Barak UpdatesHappeningsBreaking News

দেবাশিসের পরই জঙ্গি যুবকের নজর পড়ে আমার দিকে, লিখেছেন মধুমিতা দাস ভট্টাচার্য

//মধুমিতা দাস ভট্টাচার্য//

আমরা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনি। বেলা দেড়টা নাগাদ চার নম্বর গেট দিয়ে পহেলগাঁওয়ের বৈসরন ভ্যালি টুরিস্ট স্পটে প্রবেশ করেছি। স্থানীয় এক ফেরিওয়ালা আমাকে শালচাদর দেখাচ্ছিলেন। আমার স্বামী (আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক দেবাশিস ভট্টাচার্য) ও পুত্র (দ্রোহদীপ)কাছাকাছিই ছিল। হঠাৎ একটা গুলির শব্দ। আমি ততটা বুঝতে পারিনি। দেবাশিসের কাছে বিষয়টি কেমন ঠেকল। ফেরিওয়ালার কাছে বিষয়টি পাড়তেই তিনি বললেন, ওই সব কিছু নয়। বাঁদর তাড়াতে বনকর্মীরা ফাঁকা আওয়াজ করেন। আমরা আবার যে যার মত।

ফের গুলির আওয়াজ। একটা-দুইটা-তিনটা চলতেই থাকল। দেখি, এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়ানো লোকজন সবাই গাছের নীচে শুয়ে পড়ছেন। মাঠের মাঝে একজন দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি সেখানেই ধপাস করে পড়ে গেলেন। মনে হল, তিনিও বুঝি শুয়ে পড়েছেন। দ্রোহদীপ আমাদের শুয়ে পড়তে বলে নিজেও তাই করল। আমি বিষয়টি তখনও ভালো বুঝতে পারছিলাম না। বোঝার চেষ্টা করতে যখন মাথাটা একটু তুলি, দেখতে পাই, একজন শুবেন কিনা ইতস্তত করছিলেন। তখনই বন্দুক হাতে এক যুবক এসে তাকে গুলি করে দিল। সোজা মাথায় বন্দুকের নল ধরে ট্রিগার টিপে দিল। পড়ে গেলেন তিনিও।

ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে গেল যে, যুবকটি নিরাপত্তা রক্ষী নাকি জঙ্গি, সে কথাটিই শুধু ভাবছিলাম। যিনি পড়ে গেলেন, তিনি যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তাও বুঝতে পারিনি। আমাদের থেকে ৫০-৬০ হাত দূরে আরও ৭-৮ জন জঙ্গি দাঁড়িয়ে। একজনই এসেছিল আমাদের দিকে । তাকে দেখেই সবাই আল্লাহর নাম নিচ্ছিলেন। সুর করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ… বলছিলেন। যুবকটি ঘুরে ঘুরে সকলের মুখচোখ, বলার ধরন পরীক্ষা করছিল। আচমকা আমার স্বামীর মাথায় বন্দুক ঠেকায়। জানতে চায়, কী বলছেন তিনি ? আমার তো আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। ‘ওকে মেরো না বলে চিৎকার করতে মন চাইছে। কিন্তু গলা থেকে স্বর বেরোচ্ছিল না। দেবাশিস তখন আরও জোরে লা ইলাহা বলতে লাগল। কিন্তু মৃত্যুকে এত কাছে দেখতে পেয়ে কে আর কত জোরে বলতে পারেন!

দেবাশিসের পরই তার নজর পড়ে আমার দিকে। কপালের লাল টিপটা ভাল করে তাকিয়ে দেখল। একবার সোজাসুজি, পরে আড়চোখে। প্রচণ্ড উগ্র ভাবে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল। আমার তখন কিছু ভাবার শক্তি নেই। মারলে মেরে দিক, এমনটা ভাবছিলাম কিনা তাও মনে করতে পারছি না। তবে এই দিন এরা কোনও মহিলাকে কিছু করেনি। তাই আমি প্রাণে বেঁচে গেলাম। একটু ঘোরাঘুরি করে জঙ্গি যুবকটি চলে গেল। আরও কিছুক্ষণ সবাই ওইভাবেই পড়ে থাকল।

পরে এ দিক ও দিক তাকিয়ে একজন-দুজন করে উঠে ছুটতে লাগলেন। দ্রুত উদ্যানের কাঁটাতারের বেড়া টপকে গভীর জঙ্গলের দিকে এগিয়ে চলা। দ্রোহদীপ উঠে তাড়াতাড়ি আমায় টেনে তুলল, তার বাবাকেও চুপচাপ উঠে পড়ার ইঙ্গিত করল। আমরা সামনের মানুষদের অনুসরণ করে এগোতে থাকলাম। কাঁটা যুক্ত গাছে শরীরের নানা অংশ কেটে যাচ্ছে। তবু চলছি, কোথায় চলছি জানি না।

অনেক সময় ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক মহিলাকে দেখতে পাই। গোবরভরা পাত্র মাথায় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এত সময় পরে একজন স্থানীয় মানুষ দেখে কিছুটা স্বস্তি বোধ করি। ততক্ষণে মোবাইল নেটওয়ার্কও সচল হল। গাড়িচালককে ফোনে পেলাম বটে, কিন্তু কোথায় আছি আমরা বোঝাতে পারছিলাম না। অগত্যা সেই মহিলাই ভরসা। তিনিই চালককে বুঝিয়ে বললেন আমাদের লোকেশন। তার পরামর্শ মতো আর এক প্রস্থ পথচলা। কিছুটা যেতেই অবশ্য আমাদের ঘোড়ার গাড়িটা পেয়ে যাই।

ঘোড়ায় চেপেই গেলাম গাড়ির কাছে। পূর্ব নির্ধারিত সূচি ছিল, রাতটা কাটাব পহেলগাঁওয়ে। সেখান থেকে পরদিন শ্রীনগর। শিলচরে ফিরব শনিবার। কিন্তু এখন আর অন্য কিছু ভাবতে পারছি না। ভূস্বর্গ নয়, বাড়ি পৌছাতে পারলেই বাঁচি। তাই চালককে বললাম, চলো শ্রীনগর।

আজকের দিনটা শ্রীনগরের হোটেলেই আছি। সকালে অসমের মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তারাই টিকিটের ব্যবস্থা করছে বলে জানালেন। এখন ওই অপেক্ষাতেই শ্রীনগর থেকে কলকাতা হয়ে শিলচরে ফিরতে চাই।

(ড. মধুমিতা দাস ভট্টাচার্য একজন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী, নৃত্য প্রশিক্ষকও।)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker