Barak UpdatesHappeningsSportsBreaking News
মাতৃভূমি কাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন ইন্ডিয়ান এফ.সি
লোকনাথপুর ইয়ংস্টারকে হারিয়ে জয়োল্লাস, ফাইনালে দর্শকের ঢল

ওয়েটুবরাক, ৮ সেপ্টেম্বর : বরাক উপত্যকায় ফুটবল মানেই উন্মাদনা। গ্রাম থেকে শহর—যেখানেই বড় টুর্নামেন্টের ডাক পড়ে, হাজারো ফুটবলপ্রেমী দলে দলে ছুটে যান খেলার মাঠে। তেমনই এক অনন্য দৃশ্যের সাক্ষী হলো ধলাইর বাম নিত্যানন্দ উচ্চতর মাধ্যমিক বহুমুখী বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। রবিবার বিকেলে মাতৃভূমি সামাজিক সংস্থা পরিচালিত কৃষ্ণ মোহন দাশ ও অনিল কৈরি স্মৃতি ‘মাতৃভূমি কাপ প্রাইজমানি নকআউট ফুটবল টুর্নামেন্ট–২০২৫’-এর ফাইনালে মাঠ ভরে উঠেছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার দর্শকের গর্জনে। হাইভোল্টেজ ফাইনালে ইন্ডিয়ান এফ.সি ৩–০ গোলে হারালো প্রতিপক্ষ লোকনাথপুর ইয়ংস্টারকে এবং ছিনিয়ে নিল এবারের শিরোপা।
খেলা শুরু হতেই ইন্ডিয়ান এফ.সি আগ্রাসী ভঙ্গিতে আক্রমণ চালায়। মাত্র ১১ মিনিটে দলের ফরওয়ার্ড ধনজুয়ালা প্রথম গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। এরপর ১৮ মিনিটে নেকটিয়ার হেড গোলবার ভেদ করলে মাঠে উল্লাসের ঝড় ওঠে। ২৪ মিনিটে রেমরুয়াতা তৃতীয় গোলটি করলে কার্যত লোকনাথপুর ইয়ংস্টারের স্বপ্নে আঁচড় পড়ে। প্রথমার্ধ শেষ হতেই ইন্ডিয়ান এফ.সি ৩–০ গোলে এগিয়ে যায়। দেশের প্রথম সারির ফুটবলারদেরকে নিয়ে দল সাজিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে পরপর দুইটি ম্যাচে বাজিমাত করলেও এদিন প্রথমার্ধে তিন গোলে পিছিয়ে পড়ে লোকনাথপুর । দ্বিতীয়ার্ধে লোকনাথপুর ইয়ংস্টার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলেও প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেদে সফল হতে পারেনি। ফলে নির্ধারিত সময় শেষে ৩–০ গোলে জয় নিশ্চিত করে ইন্ডিয়ান এফ.সি, আর আনন্দের জোয়ারে ভেসে ওঠে তাদের সমর্থক ও খেলোয়াড়রা। ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন বিয়াক্কিমা।
এদিন পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে প্রতিভা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে আরও বেশ কিছু সম্মাননা ঘোষণা করা হয়। সেরা গোলরক্ষক: ডিক্রো হসম ক্লাবের শান বর্মণ, সেরা ডিফেন্ডার: জামালপুর এফ.সি-র মনজিৎ শর্মা, বেস্ট লিংকম্যান: দর্মিখাল এফ.সি-র চিন্টু বর্মণ, বেস্ট ফরওয়ার্ড: টিএইচবি আর্জানপুরের কবীর হোসেন বড়ভূঁইয়া, টপ স্কোরার: লোকনাথপুর ইয়ংস্টার দলের রনাল্ড, বেস্ট প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট: ওয়াই.এম.সি.এ-র রামথাইপু, প্রমিসিং প্লেয়ার: বাম রামপুর দলের সমীর সিংহ (ট্রফি স্পন্সর: বাকস, শিলচর), সেরা শৃঙ্খলাবদ্ধ দল: ব্রাইট স্টার ক্লাব, রাজনগর ।
চ্যাম্পিয়ন ইণ্ডিয়ান এফ.সি লাভ করে কৃষ্ণ মোহন দাশ মেমোরিয়াল ট্রফি সহ নগদ ৫০ হাজার টাকা। রানার্স লোকনাথপুর ইয়ংস্টারকে দেওয়া হয় অনিল কৈরি স্মৃতি ট্রফি সহ নগদ ২৫ হাজার টাকা। চ্যাম্পিয়ন ট্রফি স্পন্সর করেন কমলেশ দাশ ও রানার্স ট্রফি স্পন্সর করেন সঞ্জয় কৈরী।
খেলা শুরুর আগে আয়োজিত হয় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মনিয়ারখাল চাবাগানের শিল্পীদের পরিবেশিত ঝুমুর নৃত্য দর্শকদের মুগ্ধ করে। এছাড়াও ছিল ধামাইল, বিহু, ওড়িয়া, ডিমাসা ও মণিপুরি নৃত্যের পরিবেশনা। মাতৃভূমি সামাজিক সংস্থার মহিলা ফুটবলারদের বিশেষ পরিবেশনা দর্শকদের মন জয় করে নেয়।
ফাইনাল উপলক্ষ্যে উপস্থিত ছিলেন বহু গণ্যমান্য অতিথি। প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বিজেপির জেলা সভাপতি রূপম সাহা। বিশেষ অতিথি ধলাইয়ের বিধায়ক নীহার রঞ্জন দাস, ধলাই সমজেলার অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার দীক্ষা সরকার, সিডিএসপি প্রদীপ কোঁয়র, কাছাড় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কঙ্কন নারায়ণ সিকদার প্রমুখ। অন্যান্যদের মধ্যে জেলা পরিষদ সদস্য পম্পী নাথ চৌধুরী ও ধর্মেন্দ্র তেওয়ারি, আঞ্চলিক পঞ্চায়েত সভাপতি নির্মল কান্তি দাশ, এমসিবি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সাবির আহমেদ চৌধুরী, ধলাই-নরসিংপুর ব্লক আঞ্চলিক পঞ্চায়েত সভাপতি নির্মল কান্তি দাশ, বিজেপি ধলাই-নরসিংপুর মণ্ডল সভাপতি সঞ্জয় কৈরী, পালংঘাট মণ্ডল বিজেপির সভাপতি অপূর্ব দাস, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক চন্দন শর্মা, সুজন দত্ত, অজয় চক্রবর্তী, বাকস এর কেন্দ্রীয় সভাপতি রতন দেব, বিএনএমপি এইচ এস স্কুলের অধ্যক্ষ পিনাক চক্রবর্তী, শিক্ষাবিদ বিষ্ণুরঞ্জন ধর, আব্দুল মতিন লস্কর সহ ভারতীয় জনতা পার্টির স্থানীয় মণ্ডল ও জেলা নেতৃত্ব, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীরা।
জেলা সভাপতি রূপম সাহা তাঁর বক্তব্যে বলেন, “ফুটবলকে জনপ্রিয় করে তুলতে মাতৃভূমি সামাজিক সংস্থার উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। কেবল খেলার ক্ষেত্রেই নয়, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও তারা অবদান রাখছে।” বিধায়ক নীহার রঞ্জন দাস ঘোষণা করেন, বাম নিত্যানন্দ উচ্চতর মাধ্যমিক বহুমুখী বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের উন্নয়নে তিনি আনটাইড ফান্ড থেকে ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছেন এবং এ মাসের শেষেই কাজ শুরু হবে। এদিন বিশেষভাবে সংবর্ধিত করা হয় প্রাক্তন ফুটবলার তথা টুর্নামেন্ট সিলেক্টর তুষার কান্তি বর্মণ, ইন্দ্রজিৎ সিংহ ও শিশির বর্মণকে। একই সঙ্গে চারজন রেফারিকেও সংবর্ধিত করে আয়োজক সংস্থা।
মাতৃভূমি সামাজিক সংস্থার সভাপতি সীতাংশু দাস স্বাগত ভাষণে বলেন, “এই টুর্নামেন্টকে সফল করে তুলতে যাঁরা পাশে থেকেছেন—স্পন্সর, সংবাদমাধ্যম, প্রশাসন ও সাধারণ দর্শক—তাদের প্রত্যেককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।” এদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহ পুরো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান দক্ষতার সঙ্গে সঞ্চালনা করেন সমাজকর্মী কমলেশ দাশ। ধলাই অঞ্চলে ফুটবলকে কেন্দ্র করে মানুষের আবেগ ও উন্মাদনা নতুন নয়। তবে এবারের মাতৃভূমি কাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। খেলার মাঠ থেকে শুরু করে মঞ্চ, সবখানেই ফুটেছিল উচ্ছ্বাস। এই সাফল্য নিঃসন্দেহে আগামী দিনে আরও বেশি করে তরুণ প্রজন্মকে ফুটবলের প্রতি অনুপ্রাণিত করবে।



