Barak UpdatesHappeningsBreaking News

লোকঐতিহ্য ও মানব উন্নয়ন নিয়ে উইমেন্স কলেজে বুক ক্লাবের প্রথম অনুষ্ঠান

ওয়েটুবরাক, ২৪ জুন : “আগেকার দিনে অনেক বিষয় প্রশ্ন ছাড়াই মেনে নেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম প্রতিটি বিষয়ের পেছনের কারণ ও যুক্তি খুঁজে দেখতে আগ্রহী। প্রশ্ন করার এবং বুঝে নেওয়ার এই প্রবণতাই মানব উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম লক্ষণ।”

উইমেন্স কলেজ, শিলচরের অভ্যন্তরীণ গুণগত মান নিরূপণ কোষ (আইকিউএসি)-এর উদ্যোগে গঠিত বুক ক্লাবের প্রথম কর্মসূচি ‘লোকঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানব উন্নয়ন’ শীর্ষক আলোচনাচক্রে এই মন্তব্য করেন অনুষ্ঠানের মূল বক্তা কলেজের বরিষ্ঠতম অধ্যাপক ও বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. সর্বাণী বিশ্বাস। তাঁর বক্তব্যে তিনি লোকঐতিহ্যকে একটি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক ও বাহক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, লোকসংস্কৃতি কেবল অতীতের স্মারক নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক সংহতি এবং সামগ্রিক মানব উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ড. বিশ্বাস ছাত্রীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস, গবেষণামনস্কতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তাচর্চার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বিশ্বাস ও প্রথাগুলির পেছনের যৌক্তিক কারণ অনুসন্ধান করলে আমাদের চিন্তার পরিসর প্রসারিত হয় এবং যুক্তিনির্ভর ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে।”

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় দক্ষতাভিত্তিক বিষয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই ধরনের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের বহুমুখী দক্ষতা অর্জন এবং নতুন নতুন জ্ঞানক্ষেত্র অন্বেষণে উৎসাহিত করে।

বুধবার অনুষ্ঠানের সূচনায় কলেজের গ্রন্থাগারিক ও আইকিউএসি-র সমন্বয়ক ড. সরিতা ভট্টাচার্য উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানান। তিনি ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বুক ক্লাব গঠনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, পাঠাভ্যাস, চিন্তাশীলতা ও জ্ঞানভিত্তিক আলোচনার পরিবেশ গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

কলেজের অধ্যক্ষ ড. সুজিত তেওয়ারিও তাঁর বক্তব্যে সমাজে প্রচলিত নানা আচার-অনুষ্ঠান ও প্রথার অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক তাৎপর্যের উপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “প্রতিটি রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের পেছনে একটি যৌক্তিক কারণ থাকে। সেই কারণগুলো অনুধাবন করতে পারলেই আমরা আমাদের ঐতিহ্যের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে পারি।” একইসঙ্গে তিনি ছাত্রীদের মনোযোগ সহকারে শোনার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একাগ্রচিত্তে শ্রবণ করলে জ্ঞান ও তথ্য আহরণের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কলেজের উপাধ্যক্ষ ড. শান্তনু দাস বুক ক্লাবের কার্যক্রমকে আরও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও ফলপ্রসূ করে তোলার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, বুক ক্লাবের জন্য কী ধরনের বই সংগ্রহ করা উচিত, কী ধরনের পাঠচক্র, আলোচনা বা সৃজনশীল কর্মসূচি আয়োজন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে ছাত্রীদের মতামত ও পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি ছাত্রীদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরাই এই বুক ক্লাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই ক্লাবের কার্যক্রম কীভাবে আরও আকর্ষণীয় ও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে তোমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পরামর্শ প্রয়োজন।”

জাতীয় শিক্ষা নীতির আলোকে শিক্ষার্থীদের প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে ড. দাস বলেন, বুক ক্লাব এই ধরনের শিক্ষামূলক ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের একটি কার্যকর মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। পাঠাভ্যাস, গবেষণামনস্কতা, সৃজনশীলতা এবং বিশ্লেষণী চিন্তার বিকাশেও এই ক্লাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, একটি ভালো বই মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। তাই ছাত্রীদের নিয়মিত পাঠচর্চার মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক, সৃজনশীল ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

মূল বক্তৃতার উপর আলোকপাত করে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সুস্পিতা দাস তাঁর বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্যে বলেন, লোকঐতিহ্য একটি সমাজের জীবনদর্শন, অভিজ্ঞতা এবং সমষ্টিগত স্মৃতির ধারক। দ্রুত পরিবর্তনশীল আধুনিক সমাজে সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা মানবিক ও নৈতিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। তিনি ছাত্রীদের লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গবেষণার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করার এবং এর অন্তর্নিহিত জ্ঞান ও মূল্যবোধকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং বিষয়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের মূল্যবান মতামত ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার পাশাপাশি পাঠাভ্যাস, গবেষণা, সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং আজীবন শিক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।

আলোচনাচক্রটি ছাত্রীদের ও শিক্ষকদের মধ্যে অর্থবহ মতবিনিময় এবং জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা-পর্যালোচনার একটি কার্যকর মঞ্চ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। লোকঐতিহ্যের সংরক্ষণ, গবেষণামূলক মনোভাবের বিকাশ এবং বৌদ্ধিক চর্চার প্রসারের আহ্বানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন সংস্কৃত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বুক ক্লাবের সম্পাদক ড. নৃত্যেন্দু বিকাশ দাস। তাঁর সুচারু ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতা ও প্রাণবন্ততা বজায় রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker