Barak UpdatesHappeningsBreaking News
নানা কর্মসূচিতে শহিদ তর্পণ বিশ্ববিদ্যালয়ে
প্রত্যেক ভাষাগোষ্ঠীর সম উন্নয়নের মাধ্যমেই নতুন আসাম গড়ার ডাক ড. বসন্ত গোস্বামীর

ওয়ে টু বরাক, ১৯ মে : যথাযোগ্য মর্যাদায় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়েও সোমবার নানা কর্মসূচির মাধ্যমে ভাষা শহিদ দিবস পালিত হয়। সকাল সাড়ে দশটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের কাছে অবস্থিত শহিদ মিনারে জমায়েত হন শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, গবেষক ও ছাত্রছাত্রীরা। এরপর শহিদ মিনারে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা হয়। অসম সাহিত্য সভার প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নিয়ে শহিদদের উদ্দেশে পুষ্পার্ঘ নিবেদন করেন। এরপর একটি প্রতীকী পদযাত্রা আয়োজিত হয়। এই পদযাত্রা শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ভারতীয় ভাষা সমূহের ভবনের সামনে অবস্থিত শহিদ বেদি প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
এদিন ভাষা শহিদ দিবস উপলক্ষে এক আবেগঘন ও ভাবগম্ভীর আলোচনা চক্রের আয়োজন করা হয়। মাতৃভাষা রক্ষার্থে যারা আত্ম বলিদান দিয়েছিলেন তাঁদের স্মরণ করা হয়। বিপিন চন্দ্র পাল প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত এই আলোচনাচক্রে বিভিন্ন বক্তা ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য, ইতিহাস ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য রাখেন। স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বরুণজোতি চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিয়েই ভাষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। তিনি বলেন যারা স্বতন্ত্র, তারাই এক হতে পারেন। আসামে বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিয়েই এক নতুন আসাম গড়ার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করে উপাচার্য অধ্যাপক রাজীব মোহন পন্থ ভাষা শহিদের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। ভারতের সমস্ত ভাষাকে সম্মান জানিয়ে নতুন ভারত গড়ার প্রসঙ্গ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
অধ্যাপক দীপেন্দু দাস ভাষার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভাষা রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আজকের সমাজে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাহিত্য অনুবাদের মাধ্যমে নতুন করে মেলবন্ধন গড়ে তুলতে হবে।
অসম সাহিত্য সভাপতি ড. বসন্ত কুমার গোস্বামী ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে সাহিত্যিকদের ভূমিকা ও অসমে ভাষাগত সহাবস্থানের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আসামে বসবাসকারী প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ করেই সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে। বাংলা ও অসমীয়া ভাষার ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আদান-প্রদানের জন্য প্রত্যেক মননশীল মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। বিভেদ নয়, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য খোঁজার ডাক দেন তিনি । তিনি বলেন, প্রত্যেক ভাষা গোষ্ঠীর মানুষের সম উন্নয়নের মধ্য দিয়েই নতুন আসাম নির্মাণ করা সম্ভব হবে।

কটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তী ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন এবং ভাষার অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেন। অসমিয়া ও বাঙালি সমাজের মধ্যে সুপ্রাচীনকাল ধরে চলে আসা বন্ধনের প্রসঙ্গও বারবার উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করেন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক কুমার সেন। তিনি বলেন, আসামের বহুভাষিক সমাজে আন্তঃভাষাগত সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হলে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগকে আমরা স্মরণ করেই থেমে থাকব না, বরং তাঁদের আদর্শকে দৈনন্দিন আচরণে রূপান্তর করতে হবে। তিনি অসম সাহিত্য সভার ঐতিহাসিক ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ইতিহাসও তিনি উল্লেখ করেন। নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে স্বীকার করেই মেলবন্ধন করতে হবে একথা তিনি উল্লেখ করেন।
এছাড়াও ওইদিনের অনুষ্ঠানে প্রাসঙ্গিক বক্তব্য রাখেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় সিং, অশিক্ষক কর্মচারী সংস্থার সভাপতি সাগ্নিক চৌধুরী, ছাত্র সংস্থার সভাপতি ভাস্কর গোস্বামী, শতদল আচার্য প্রমুখ।
আলোচনাচক্র শেষে আয়োজিত হয় এক হৃদয়ছোঁয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা কবিতা আবৃত্তি, গান ও নৃত্যের মাধ্যমে বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক উত্তর-পূর্ব ভারতের একতা ও সৌহার্দ্যের চিত্র তুলে ধরেন। বাংলা, অসমিয়া, মণিপুরি, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় পরিবেশিত কবিতা ও গান অনুষ্ঠানটিকে এক বহুভাষিক মিলনমেলায় পরিণত করে। ওইদিনের অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন অধ্যাপক মহুয়া সেনগুপ্ত, নৃত্য ও গান পরিবেশন করেন সৃজিতা ঘোষ, অর্ণব সান্যাল, অগ্নি চৌধুরী, অনামিকা দত্ত, সৌরভী দেব, সৌরভ দে, সুতপা দেব প্রমুখ। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা জয়শ্রী দে।



