Barak UpdatesHappeningsBreaking News

“১৯ গ্রাম ডিমা হাসাওয়ে স্থানান্তরিত করার প্রয়াসের পরিণতিতেই হরিনগরের ঘটনা”

ওয়েটুবরাক, ৬ অক্টোবর: বৃহত্তর জয়পুর-হরিনগর এলাকায় জনজাতি ও অ-জনজাতি বাসিন্দারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করে আসছেন। সম্প্রতি ১৯টি গ্রাম ডিমা হাসাওয়ে হস্তান্তর করার জন্য যে প্রস্তাব আনে বর্তমান অসম সরকার, এরই পরিণতিতে গতকাল দশমীর বিসর্জনকে কেন্দ্র করে অসামাজিক আচরণ করে কতিপয় ডিমাসা যুবক। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় জনগোষ্ঠীগত সামাজিক বিভাজনের বাতাবরণ তৈরি হয়। এই ঘটনার পেছনেও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করে স্বাধীন সমাজ, ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি ও অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়ন। এই মর্মে ‘স্বাধীন সমাজ’ ‘ ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি’ ও ‘ অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়ন’ এর পক্ষে একটি যৌথ স্মারকপত্র কাছাড়ে জেলা উপায়ুক্তের কাছে প্রদান করা হয়। সংস্থাগুলোর পক্ষে অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়নের কাছাড় জেলা সভাপতি মৃণাল কান্তি সোম, স্বাধীন সমাজের সুমন দে, ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনির অরিন্দম দেব কাছাড় জেলার আয়ুক্ত মৃদুল যাদবের সাথে দেখা করে মেমোরেণ্ডাম দেন ও সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। জেলা আয়ুক্ত বলেন, দশমীর প্রতিমা নিরঞ্জনের ঘটনাটির স্থানীয়ভাবে সমাধান হয়ে গেছে। ১৯টি গ্রাম ডিমা হাসাওয়ে স্থানান্তরিত করার বিষয়টি নিয়ে জেলার জনগণের উদ্বিগ্ন থাকার কথা জানালে, এ নিয়ে এখনও সরকারি কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান জেলা আয়ুক্ত। তিনি বলেন, এ বিষয়ে নাগরিকদের সাথে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জেলা আয়ুক্তের অফিসে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বজিৎ দাশ, দেবাশিস রায়, অভিজিৎ পাল, দেবাশিস ঘোষ ও মানস দাস।

তাদের বক্তব্য, জনজাতিদের ষষ্ঠ তপশিলির মাধ্যমে উন্নয়নের যদি সদিচ্ছা সরকারের থেকে থাকত তাহলে কাছাড়ের ১৯টি গ্রামের অ-জনজাতিদেরও ডিমা হাসাওয়ে ঠেলে দেওয়ার প্রস্তাব না করে, ১৯টি গ্রামের জনজাতি সেটেলাইট ক্লাস্টার এরিয়া ডিমার্কেট করে উন্নয়নের অংশীদার করতে পারত। সরকারের আসল উদ্দেশ্য হলো উন্নয়নের নামে জনগোষ্ঠীগত বিভাজন ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া।

 

দশমীর বিসর্জনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রশাসনকে অনতিবিলম্বে এলাকার ডিমাসা ও অ-ডিমাসাদের সামাজিক মিটিং ডেকে আলোচনার ভিত্তিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে বলে আর্জি জানিয়ে দোষী যুবকদের গ্রেপ্তার করে বিচার প্রক্রিয়ার অধীনে আনতে হবে।

 

অন্যদিকে কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত লক্ষীপুরের সার্কেল অফিসারের কাছে ১৮ আগস্টের এক চিঠিতে কাছাড়ের ১৯টি গ্রামে যথাক্রমে, ডিপু, কুমাছড়া, কালিনগর, জেমব্রু, পুটিছড়া, হরিনগর, ধর্মনগর, থাইপুঙ্গার, রাইলিঙ, মাসাপ, দলাইছড়া, সোনাপুর, কারাবিল, কনকপুর, জয়পুর, ওয়াটিলিং, লাংলাছড়া, লাডুমা, এবং লোদি গ্রামসমূহের জনবিন্যাস সম্পর্কে একটি রিপোর্ট ২০ আগস্টের মধ্যে জমা দিতে বলেন।

 

কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার দিলীপ নুনিসার নেতৃত্বে ডিএইচডি এবং জোয়েল গারলোসার নেতৃত্বে ডিএইচডি’র সাথে বিগত ৮ অক্টোবর, ২০১২ সালে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে ও আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ’র উপস্থিতিতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।এই চুক্তিতে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের শর্ত হিসাবে রাজ্যের হাতে ন্যস্ত বেশ কিছু ক্ষমতা ডিমা হাসাও অটোনোমাস কাউন্সিলে হস্তান্তর করার এবং এনসি হিলস কাউন্সিলকে তিনটি প্রশাসনিক ভাগে ভাগ করে ও ডিলিমিটেশনের মাধ্যমে প্রতিনিধি আসন বৃদ্ধির বিধান রয়েছে। শান্তি চুক্তির শর্ত হিসাবে ডিমা হাসাও অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী ডিমাসা-বসতি অঞ্চল অন্তর্ভুক্তির দাবি মেনে নেওয়া হয়। নির্দ্দিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দাদের মতাতের ভিত্তিতে জনজাতীদের ষষ্ঠ তপশিলিভুক্ত অঞ্চলের সাথে যুক্ত হতে চাওয়া তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। ডিমা হাসাওয়ের ক্ষমতাবৃদ্ধি ঘটুক এবং জনজাতীয়রা তাদের নিজস্ব স্বশাসন ভোগ করুক।

 

কিন্তু মূল স্বাক্ষরিত চুক্তির ধারাগুলির কোথাও পার্শ্ববর্তী জেলার কোনো অংশ ডিমা হাসাও ষষ্ঠ তপশীলি এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ নেই। অথচ বর্তমান অসম সরকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলির কিছু অংশ তাতে সংযোজিত করে সংকীর্ণ জনজাতীয় নির্বাচনী রাজনীতির ফায়দা নিতে চাইছে এবং একইসাথে আদানীকে তিন হাজার বিঘা জমি প্রদান নিয়ে যে বিবাদ হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে সেই আইনি বিবাদকে এড়িয়ে আদানিকে জমি প্রদান সুনিশ্চিত করতে এই সুচতুর কৌশল নিয়েছে। সুতরাং কাছাড় জেলার ১৯টি গ্রাম সংযোজিত করার প্রস্তাব জনজাতীয় ও অ-জনজাতীয় সকল বাসিন্দাদেরই স্বার্থের পরিপন্থী।

 

সরকারের রিপোর্টে কাছাড় জেলার যে ১৯টি গ্রামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার অধিকাংশ গ্রামে অ-জনজাতিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। উপরন্তু মিশ্র জনবসতির অঞ্চলকে জনগোষ্ঠীয় পরিচিতির ভিত্তিতে ভেঙে ফেলা সামাজিক মেলামেশা ও ভাবের আদানপ্রদানের মাধ্যমে সামাজিক ঐক্য গড়ে ওঠার পরিপন্থী।

 

উল্লেখিত এই ১৯টি গ্রামে চা-শ্রমিক ছাড়াও অসংখ্য অসংগঠিত ফর্মাল সেক্টরের শ্রমিক রয়েছেন যারা ষষ্ঠ তপশীলিভুক্ত কাউন্সিল এলাকায় যাওয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হবেন, কৃষক ও অন্যান্য অ-জনজাতি বাসিন্দারা জমি ও অন্যান্য অধিকার হারাবেন, মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন অধিকার খর্ব হবে। নাগরিকদের অধিকার শুধু সুরক্ষিত করাই নয়, জনগণের অধিকার বৃদ্ধি করা একটি নির্বাচিত সরকারের সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব ও কর্তব্য, কিন্তু সরকার তার দায়িত্ব এড়িয়ে এক্ষেত্রে যদি তড়িঘড়ি ১৯টি গ্রামকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে, তাহলে গণতান্ত্রিক ও আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

স্বাধীন সমাজ, ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি এবং অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়ন বিভাজনের মাধ্যমে শাসন করার ও জনগণের অধিকার খর্ব করার এধরনের ঔপনিবেশিক পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকার জন্য বিজেপি সরকারকে আহ্বান জানাছে। কাছাড় জেলা আয়ুক্ত যেভাবে মাত্র দু’দিনের সময় দিয়ে লক্ষীপুর সার্কেল অফিসারকে জনবিন্যাসগত রিপোর্ট দেওয়ার আদেশ করেছেন, তাতে সরকারের উদ্দশ্য নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধছে। আমরা সার্কেল অফিসারের রিপোর্ট অতিসত্ত্বর জনসমক্ষে আনার জন্য দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় লক্ষীপুর সার্কেল অফিসে বিক্ষোভ প্রদর্শনের কর্মসূচি নেওয়া হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker