Barak UpdatesAnalyticsFeature Story
‘কমলা ভট্টাচার্য ও শচীন্দ্র পালদের পাশেই আমরা শুয়েছিলাম রেললাইনে’
একষট্টির স্বেচ্ছাসেবক সমরকুমার চন্দের জীবদ্দশায় সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায়

ওয়ে টু বরাক, ১০ মে : ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর, অসমিয়া ছাড়া রাজ্যের সকল ভাষিক গোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংস্কৃতি ও অধিকারকে বিপন্ন করে ‘অসম ভাষা বিল’ আইনে রূপান্তরিত হয়। সারা রাজ্যের জন্য অসমিয়া ভাষাকেই একমাত্র সরকারি ভাষা বলে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘোষণায় রাজ্যের সংখ্যালঘু ভাষিক গোষ্ঠী অসহায় বোধ করে। প্রতিবাদে অসমের দ্বিতীয় বৃহৎ ভাষিক জনগোষ্ঠী বাঙালিরা বাংলাকে অসমের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন। অন্যান্য ছোট ছোট ভাষাগোষ্ঠীও বাঙালিদের এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন। বিশেষ করে বরাকের ডিমাসা, মণিপুরি ইত্যাদি সম্প্রদায়ও নিজেদের মতো করে সামিল হোন। কিছু বাম দলও এই আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে সংগঠিত করতে সাহায্য করে। বরাক উপত্যকার অসংখ্য সাধারণ মানুষ, অসংখ্য বৃদ্ধ, প্রৌঢ় ও যুব নেতা সহ একাদশ শহিদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ভৌগোলিক এলাকা ভিত্তিক ত্রিভাষা সূত্র অধিকার অর্জিত হয়েছিল।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকালটি ছিল ভাষা আন্দোলনের ৫০ পূর্তি । অনেকগুলো বছর অতিক্রান্ত। কিন্তু রাজ্যে ভাষিক জনগোষ্ঠী বিপন্নতা কমেনি, চরিত্র বদলে ব্যাপক হয়েছে। ভাষিক অস্তিত্বের নাগরিকের সার্বিক অস্তিত্বকে বিপন্ন করেছে ।
ভাষা আন্দোলনের বর্ষপূর্তিতে এক সকালে বরাককণ্ঠের স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদক সন্তোষ চন্দের বাবা সমর কুমার চন্দের বাড়িতে হাজির হই ১৯ নিয়ে কিছু কথা শোনার আগ্রহে। কিছুদিন আগে শুনেছিলাম যে এই মানুষটি এখনও ১৯শে মে-নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। দিনটি এখনও ১৯ মে নিয়ে নিরালায় কোনও স্বজনের সংগে বিনিময়ে বসে যান। নানা কথা বলতে থাকেন । ৬১-এর রক্তরাঙানো দিনের তাজা রক্তের পাশে বসে সেই দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করেন।
প্রবল উৎসাহ নিয়ে গেলাম। আমরা তো কিছুই দেখিনি। পড়েছি পত্র-পত্রিকায় আর বই ম্যাগাজিন বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, আলোচনা শুনেছি সেই ঐতিহাসিক ঘটনার কথা। উনিশ নিয়ে আরও নতুন কিছু জানার তাগিদে নিবিড় হলাম। এই ২০১২ সালে এসে বয়স তাঁর ৬৯ ছুঁই ছুঁই। অসুস্থ, শয্যাশায়ী। স্মৃতিশক্তি ততটা প্রখর না হলেও সেদিনের আন্দোলনের অভিযান পর্ব, প্রস্তুতি পর্ব তাঁর বেশ মনে আছে।
সমর কুমার বলতে শুরু করলেন—-
‘১৯-এর প্রায় মাসখানেক আগে থেকেই আমরা অতি বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। বিভিন্ন দলে দলে বিভক্ত হয়ে সমস্ত অফিস আদালত, স্কুল কলেজগুলিতে ঢুকে বন্ধ করে দিতাম। সকাল থেকেই হাতে পতাকা নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে রাস্তা, গলি,পাড়ায় পাড়ায় বেরিয়ে পড়তাম। আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের মা-বাবার অর্থাৎ কোনও বাড়ি থেকেই বেরিয়ে পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল না। তাছাড়া আমরা এতটাই সংগ্রামী মনোভাবে তৈরি হয়ে গিয়েছিলাম যে কোনও নিষেধাজ্ঞাই মানতাম না। আমরা সারাদিনের সংগ্রামের অভিযানে নাওয়া খাওয়া ভুলে যেতাম। আমাদেরকে যারা নেতৃত্ব দিতেন বা দলনেতা ছিলেন তারা পাউরুটি, কলা, বিস্কিট, চকোলেট এসব কিছু খেতে দিতেন। আমাদের মধ্যে কেউই তখন এসব ব্যাপার নিয়ে বাড়াবাড়ি করতেন না। মাথায় শুধু খেলা করত পরবর্তী কার্যসূচির কথা।
এদিকে লাগাতার অফিস-আদালত বন্ধ করতে করতে পুলিশ এসে আমাদের ধরে নিতে যেত। থানায় ঢুকিয়ে ২/৩ ঘণ্টা পরে আবার ছেড়ে দেওয়া হত। এভাবে আন্দোলন চলাকালীন আমরা যে কতদিন কতবার জেলে গেছি, উঠেছি তার সীমা নেই। পুলিশ আমাদের নাম-টাম কিছু লিখত না, শুধুই ভয় দেখাত। তবে কোনও কোনও দিন একেক সময় পুলিশের দল আমাদের সঙ্গে মজা করত, স্নেহ করতো, ভালোবাসত। তারই ফলে আমরা কেউই পুলিশ দেখলে ভয় পেতাম না বা পালিয়ে যেতাম না। কেন না রক্তে রক্তে খেলা করছে সংগ্রামী চেতনা। আমরা সমবেত গলায় স্লোগান দিচ্ছি ‘নওজওয়ান নওজওয়ান বিশ্বে জেগেছে নওজওয়ান একই প্রাণ কোটি প্রাণ একই শপথ গড়িয়ান’। প্ল্যা-কার্ডে লেখা ‘আমাদের মুক্তি স্বপ্নে সূর্যের রং লাগে, যৌবনেরই অভ্যুদয়ে হিমালয় জাগে’।
আমাদের প্রত্যেক ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সংগ্রামী অফিস ছিল। আমি তখন ব্যবসার খাতিরে মধ্যসহরের নরসিংটোলার বাসিন্দা। সংগ্রামী অফিসগুলোতে মোমবাতি হারিকেন জ্বালিয়ে রাতের বেলায় ঠিক হত আগামী দিনের কার্যসূচি। আমাদের সর্বাগ্রে নেতৃত্ব দিতেন পরাণ চক্রবর্তী, টুকু ব্যানার্জি, বাটু দাশগুপ্ত, করিমগঞ্জের রথীন সেন এবং আরও অনেকেই সবার নাম এখন মনে পড়ছে না। ভাষা সংগ্রামী পরিতোষ পাল চৌধুরীকে ধরার জন্য পুলিশ প্রত্যেক সংগ্রামী অফিসে ধাওয়া করত তখন আমরা মন্দিরে, আখড়ায় লুকিয়ে থাকতাম ও সেখানে কাজকর্ম চালিয়ে যেতাম।
যেদিন বিমলা প্রসাদ চালিহার ফাঁসি ঘোষণা করা হয় সেইদিন ম্যাজিস্ট্রেটের চেয়ার দখল করে গোপা দত্তকে চেয়ারে বসানো হয়েছিল এবং গোপা দত্তই এই ফাঁসির রায় দিয়েছিলেন। সেইদিন পুরো আদালত চত্বর সংগ্রামী জনতার নিয়ন্ত্রণে ছিল। মূল আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি ছিল শিলচর কোর্ট প্রাঙ্গণ ও পরে শিলচর রেল স্টেশন। তবে সব কাজই হত খুব গোপনীয়ভাবে। আমার দলে ছিল মনীন্দ্র ধর, শৈলেশ সেন সহ আরো কয়েকজন। ১৯-মে-র দিনে নরসিংটোলা থেকে সেন্ট্রাল রোড হয়ে গেলাম রেল স্টেশনে পিকেটিং করার জন্য। রেল স্টেশনে হাতে হাত ধরে আমি, মনীন্দ্র ধর, শৈলেশ সেন সহ কানাইলাল নিয়োগী (একাদশ শহিদ) রেল লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ি। আমাদের পাশে কমলা ভট্টাচার্য ও শচীন্দ্র পাল (একাদশ শহিদ) ও অন্যান্যরা চাদর পেতে রেল লাইনের উপর বসেছিল। সেদিন সব কিছু ঠিকঠাক ছিল বড় ধরনের কোনও ঘটনা ঘটবে সে ধরনের কোনও পরিস্থিতি ছিল না, উত্তেজনার পারদ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল।
কিন্তু বেলা গড়িয়ে হঠাৎ সেই অন্ধকার মুহূর্তটি নেমে এসে কিছু জীবনের প্রাণ-প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে গেল, কালের নিয়তি। ১৯৬১ সালের ১৯মে শিলচর রেল স্টেশনে শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহীদের উপর গুলি চালানো হল। এগারোটি তাজা প্রাণ আত্মহুতি দিল। বরাকের বুকে এমন এক ইতিহাস সৃষ্টি হল যা যুগ যুগান্ত ধরে এ উপত্যকার মানুষকে উজ্জীবিত করে রাখবে। আমরা সেই ঐতিহাসিক ঘটনার মর্মবেদনা বয়ে নিয়ে চলেছি। স্মৃতি এবং দুঃসহ বেদনায় অভিব্যক্তি আজ কোথায় প্রকাশ করি? এখনও সবকিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে, কিন্তু পারি না নতুন প্রজন্মের কাছে উদ্ভাসিত করতে। ১৯ মে সারারাত শিলচর সিভিল হাসপাতালে আমাদের শহিদ-বন্ধুদের নিথর দেহের সামনে থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে ২০ মে সারা বরাক উপত্যকায় গণজাগরণে মিছিল বের হয়। শিলচর শহরে তখন কার্ফু চললেও হাজার হাজার শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, আবালবৃদ্ধ বনিতা শহিদদের নিয়ে শহর পরিক্রমা করে অবশেষে শিলচর শশ্মানঘাটে পঞ্চভূতে বিলীন করে দেওয়া হল।’
সমর কুমার চন্দের মুখে শোনা সেই কাহিনী আগেও আমার লেখনিতে প্রকাশ পেয়েছিল। এ বারও তা পাঠকদের দরবারে পুনরায় তুলে ধরলাম। উনিশের ভাষা আন্দোলন এ বার ৬৫ বছরে পা রাখল। এখন পর্যন্ত এই বহুমুখী বিচিত্র আন্দোলনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে আজকের অধিকার আন্দোলন ও প্রতিবাদের সর্বস্তরে ব্যাপকতা দিয়ে ওঠা যায়নি। কিন্তু প্রক্রিয়া অব্যাহত। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার বর্তমান যুগে এই ব্যাপক আন্দোলনেরও ইতিহাস নতুন প্রজন্ম জানতে পারছে। একদিন হয়ত সেই জানার নির্যাস নতুন সময়োচিত আন্দোলনের প্রেরণা হয়ে উঠবে এবং ভাষিক সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য ও স্বৈরাচারের প্রতিরোধে অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠবে। কারণ, ভাষিক ,সামাজিক সাংস্কৃতিক বিভিন্ন দিক দিয়েই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী বিপন্ন। কাটেনি বিপদ। একষট্টির শক্তি সংহতি ও অঙ্গীকার নিয়ে বার বার আসুক উনিশ।


