India & World UpdatesFeature Story

কুম্ভদর্শনে আমি পরিতৃপ্ত, নেত্রকুম্ভ দিল স্বর্গীয় আনন্দ অনুভূতি, লিখেছেন ডা. এইচ কে চৌধুরী
It was an amazing experience at Kumbh Mela, eye camp for 50-days was unique part at Kumbh, writes Dr. H.K. Choudhury

ডা. এইচ কে চৌধুরী

পেশাগত জীবন বলুন, আর ব্যক্তিজীবন, সব সময়েই চেষ্টা করেছি, ভাল কাজে জড়িয়ে থাকতে। জানি না, কতটা কী করতে পেরেছি। আমার ওইসব কাজে কারও কোনও লাভ হয়েছে কিনা, সে হিসেব কষতে যাইনি কখনও। তবে এ টুকু নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, প্রাত্যহিক জীবনে আনন্দ পেয়েছি, খুব আনন্দ। যার উপর ভরসা করে সবাইকে নিয়ে বেশ সুখে আছি।

এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই, নানা ভাল কাজের মধ্যে এ বার কুম্ভমেলা ঘুরে এলাম। সে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং অবশ্যই দাবি করতে পারি যে, অন্য অনেক কুম্ভ পুণ্যার্থীদের চেয়ে আমার অভিজ্ঞতাটা আলাদা। সেজন্যই আমার তৃপ্তির জায়গাটাও ভিন্ন। মাত্র ৫দিনের জন্য গিয়েছিলাম। ফিরে আসার মাস পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজও বলতে বড় ভাল লাগে, এই কুম্ভদর্শনে আমি পরিতৃপ্ত। কতটা কী আর দিতে পেরেছি! কিন্তু কত কী যে পেলাম!

আমার কুম্ভদর্শন হলেও গিয়েছিলাম মূলত নেত্রকুম্ভ-তে। এই নেত্রকুম্ভ শব্দখানা কারও কারও কাছে নতুন মনে হতে পারে। তবে নেত্রকুম্ভ সম্পর্কে কিছু লেখার আগে আমি কুম্ভমেলা সম্পর্কে দু-চার কথা উল্লেখ করছি।

এ বারের কুম্ভমেলা ১৫ জানুয়ারি, মকর সংক্রান্তির পুণ্য লগ্নে শুরু হয়েছিল। শেষ হয় ৪ মার্চ। বিশ্বের এই বৃহত্তম ধর্মীয় সম্মেলনে প্রায় ২২ কোটি মানুষ ত্রিবেণীসঙ্গমে পুণ্যস্নান করেছেন। পৃথিবীর বহু দেশের ও বহু ভাষার মানুষকে সেখানে দেখেছি। পেয়েছি ভিন্ন ধর্মের কত বিদেশিকে যে! বেনারসে পরিচয় হল, ২২-২৩ বছরের এক যুবতীর সঙ্গে। বললেন, নরওয়ে থেকে এসেছেন। একা।

কুম্ভমেলার শুরু কবে হয়েছিল, এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে প্রায় ১৩০০ বছর পূর্বে চিনদেশের পরিব্রাজক হিউয়েন শাঙ লিখেছেন, সেই সময়ের কুম্ভমেলায় প্রায় ৫ লক্ষ পুণ্যার্থী স্নানে অংশ নিয়েছিলেন। কীসের টানে হাজার বছর ধরে এত মানুষ কুম্ভে আসেন, সেটাই আশ্চর্যের। ওই সময়ের মধ্যে নানা আক্রমণ, প্রলোভন, অত্যাচার আমাদের ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতির কম ক্ষতি করেনি। কিন্তু কুম্ভের প্রতি শ্রদ্ধা-আবেগের জায়গাকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি।

এ বার আসি নেত্রকুম্ভ প্রসঙ্গে। এ বারের কুম্ভমেলার বিশেষ আকর্ষণ ছিল নেত্রকুম্ভ। সেক্টর ছয়ের পাঁচ একর জায়গা জুড়ে নেত্রকুম্ভের জন্য বিশাল ছাউনি তৈরি হয়েছিল। কুম্ভমেলা শুরুর ৩দিন আগেই সেখানে বিনামূল্যে চক্ষুপরীক্ষার শিবির শুরু হয়। চলে টানা ৫০দিন। মূল দায়িত্বে ছিল সক্ষম নামে এক এনজিও। সঙ্গে আরও কিছু সেবামূলক সংস্থা। ভারতের প্রায় সব প্রদেশের ৪০০ জন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ১ হাজার অপ্টোমেট্রিস্ট, নার্স, প্যারা-মেডিক্যাল স্টাফ ও স্বেচ্ছাসেবকবাহিনী দিনরাত পরিশ্রম করে সাধুসন্ত ও ভক্তদের চোখের চিকিতসার জন্য সেবাদান করেছেন। বড় সৌভাগ্যের কথা, শিলচর থেকে আমরা ২জন সেই সুযোগ পেয়েছিলাম। ডা. সন্দীপস্বপন ধরকে নিয়ে প্রয়াগে সেই সেবাকার্যে অংশ নিয়েছিলাম। বিশাল কর্মযজ্ঞ। মনে বিরাট রেখাপাত করল। বলা যায়, সে এক স্বর্গীয় আনন্দ অনুভূতি।

আই ক্যাম্প বা চক্ষু শিবির বলতে আমরা যা বুঝি, এ কিন্তু তা নয়। চক্ষুপরীক্ষার সব ধরনের সুবিধে মজুত ছিল। এমন সুন্দর করে সাজানো ছিল ওপিডি কিউবিকল যে, মনে হবে আধুনিক কোনও করপোরেট হাসপাতাল। একেক কিউবিকলে ৩০টা রুম। রেজিস্ট্রেশন থেকে প্রেসক্রিপশন —সব ছিল কম্প্যুটারাইজড। প্রায় দেড় লক্ষ সাধুসন্ত ও ভক্তমণ্ডলীকে বিনাখরচে চশমা দেওয়া হয়েছে। বাকিদের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র দেওয়া হয়। আর ১০ হাজারের বেশি রোগীর অপারেশনের প্রয়োজন ধরা পড়ে। তাদের বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে ক্যাটারেক্ট অপারেশনে8র ব্যবস্থা করা হয়। এই অপারেশনগুলি এখনও চলছে।

বিভিন্ন সংস্থা নেত্রকুম্ভের রেকর্ড পরীক্ষা করে একে বিশ্বের সর্ববৃহত চক্ষুপরীক্ষা শিবির বলে শংসাপত্র দিয়েছে। এতে শরিক হতে পেরে আমি প্রকৃত অর্থেই নিজেকে গর্বিত বলে মনে করছি। সে জন্য কৃতিত্ব দিতে হয় স্থানীয় সক্ষম কর্মকর্তা মিঠুন রায়কে। অত্যন্ত কর্মোচ্ছ্বল যুবক। সে-ই প্রথম প্রস্তাবটা দেয়। লুফে নিতে দেরি করিনি। ডা. রমেশ আগরওয়াল তাদের উত্তর-পূর্ব কো-অর্ডিনেটর। তাঁর সঙ্গে আগে থেকে পরিচয় ছিল। মিঠুনের সামনেই তাঁকে ফোন করে পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিই। ডা. রমেশই জানালেন, যাওয়া-আসা নিজেদের। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা তাঁরা করবেন। ডা. সন্দীপস্বপন ধরকে বিষয়টা জানাই। ইঅ্যান্ডটি-র ডা. অরুণ ভট্টাচার্যও যেতে আগ্রহী হলেন। নিজেদের টাকায় টিকিট করে নিই। ডা. নীলোতপল বরা গুয়াহাটি থেকে গেলেন। মোট ৫জনের টিম হল অসম থেকে।

২৩ ফেব্রুয়ারি বেনারস বিমানবন্দরে পৌঁছুলাম। সেখান থেকেই আমরা চলে যাই সক্ষম-এর দায়িত্বে। তাঁরাই গাড়ি করে বেনারস থেকে প্রয়াগে নিয়ে গেলেন। ছাউনিতেই থাকার ব্যবস্থা করলেন। ব্যবস্থা কি বলব, সুব্যবস্থা। ২৩ তারিখেই রোগী দেখা শুরু করি। ২৪, ২৫ ও ২৬ তারিখে পুরো ব্যস্ততা। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত রোগীর দীর্ঘ লাইন। প্রতিদিন আমাদের কিউবিকলে ৫ হাজার রোগী দেখা হয়। পুণ্যার্থীদের সঙ্গে আশেপাশের গ্রামের মানুষও যান চিকিতসার জন্য। আমাদের সৌভাগ্য, চিকিতসা করতে গিয়ে এই ক-দিনে বেশ ক-জন নাগা সাধুসন্তর স্পর্শ পেয়েছি। তাঁদের দেখেছি, চশমা দিয়েছি। সেই ছোঁয়ায় নিজেকে ধন্য বলে মনে করি। কিন্তু অনেক সাধু জানেনই না, তারা এরই মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ফলে দ্রুত দৃষ্টিশক্তি কমছে। তাঁদের সতর্ক থাকতে বলেছি। প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছি।

আগেও বলেছি, ক্যাম্প তো নয়, এ যেন করপোরেট হাসপাতাল। কী ধরনের চিকিতসা সরঞ্জাম প্রয়োজন, সব মজুত ছিল। এমনকী, ফাঙ্গাস ক্যামেরা পর্যন্ত। মেলাপ্রাঙ্গণেই একদিন আবার অপ্টোমেট্রিস্টদের ক্লাশ নিই। সে কম বড় অভিজ্ঞতা নয়।

এ সবের চেয়ে বড় কথা, এত বড় আয়োজন! লক্ষ লক্ষ লোকের ভিড়! কিন্তু সব চলেছে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে।

শেষ করার আগে ফিরে আসি কুম্ভমেলার কথায়। নেত্রকুম্ভে গিয়েছি, আর কুম্ভের পুণ্যার্জন করব না, তা কী হয়! ২৭ ফেব্রুয়ারি কাকভোরে নৌকো ভাড়া করে ত্রিবেণীতে যাই। আমরা তিনজন। ভোরেই স্নানটা সেরে নিই। ৫০ দিনে ২২ কোটি মানুষ সেখানে গেলেন। অথচ যে বিষয়টি আশ্চর্য করেছে, কোথাও এতটুকু নোংরা পাইনি। ডালমুটের কাগজ, জলের খালি বোতল পর্যন্ত পড়ে নেই। আগে কখনও আমি কুম্ভমেলায় যাইনি। ফলে তুলনা করা মুশকিল। কিন্তু এ বার যে ব্যবস্থা দেখলাম, আমার মনে হয়েছে, এ-ই তো বড় শিক্ষা আমার কাছে। সারি সারি শৌচাগার। সাফাইকর্মীরা সারাক্ষণ মেলা চত্বরে ঘুরছিলেন। সকালে কাউকে ইতস্তত ঘুরতে দেখলেই শৌচাগার দেখিয়ে দিচ্ছেন। প্রতিটি শৌচাগারে পর্যাপ্ত জল। এত লোকের জলের ব্যবস্থা কী করে করলেন তাঁরা, ভেবে আশ্চর্য হই। বারবার মনে হয়, এইটুকুন শিলচর শহরটাকে আমরা পরিষ্কার রাখতে পারি না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker