NE UpdatesHappeningsBreaking News
মরণোত্তর পদ্মশ্রী : জাতীয় স্মৃতির পরিসরে ফিরে এলেন কবীন্দ্র পুরকায়স্থ

ওয়েটুবরাক, ২৪ জুন: প্রয়াত কবীন্দ্র পুরকায়স্থকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করার মধ্য দিয়ে তিনি আবারও জাতীয় স্মৃতির পরিসরে ফিরে এলেন। তবে বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে তিনি কখনও বিস্মৃত ছিলেন না। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী, শিলচরের তিনবারের সাংসদ এবং অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপির সাংগঠনিক ভিত্তি নির্মাণের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে কবীন্দ্র পুরকায়স্থ এমন এক রাজনৈতিক প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন, যাঁদের কাছে রাজনীতি ছিল সমাজসেবা, সংগঠন তৈরি এবং আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার সমার্থক।
তাঁর রাজনৈতিক উত্থান আকস্মিক ছিল না। দীর্ঘ সংগ্রাম, নির্বাচনে জয়-পরাজয়, নিরলস সাংগঠনিক পরিশ্রম এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। দেশভাগের ক্ষত বহন করে চলা বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে তিনি শুধু নির্বাচনে জয়ী একজন জনপ্রতিনিধিই ছিলেন না; তিনি ছিলেন উদ্বাস্তু মানুষের কণ্ঠস্বর, দেশভাগে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি হিন্দুদের মর্যাদার রক্ষক এবং সীমান্তবর্তী সমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও উদ্বেগের অকুতোভয় প্রতিনিধি।
১৯৩১ সালের ১৫ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের সিলেট জেলার কামারখালে প্রয়াত কালীপদ পুরকায়স্থ ও সর্বমঙ্গলা দেবীর পরিবারে তাঁর জন্ম। দেশভাগের অভিঘাত তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৫০-৫১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্যাতনের মুখে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু উদ্বাস্তুদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে নাগরিকত্ব, পুনর্বাসন, পরিচয় ও সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তি গড়ে দেয়।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন কৃতী। সিলেটে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি উধারবন্দের ডি.এন.এইচ.এস. স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষায় বিএ, বিটি এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সক্রিয় রাজনীতিতে আসার আগে তিনি নরসিং উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং পরবর্তীতে রামকৃষ্ণনগরের রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকজীবনের শৃঙ্খলা, সংযম এবং নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার মানসিকতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল।
জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯৫০ সালে সংঘে যোগ দেন। কাছাড়, ত্রিপুরা ও মণিপুরে সংঘের বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় উত্তর-পূর্ব ভারতে জনসংঘের সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল অত্যন্ত সীমিত। তবুও তিনি নীরবে জনসংযোগ, সামাজিক উদ্যোগ এবং কর্মী গঠনের মাধ্যমে সংগঠনকে শক্তিশালী করে তোলেন।
১৯৭৮ সালে জনতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে শিলচর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। জরুরি অবস্থার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং প্রয়াত অটল বিহারী বাজপেয়ীর অনুরোধে তিনি আরও সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করেন। ওই বছরই তিনি অসম জনতা পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি গঠিত হলে তিনি অসমে দলের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের অন্যতম হিসেবে রাজ্য ইউনিটের আহ্বায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি অসম বিজেপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় তিনি বিজেপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ১৯৯৫-২০০১ এবং ২০০৩-২০০৬ সালে অসম বিজেপির সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও ভারতরত্ন অটল বিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক আস্থা ও সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা।
১৯৯১ সাল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই বছর তিনি শিলচর থেকে প্রথমবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সময় অসমে বিজেপি প্রথমবার উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে—দল দুটি লোকসভা এবং নয়টি বিধানসভা আসনে জয়ী হয়। বহু বছরের সাংগঠনিক পরিশ্রমের ফল তখন স্পষ্ট হতে শুরু করে।
তিনি ১৯৯১, ১৯৯৮ এবং ২০০৯ সালে শিলচর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ নির্বাচিত হন। সংসদে তিনি এস্টিমেটস কমিটি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, খাদ্য ও গণবণ্টন, সরকারি ভাষা এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৮ সালের ১৯ মার্চ অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারে তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর মন্ত্রিত্বকালে ড. কেশব বালিরাম হেডগেওয়ার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী অরুণ কুমার চন্দের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। তাঁর কাছে এগুলি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসে আঞ্চলিক ও আদর্শগত অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি।
তাঁর সংসদীয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নাগরিকত্ব প্রশ্নে অবস্থান। শেষবার সাংসদ থাকাকালে তিনি ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনের প্রস্তাব দেন। দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে এই বিষয়টি গভীরভাবে যুক্ত ছিল। বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে এটি ছিল জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত একটি বিষয়।
রাজনীতি ও সংসদের বাইরেও জনজীবনে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা, সমবায় আন্দোলন, সাহিত্য, ভাষা, পাঠাভ্যাস ও লেখালেখির প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, জনজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু নির্বাচন জেতা নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
তাঁর শেষকৃত্যের দিন অসম সরকার স্থানীয় ছুটি ঘোষণা করেছিল, যা বরাক উপত্যকায় তাঁর জনপ্রিয়তা ও মর্যাদার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাঁকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী প্রদান কেবল একজন ব্যক্তির দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্বীকৃতি নয়; এটি দেশভাগের যন্ত্রণা থেকে শুরু করে সংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এবং জাতীয় রাজনীতির মূলধারায় পৌঁছে যাওয়া এক অনন্য জনসেবামূলক যাত্রার সম্মান।
আজকের প্রচারমুখী রাজনৈতিক সময়ে কবীন্দ্র পুরকায়স্থের জীবন আমাদের অন্য এক শিক্ষা দেয়। তিনি মনে করিয়ে দেন—প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে দীর্ঘ সময়ের শ্রমে, আন্দোলন টিকে থাকে ত্যাগ ও নিষ্ঠায়, আর একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তিনি কত বড় পদে ছিলেন তা দিয়ে নয়, বরং তিনি কত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তার মধ্য দিয়েই।

