে অর্থ নেই। দীপায়ন বললেন, ওইটা আমি দিয়ে দিচ্ছি। আবার মূর্তি বানানোর পর বাকি টাকা পাঠাতে হয়। তখনও বিধায়ক বাইরে কারও কাছে হাত পাততে নারাজ। বরং ধার নিলেন রুদ্র গুপ্ত, দেবজ্যোতি স্বামী, মূলচাঁদ বৈদ ও নীলাভ মৃদুল মজুমদারের কাছ থেকে। সে সব দেখে কী হবে, কী হবে, ভাবছিলাম কেবল। কিন্তু সময় যত এগিয়ে এল, আমার বিস্ময়ের মাত্রা বাড়তে লাগল। প্রতিটি অনুষ্ঠানে কেউ নগদ টাকা নিয়ে, কেউ চেক নিয়ে এসে হাজির। এই করেই ধারদেনা শেষ হয়, নানা অনুষ্ঠানেরও ব্যয় সংকুলান হতে লাগল। দীপায়ন চক্রবর্তীর আত্মবিশ্বাসে ভরসা রেখে আজ বলতেই পারি, সকলের পাওনা মিটিয়ে দিতে সক্ষম হবো আমরা।

 সবচেয়ে স্বস্তির কথা, পূর্ণাবয়ব নতুন মূর্তিটি বসানোর সময় যারাই দেখেছেন, তাঁরাই বলেছেন, এই মূর্তি প্রকৃতই আমাদের অনুপ্রেরণা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker