Barak UpdatesHappeningsBreaking News
লোহার চিমটার টুংটাং শব্দ শুনলেই বুকের ভেতর অদ্ভুত আলোড়ন জেগে ওঠে, লিখেছেন সঞ্জীব দেবলস্কর

//সঞ্জীব দেবলস্কর //
শীতের অতিথি— ছোটবেলায় এক মণিপুরি সন্ন্যাসী আসতেন আমাদের বাড়িতে। হাতে লোহার চিমটা, কোমরে লোহার বেড়ি, সঙ্গে যৎসামান্য কাপড়– কৌপিন, গামছা ইত্যাদি। ইনি এলে আমাদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার উঠত। পড়াশোনা বাদ দিয়ে সবাই তাঁর কাছে গিয়ে বসতাম। তবে সন্ন্যাসী তাঁর জিনিসপত্র ঠাকুরঘরের বারান্দায় রেখে ক’টিমাত্র বস্ত্র আচ্ছাদন এবং একটা কলসি নিয়ে চলে যেতেন নদীতীরে। ওখানে প্রাত্যহিক কৃত্যাদি এবং স্নান শেষ করে কাঁধে করে এক কলসি জল এনে মাকে সমঝে দিতেন। ইতিমধ্যে মা শুদ্ধবস্ত্র পরে ঠাকুরঘরের চুলোয় জল গরম করে পাথরের বাটিতে সাধুর জন্য চা, জলখাবার দিয়ে বলতেন– “বাবা, আমি শুদ্ধ কাপড়ে চারটে ডাল-চাল বসিয়ে চুলো ধরিয়ে দেব। আপনি শুধু লবনটা দিয়ে দেবেন।” আসলে আমরা দেখেছি এই লবনটার মধ্যেই জাতপাতের প্রশ্ন। অবশ্য সন্ন্যাসীর পক্ষে গৃহীর রান্না গ্রহণে দোষ নেই– তবু সংস্কারবসত মা ঐ লবনটা নিজের হাতে দিতেন না। হাসতে হাসতে সাধু বলতেন, “মা, আপনার হাতে অন্নগ্রহণ করতে আমার অসুবিধা নেই।”
যাই হোক, এদিকটি সামলে কাঁসার থালা গেলাস ধুয়ে রেখে মা যেতেন আমাদের রাতের আয়োজন করতে। কোনও ক্লান্তি নেই, বিরক্তি নেই। এ অতিথি সেবা যেন মহাপুণ্যের কাজ। বাবা বারান্দা থেকে সব দেখে ধীরে ধীরে ঠাকুর ঘরের সামনে এলে সন্ন্যাসী একটা লম্বা নমস্কার দিতেন। আমরা তাঁকে ঘিরে রেখেছি দেখে বাবা এ আসরটা আমাদের হাতেই ছেড়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে যেতেন। যাবার আগে সন্ন্যাসীর কুশলমঙ্গল নেওয়া, (চাল নেই চৃলো নেই তার আবার কুশলমঙ্গল কী) আমাদের দাদা, দিদি জামাই এরা কোথায় আছে এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতেন। সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর চালের নিচে শয়ন নিষেধ, তাই ভূমিতে কোনক্রমে শয়ন। তবে অর্ধেক রাত্রি তো ধ্যান করেই কাটিয়ে দিতেন। বারান্দার এক কোনায় শুকনো কাঠ দিয়ে ধুনি জালিয়ে তিনি ধ্যানে বসতেন, মাঝে মাঝে ব্যোম ব্যোম মহাদেব ধ্বনি দিতেন। শরীরে কোনও আচ্ছাদন নেই– ঠাণ্ডা তীব্র হলে ধুনি থেকে ছাই তুলে গায়ে মেখে নিতেন। অবশ্য আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে শিবের প্রসাদে দমও দিতেন। সাধুর বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলে একই উত্তর– হিমালয়। কখনও বলতেন বৃন্দাবনে তাঁর আশ্রম। ওখানে ময়ূরের কথা খুব বলতেন।
তাঁর আসায় আমাদের বাড়ির আবহাওয়াটাই বদলে যেত। সেদিন পড়াশোনার পালা হত নিতান্তই সংক্ষিপ্ত। কারণ হরিঘরের বারান্দায় যে রয়েছেন সন্ন্যাসী। গলায় তাঁর রুদ্রাক্ষের মালা। আর আমরা গোল হয়ে বসতাম তাঁর চারপাশে। তাঁর চোখদুটি অদ্ভুত শান্ত, অথচ গভীর। মনে হত, কত অচেনা পথ, কত পাহাড়, কত নদী পেরিয়ে সেই চোখ আমাদের উঠোনে এসে থেমেছে।
তিনি চমৎকার বাংলা বলতেন। তাঁর একটাই জাগতিক শখ ছিল– ইমফল বেতার কেন্দ্রের মণিপুরি অনুষ্ঠান শ্রবণ। তাঁর ভ্রমণের গল্পে রাজা-মন্ত্রী নয়, থাকত সাধু, বন-জঙ্গল, হিমালয়ের বরফঢাকা গুহা, আর হিমালয়ের বন্য পশুরা। কখনও বলতেন, “পাহাড়ের ওপরে এমন সব ফুল ফোটে, যাদের গন্ধ মানুষকে ধ্যান শেখায়।” কখনও বলতেন, “বৃন্দাবনের ভোরে ময়ূর যখন ডানা মেলে নাচে, তখন মনে হয় কৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন।” আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। তখন বুঝতাম না, গল্পের কতটা সত্য, কতটা কল্পনা।
তাঁর বাড়ি, মা বাবা আত্মীয় স্বজন সম্বন্ধে আমাদের কৌতূহল নিরসন করতে বলতেন , “যেখানে রাত হয়, সেখানেই আমার বাড়ি।”
আমরা বলতাম, “আপনার মা নেই?”
মুহূর্তের জন্য তাঁর মুখের রেখা বদলে যেত। তারপর খুব আস্তে বলেতেন, “সন্ন্যাসীরও মা থাকে, বাবা। শুধু তিনি তাকে মনে রাখেন বুকের ভিতর, মুখে আনেন না।”
সেই উত্তর শুনে আমরা কেউ আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। আজ এত বছর পরে বুঝি, ওই কয়েকটি কথার মধ্যে কী গভীর বেদনা লুকিয়ে ছিল।
পরদিন ভোরে, যখন আমাদের ঘুম ভাঙত, দেখতাম ধুনির আগুন নিভে ছাই হয়ে আছে। সাধুও নদীতে স্নান সেরে ফিরে এসে আবার জপে বসেছেন। সূর্যের প্রথম আলো তাঁর ছাইমাখা শরীরে পড়লে মনে হত, যেন কোনো প্রাচীন যুগের মানুষ ভুল করে আমাদের সময়ে এসে পড়েছেন।
তিন-চার দিন থাকতেন। যৎসামান্য দক্ষিণা, সিধা যা দেওয়া হত এতেই তিনি তৃপ্ত। তারপর এক সকালে নিঃশব্দে বিদায় নিতেন। যাওয়ার সময় মাকে প্রণাম করে বলতেন, “মা, আবার যদি মহাদেবের ইচ্ছে হয়, আসব।”
বহু বছর কেটে গেছে। সেই জাটিঙ্গা নদী আজ আগের মতো নেই, পাড় ভেঙে কেমন হতশ্রী দশা তার। সব্জি খেত কোন রাক্ষসী গ্রাস করে ফেলেছে। বাড়ির উঠোনও বদলে গেছে। মা-বাবা কেউ আর নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে কোনো মন্দিরের সামনে লোহার চিমটার টুংটাং শব্দ শুনলেই বুকের ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত আলোড়ন জেগে ওঠে। মনে হয়, বুঝি সেই মণিপুরি সাধুই আবার ফিরে এসেছেন। তিনি হয়তো আর মানুষ নন, আমাদের শৈশবের এক চলমান প্রতীক। এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন অতিথি ছিল দেবতা, ধর্ম কোন লোকদেখানো আড়ম্বরে কিংবা সন্ন্যাসীর পোশাকে, অথবা তাঁর বাচনক্ষমতায় নয়, তার অন্তরের আলোকে, মনের প্রশান্তিতে।
(ছবিটি এঁকেছেন লেখকের অনুজ সঞ্জয় দেবলস্কর)



