Barak UpdatesHappeningsBreaking News
রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প থেকে ফিরলেন তমাল-শম্পা
অতুলনীয় সৌন্দর্য ! ঐশ্বরিক উপলব্ধি ! এত বরফ, এত বরফ!

//উত্তমকুমার সাহা//
শিলচর, ৭ জুনঃ “অতুলনীয় সৌন্দর্য ! ঐশ্বরিক উপলব্ধি !” এভারেস্ট বেস ক্যাম্প থেকে ফিরে এ ভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন শিলচরের বণিক দম্পতি। পঞ্চাশ পেরনো তমাল বণিক ছোটবেলা থেকেই অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়। বিবেক বাহিনী করতে গিয়ে সাইকেলে চেপে কাছাড়-হাইলাকান্দি ঘুরে এসেছেন। ট্রেকিং করেছেন এক্সপ্লোরার ক্লাবের সঙ্গে। স্ত্রী শম্পাও কলেজে পড়ার সময় ছিলেন এনসিসি ক্যাডেট। ২০২৩ সালে দুজনে মিলে গিয়েছেন অমরনাথ, চার ধামে। তারপরই এভারেস্টের স্বপ্নদেখা। সেখান থেকেই গত ২৫ মে এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে পৌঁছা।
তবে এই স্বপ্নপূরণ সহজ ছিল না। তমালের কথায়, “প্রথমে নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। পারব তো ৫৩৬৪ মিটার উপরে উঠতে! পরে শম্পাকে রাজি করানো। আবার প্রশ্ন, সত্যিই কি শম্পা পারবে?”
দুজনে মিলে প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের প্রস্তুত করেছেন। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটা। কঠিন নিয়মের মধ্যে নিজেদের বেঁধে নিয়েছিলেন তাঁরা। সঙ্গে মাউন্টেনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা, ইন্টারনেট ঘেঁটে নানা প্রশ্নের জবাব বের করা। ইউটিউবের ভিডিয়ো দেখে প্রাথমিক কৌশলগুলি আয়ত্ত করা। “যত পড়াশোনা, যত ঘাঁটাঘাটি, তত মনে হয়েছে, অন্তত একবার আমাদের এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে যেতে হবে,” একযোগে বললেন তমাল-শম্পা।
“তার পরই বেরিয়ে পড়া। দুই বছরের সাধনা বাস্তবায়িত হল।” বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন শিলচরের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, প্রাক্তন পুরপ্রধান তমাল। বললেন, “অনেকে উঠতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেসক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না। অনেকে নামার সময়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারান। কত মৃত্যু যে প্রতি বছর ঘটে। ওইসব জেনেও আমরা সিদ্ধান্তে অটল থাকি।”
তাঁরা সঙ্গে নিয়ে যান রোটারি ও ইনার হুইল ক্লাবের পতাকা। সর্বধর্মসমন্বয়ের বার্তাবাহী একটি পতাকাও তৈরি করে নিয়ে যান শিলচর থেকে। দুর্গম পথচলার শেষে লক্ষ্যপূরণ হতেই স্বামী-স্ত্রী মিলে মেলে ধরলেন রোটারি-ইনার হুইলের সেই পতাকা। আর রেখে আসেন সর্বধর্মসমন্বয়ের বার্তা, যা আজীবন লালন করে এসেছেন তমালরা।
গত ১৪ মে যাত্রা শুরু করেছিলেন শিলচর থেকে। ১৮ মে শুরু হয় ‘উই রেম্বলারস’ নামে মাউন্টেনিয়ার্স সংস্থার হয়ে বেস ক্যাম্প অভিযান। যত উপরে চড়া যায়, শীতের প্রকোপ তত বেশি। সঙ্গে বরফের খেলা। তমাল বলেন, “খাড়া চড়াই তবু ওঠা যায়। কিন্তু নামা বড় বিপজ্জনক। জীবন সংশয়। পথ বলতে কিছু নেই। বুঝে শুনে পা রাখতে হয়, একটু পিছলে গেলেই কোথায় গিয়ে যে পড়ব, তার ইয়ত্তা নেই। শেষদিনে এই করেই ৩৩,৪৯৮ স্টেপ দিই। এর আগের দিনেই ছিল সর্বোচ্চ, ৩৫,৬১৫ স্টেপ।” শম্পা বললেন, “আবহাওয়া ভালো থাকায় খুব বেশি সমস্যা হয়নি। তবু শেষদিনের বৃষ্টিতে সঙ্কটে পড়ি। এমনই অবস্থা যে, চশমা ঘোলা হয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না।”
তমাল শোনান, “ছোটবেলায় বিমানের শব্দ শুনলেই দৌড়ে যেতাম, দেখতাম, কত উপর দিয়ে বিমান যাচ্ছে। এ বার নতুন অভিজ্ঞতা, নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি, কপ্টার যাচ্ছে।”

তাঁরা অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ভরে নিয়ে এসেছেন পর্বতারোহী রুম্পা দাসের এক সাক্ষাৎকার। সুব্রত ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে মাউন্ট এভারেস্টে সামিট করেছিলেন রুম্পা। নামার সময় হারিয়ে যান সঙ্গী সুব্রত।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বারোজনের তমাল-দলের সবাই অবশ্য সফল অভিযান সেরে সুস্থ অবস্থায় ফিরে এসেছেন। সেই সঙ্গে রেকর্ড গড়লেন বণিক দম্পতি। বরাক উপত্যকায় এই প্রথম কোনও দম্পতি বেস ক্যাম্পে পৌঁছালেন। বরাক উপত্যকার প্রথম মহিলা হিসেবে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছার নজিরও গড়লেন পঞ্চাশ পেরনো শম্পা বণিক। এর আগে একমাত্র লক্ষীপুর মহকুমার পয়লাপুলের ইন্দ্রনীল চৌধুরী এত উচ্চতায় চড়েন।

শম্পা বললেন, “সেখানে পৌঁছে ইনার হুইলের পতাকা তুলে ধরতে পেরে আমার যে কী ভালো লেগেছে। আর ভালো লেগেছে বরফরাশি দেখে। এত বরফ! এত বরফ!”
আগরতলায় শম্পার বাবার বাড়ি। শ্বশুরবাড়ি শিলচরের প্রেমতলায়। দুই পুত্র। সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ১৮ মে শম্পারা কাঠমাণ্ডু থেকে বিমানে লোকলা যান। এর পর আর কারও সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ নেই। ট্রেক করে ২৫ মে বেস ক্যাম্পে পৌঁছেন। লোকলায় ফিরেন ২৮ মে। ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করলেও দুই বাড়ির মানুষ এবং পুত্রদের কেউ অবশ্য আপত্তি করেননি। তমালের পাশে বসে বিজয়িনীর হাসিতে শম্পা বললেন, “সে জন্যই এমন এক অভিযান সারতে পেরেছি।” (আগামীকাল শেষ কিস্তি)



