Barak UpdatesHappeningsBreaking News
বাংলা ভাষার সহজ পাঠ, লিখেছেন সঞ্জীব দেব লস্কর

//সঞ্জীব দেব লস্কর//
নবীন কিশোর, তোমায় দিলাম ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ
তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর
ফুসফুস-ভরা হাসি…
— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমার এই উপস্থাপনা যাদের উদ্দেশে, তাঁরা কেউই মোটেই নবীন কিশোর নন। তাঁরা বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন পেশার মানুষ—আমাদেরই সহযাত্রী। এই উপস্থাপনা কোনো শিক্ষকসুলভ ভাষণ নয়; বলা যেতে পারে, বাংলা ভাষা ও বাঙালির সামাজিক অবস্থান নিয়ে একজন কর্মকর্তা হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার একটি প্রয়াস।
১
জাতি হিসেবে আমরা ক্রমশ রুগ্ন হয়ে পড়েছি বলেই নিজেদের অস্তিত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে উঠেছি। এ অভিযোগ কেবল বাঙালিদের ক্ষেত্রেই নয়—দেশের প্রায় সব জাতিগোষ্ঠীর জন্যই সত্য। এমনকি যাঁরা নিজেদের গৌরবের অহংকারে অজান্তেই অন্যকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেশব্যাপী বিদ্বেষের বাতাবরণ সৃষ্টি করেছেন, তাঁরাও এর ব্যতিক্রম নন।
এক জায়গায় এদের মধ্যে আশ্চর্য মিল আছে—এরা সবাই নিজ নিজ মাতৃভাষায় অজ্ঞ। মাতৃভাষা-নিরক্ষরতাই যেন এখন আমাদের সাধারণ লক্ষণ।
তবু আমরা জেগে উঠেছি—না হলে আপনাদের বঙ্গসাহিত্য আয়োজিত এই কর্মশালায় আসাই বা কেন? তবে আসন্ন সংকট সম্পর্কে আমরা যখন সচেতন হলাম, ততদিনে জল অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিলেও প্রশাসন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা যে দেশীয় ভাষায় যোগাযোগের ক্ষমতা হারাচ্ছে, তা কেবল লজ্জার নয়—গভীর আশঙ্কার বিষয়।
মাতৃভাষা চর্চার ক্ষেত্র প্রায় সর্বত্রই অবহেলিত। বই প্রকাশনার জগৎ সংকুচিত হচ্ছে। সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের পাঠকসংখ্যা কমছে। শিলচর শহরের বইয়ের দোকানগুলোর দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়—ভারতী বুক স্টল, কমলা বুক স্টল আজ অতীতের স্মৃতি।
একটি জাংক-ফুডের দোকানে এক বিকেলে আমরা যত টাকা খরচ করি, তাতে বছরে একটি ছোটখাটো লাইব্রেরি গড়ে ওঠে—এই হিসেব কি আমরা কষে দেখি? বিভিন্ন উৎসবে আমরা কাপড়চোপড় সাজ পোশাকের নিচে যত টাকা খরচ করি এর সিকিভাগও বইপত্রের জন্য করি না। আগে বিষয়টি তা ছিল না। বইহীন আমাদের মননের ক্ষেত্রটি ক্রমে অন্তঃসারশূন্য হয়ে উঠছে। সমাজ, ইতিহাস, সাহিত্য—বিশেষ করে বিজ্ঞানচর্চা—সবই সংকুচিত হয়ে সমাজকে পিছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের চোখের সামনে তৈরি হচ্ছে এক মাতৃভাষাহীন প্রজন্ম।
আমরা মোবাইলে মেসেজ করি ইংরেজি হরফে বাংলা বা হিন্দিতে, নাম দস্তখত করি ইংরেজিতে, ঠিকানা লিখি ইংরেজিতে। বাংলায় একটি ফর্ম পূরণ করতে গেলে অসংখ্য ভুল করি। এনআরসি-র সময় দেখা গেছে—ভাষাগত অজ্ঞতা কীভাবে নাগরিকত্বকেই বিপন্ন করে তুলতে পারে।
ফলত বই বিহীন আমাদের মননের ক্ষেত্রটি হয়ে উঠছে অন্তঃসারশূন্য। সমাজ, ইতিহাস, সাহিত্য এবং বিশেষ করে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে সমাজকে প্রতিনিয়তই পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
এ যেন এক বিপন্ন বিস্ময়—আমাদেরই স্বভাবদোষে গড়ে উঠছে মাতৃভাষাহীন এক প্রজন্ম।
আমরা মোবাইলে মেসেজ করি ইংরেজি হরফে দেশী বাংলায়, না হয় হিন্দিতে। নাম দস্তখত করতে বললে ইংরেজিতে করি, ঠিকানা লিখি ইংরেজিতে। ইশকুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটির দরখাস্ত লিখি ইংরেজিতে (এ ইংরেজি অবশ্যই অতি দুর্বল, ভুল গ্রামারে।) বাংলায় একটা ফর্ম ফিল আপ করতে গেলে হাজারটা ভুল করি। এনআরসির সময় আমাদের ভাষাজ্ঞান যে কত দুর্বল, তা দেখা গেছে। লক্ষ লক্ষ নামের বানান ভুল বাঙালির নাগরিকত্বকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ ভুল করেছেন সরকার নিয়োজিত অ্যানুমারেটর — ইশকুল মাস্টার, অফিসের কেরানি, টাইপিস্ট এবং এদের মাথার উপর বসে থাকা অফিসারের দল।
আজ বাঙালিকে নতুন করে শিখতে হচ্ছে—mango মানে আম, tiger মানে বাঘ, grandfather মানে দাদু। এ এক হাস্যকর অথচ করুণ অধ্যায়।
২
বাংলাভাষার সহজ পাঠ নিয়ে এ আলোচনায় নিজস্ব অভিজ্ঞতা অনিবার্যভাবেই আসবে। বলি বাংলা ভাষার কাছে আমার আসা ছিল পরিবেশের প্রভাবে। ঘরে বাইরে আমাদের পরিবেশটি ছিল বাংলা ভাষার অনুকূলে। এ পরিবেশে থেকে শৈশব থেকে যৌবন, কর্মজীবনের সূচনায় বঙ্গসাহিত্যের সংস্পর্শে এসে আমার বাংলা ভাষাকে ভিতর থেকে চেনা সম্ভব হয়েছে, সম্ভব হয়েছে ভাষার কাছে নিঃশর্ত সমর্পণ। হ্যাঁ, আমাদের শৈশব কৈশোরে বাংলা ছড়া, কবিতা, গান, গল্পের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার একটা পরিবেশ ছিল। কৈশোরের সেই উদ্দামতার দিনেও আমাদের জীবনযাত্রায় বই, পত্রপত্রিকার অবস্থান ছিল। আমাদের দুপুরগুলো ছিল বড্ড লম্বা, হাটে মাঠে ঘাটে বনে বাদাড়ে ঘোরাঘুরি করার পরও হাতে উদ্বৃত্ত সময় থাকত। পাঠ্যবইয়ে সিলেবাসের বাইরের টেক্সটগুলোও আমরা বুঝে না বুঝে পড়ে নিতাম। এখান থেকে ওখান থেকে যা হাতে আসতো, ছেঁড়া পত্রিকা, জঞ্জাল থেকে কুড়িয়ে আনা বই, স্কুল লাইব্রেরির বই, পাড়ার বা বাজারের লাইব্রেরি থেকে কিনে আনা পঞ্চাশ পয়সা দামের ডিটেকটিভ গল্প, শুকতারা, বিনে পয়সায় সোভিয়েত দেশ পত্রিকা–এসবই আমাদের ছিল পাঠসামগ্রী। ডাকে আসা আনন্দবাজার, যুগান্তর এবং স্থানীয় প্রান্ত্যজ্যোতি, প্রান্তীয় সমাচার, আজাদ পত্রিকা ছিল বড়দের সঙ্গী। আমরাও ফুটবল ক্রিকেটের পাতায় চুপি দিতাম। আর গোগ্রাসে পড়তাম এতে ছাপা টার্জান, ম্যানড্রেক, অরণ্যদেবের কমিক স্ট্রিপ। তখন তো টিভি, মোবাইল, ফেসবুক এসব কিছুই ছিল না।
স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে, রবীন্দ্রজয়ন্তী, ক্লাবের অনুষ্ঠানে প্রাইজ হিসেবে পাওয়া বই — ছোটদের শ্রীকান্ত, আলিবাবা ও চল্লিশ চোর, বেতাল পঞ্চবিংশতি এসব আমরা এর থেকে ওর থেকে নিয়ে মিলেমিশে পড়তাম।
আমাদের বাড়ির কাজের মানুষ যারা থাকতেন –দাদা, মামু, পুত্তি, কাকা যার যেরকম পদবী– এদের কাছেও বাংলা বইয়ের জোগান থাকত।
ঠ্যলার নাম বাবাজি, ঠ্যলায় পড়ে কখন যে এসব বই পড়া হয়ে গেছে নিজেই জানি না। বাংলাটা আজকে যেমন একটু বেশি কঠিন, সত্যি বলছি সেদিন এর চাইতেও বেশি কঠিন ছিল। তখনও একশোতে তেত্রিশ পেয়ে পাশ করা খুব সহজ কর্ম ছিল না।
সস্তাদরের রেডিও, পাড়ার সেলুনে ট্র্যানজিস্টরের দৌলতে অষ্টপ্রহর না হলেও দ্বি-প্রাহরিক হিন্দিগান আমাদের কানকেও ভরপুর রাখত। তবে আজকের মতো মাস্টারবাবুর বাড়িতে টিউশন যাওয়া আসার পথে হিন্দিতে বাতচিৎ করা আমাদের রপ্ত হয়নি। তবে হ্যাঁ, প্রাক্-কৈশোর থেকেই হিন্দিতে মুখভরে গালাগালিটা রপ্ত করে নিয়েছিলাম অবশ্য।
ইংরেজির প্রতি মোহ তখনও ছিল। তবু বাংলাই ছিল ভাবনার ভাষা, সৃজনের ভাষা।
আজ ঘটনাচক্রে একজন গ্রামীণ স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক হয়েও আমি বাংলাভাষার পক্ষে কথা বলছি। এ জন্য পরিবেশের কাছেই আমি ঋণী। ইংরেজি আমার বৃত্তির ভাষা, কিন্তু চিন্তার ভাষা বাংলা। এ ভাষা ছাড়লে তো আমরা চিন্তাবিহীন যন্ত্র হয়ে যাবো। লেখালিখিই বলুন আর, বক্তৃতাই বলুন—সবেতে বাংলাতেই আমি স্বচ্ছন্দ।
আর বাংলায় না লিখে করব-টাই বা কী? ইংরেজিতে লিখে কতজন মানুষের কাছে পৌঁছোনো যায়?
আমাদের কলেজ জীবনে এক বাঙালি গর্বিত লেখক লিখেছিলেন Autobiography of an Unknown Indian। তিনি দেশবাড়ি ছেড়ে একেবারে তাঁর কাঙ্ক্ষিত তীর্থভূমি অক্সফোর্ডের বাসিন্দা হয়ে একশো এক বছর বেঁচে থেকে লেখালিখি করেছেন। এ দেশে থেকে ভ্যাজাল খাবার, নিম্নমানের পানীয়, এমন-কি আন হাইজিনিক পশুর মাংস ভোজন করলে এত দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা নাকি তাঁর সম্ভব হত না। হ্যাঁ, Nirad C Choudhury নামের কিশোরগঞ্জের সন্তান এ লেখক পাণ্ডিত্যপূর্ণ চমৎকার সব বই লিখেছেন ইংরেজিতে। তাঁর বিশ্বাস নবেল কমিটি তাঁকে পুরস্কারটি না দিয়ে ভুল করেছে। বাংলায়ও তিনি বেশ ক’টি বই লিখেছেন, তবে চলতি (আধুনিক) বাংলা গদ্য ছিল তাঁর দু’চক্ষের বিষ, তিনি শতবর্ষ প্রাচীন গদ্যের আদলেই তাঁর গর্বিত বাংলা বই আর নিবন্ধ লিখেছেন। বাঙালি এর কতটুকু মনে রেখেছে বলতে পারব না, তবে আজকাল তাঁর একটি কথা আপ্তবাক্য হিসেবে খুব চলেছে—‘বাঙালি একটি আত্মঘাতী জাতি।’
আমরা কি সত্যিই আত্মঘাতী জাতি, এর উত্তর ইতিহাসই দেবে, তবে বাঙালি হিন্দি আর ইংরেজির মোহে বাংলাভাষা থেকে দূরে সরে গেলে সেটাই আত্মঘাতেরই নামান্তর হবে।
এখানে মনে পড়ে সত্যজিৎ রায়-এর গুপি গাইন বাঘা বাইন ছবির গান—
“মোরা সাদাসিধা মাটির মানুষ, দেশে দেশে যাই, নিজের ভাষা ভিন্ন আর ভাষা জানা নাই…”
এই সত্যজিৎ রায় ইংরেজি সাহিত্য ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির গভীর অনুরাগী হয়েও বাংলা কিশোর সাহিত্যকে বিশ্বমানের উচ্চতায় নিয়ে গেছেন — তাঁর ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু আমাদের মনের জানালা খুলে দেয়। আমি তো আজও পড়ি প্রফেসর শঙ্কুর কাণ্ডকারখানা, ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি আর সিনেমা বিষয়ক বই ‘বিষয় চলচ্চিত্র’, ‘একেই বলে শ্যুটিং’, কিংবা ‘যখন ছোট ছিলাম’। তাঁর গল্পে আছেন জনৈক সবজান্তা সিধুজ্যেঠু, ইনি ফেলুদাকে বলেছিলেন মনের ‘জানালাটা খোলা রেখো’। আমি বলি সত্যজিতের এই কিশোর উপন্যাসগুলোতে সত্যিই আমাদের মনের হাজারটি জানালার সন্ধান রয়েছে।
৩
আজকের এ বিশেষ কর্মশালার আয়োজক হচ্ছে একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এটা আর পাঁচটি সংস্থার মতো নয়। এখানে ভাষা ও সংস্কৃতিই মুখ্য। এখন প্রশ্ন হল কেন ভাষা? কোন ভাষা? দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়ে শুরু করি, ভাষাটি মাতৃভাষা, যে ভাষা থেকে আজ বাঙালি দূরে সরে যাচ্ছে। আর কেন ভাষা, এ প্রশ্নের উত্তর আপনারা নিজেরাই পেয়ে যাবেন।
আজ পাড়ার মুদিখানার লিস্টেও বাংলা নেই। ওরা লেখেন —G. masla, g. soap, D.kathi। দোকানিরা মনে করেন ইংরেজিতে লিখলেই লাভ। এরা বাংলা অক্ষর বর্জন করেছেন, এ এক সার্বিক অবক্ষয়। যেন ইংরেজিতে লিখলে বাণিজ্যে লাভ হবে–এমনি হতভাগ্য এ জাতি।
এ তো গেল দোকানের ব্যাপার, ইশকুলের দিকে একটু নজর ফেরাই। আমি একবার আমার অধ্যক্ষকে স্কুলের বিজ্ঞপ্তি, নির্দেশ ইত্যাদি বাংলায় লেখা চালু করার পরামর্শ দিয়ে মহাসংকটের সৃষ্টি করেছিলাম। যুগযুগান্তর ধরে নোটিশ This is for information of the students and teachers …a vacation of 25 days will begin from tomorrow on account of Durga puja, Lashhmi puja, kali puka etc., and school will reopen on…। এ বয়ান লিখে অভ্যস্থ মাস্টারমশাই কলমটি হাতে নিয়ে থমকে গেলেন দুর্গাপূজা, লক্ষ্মী পূজা বানান কি ঠিক হল? দূর্গা না দুর্গা—লক্ষীতে একটা ম-ফলা দিতে হবে কি? বিষয়টি এখানেই থেমে যায়। আর এগোয় না। বাংলায় লেখা বড্ড ঝামেলা, এর চাইতে ইংরেজিই ভালো—ভুল হলেই বা কি? বাংলাকে আমরা আর কাজের ভাষা বানাতে পারছি না—কারণ চাইছি না।
পড়াশোনা মানেই গল্পের বই—এই ভ্রান্ত ধারণা আমাদের। সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, পরিবেশ, সিনেমা, খেলাধুলা—এতসব বিষয়ের বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার বাংলা ভাষায় রয়েছে, তবু আমরা সেদিকে তাকাই না।
ইন্টারনেটও আজ বাংলার মুক্তির পথ খুলে দিয়েছে। জাংক তথ্যের ভিড়ে নিজের রাস্তা খুঁজে নেওয়াটাই কাজ।
বাংলাকে কেবল বিলাসী কাব্যকাননে বন্দি না রেখে কাজের ভাষা উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে পারি আমরা। সংবাদপত্র, প্রকাশনা, গবেষণা, প্রশাসন, বিজ্ঞাপন—সব ক্ষেত্রেই বাংলা ব্যবহারের পরিস্থিতি আমরাই তৈরি করতে পারি।
বঙ্গসাহিত্যের কাজ মানে কিছু নিষ্প্রাণ অক্ষরের পেছনে ছোটা নয়, কবিতা লেখা নয়, বছরে কয়েকটি দিন ভাষাশহিদের উদ্দেশে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, মঞ্চে উঠে দেশপ্রেমের গান নয়, দেশের নেতা, মন্ত্রী, বিশিষ্টজনের গলায় গামোছা ঝুলিয়ে সংবর্ধনা জ্ঞাপনই নয়, এর কাজ আরও গভীরে।
নিজ ভূমির মানুষজন, পাখপাখালি, গাছপালা, শাকসবজি, শস্য, ওষধি বৃক্ষ, ফুল ফলকে নিজের ভাষায় চিনে নেওয়াই আসল সাহিত্য প্রেমীর কাজ। সাহিত্য প্রেমীর কাজ হল নিজ পরিবেশ প্রতিপার্শ্বকে চিনে নেওয়া নিজের ভাষায় এবং অপরকে সেটা চিনে নিতে অনুপ্রাণিত করা। তবেই এ ভূমির প্রতি ভালোবাসা জাগবে মনের ভেতর। আমাদের পূর্বজরা এ কাজ অনেক এগিয়ে রেখেছেন, আমরা এদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকলে কি হবে?
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, জগদানন্দ রায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার এরা এত এত অমূল্য সম্ভার রেখে গেছেন আমাদের জন্য। ইংরেজিতে এসব কি পাব? অন্যরম কিছু পেলেও এসব তো পাওয়া যাবে না ! এখানেই রয়েছে আমাদের নিজস্বতা। একদিন এসব ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী, আজ এসব কিছু থেকে আমরা দূরে সরে গেছি। কারণ আমরা নিজের ভাষা থেকে দূরে সরে গেছি। ভাষাবিহীন আমাদের নিজের পৃথিবীটাই নিজেদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বঙ্গসাহিত্য রাতারাতি এ সব কিছুই শেখাবে না — তার অভীষ্ট দৃষ্টিটা খুলে দেওয়া। বাকি পথ তো নিজেদেরই।
একটা গান শোনা যায় মাইকে ‘মন চলো নিজ নিকেতনে, সংসার বিদেশে, বিদেশীর বেশে ভ্রমো কেন অকারণে।’ আমাদের বাঙালির হচ্ছে এ দশা, ভাষাহারা, অক্ষরহারা। কেতাব ছুট এ বাঙালির চোখের সামনে ইংরেজি হিন্দি অক্ষরের নৃত্য, কানে অষ্টপ্রহর হিন্দি গানের কলি, মোবাইল বাহিত বিজাতীয় বয়ানে ভিন্ন ভাষার দাপট। আমাদের শহর গ্রাম শহরতলির সর্বত্রই ভিন্ন ভাষার জয় জয়জয়কার। পরিস্থিতি যে দিকে চলছে আগামীতে বাঙালির ভ্রম হবে এ কোন বিদেশে তার বাস, ভাষাশহিদের ভূমি না অন্য কোনও প্রদেশে?
(এই লেখাটি আসলে ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে শিলচরে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন আয়োজিত সাংগঠনিক কর্মশালায় সঞ্জীব দেব লস্করের উপস্থাপনা)



