Barak UpdatesHappeningsBreaking News
কত কথা যে রইল বাকি, কুন্তল ! লিখেছেন উত্তমকুমার সাহা

//উত্তমকুমার সাহা//
১৯৯৭ সালে কয়েকদিন সময়প্রবাহে কাজ করেছিলাম। তখনই কুন্তলের সঙ্গে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা। যুগশঙ্খে ইস্তফা দিয়ে গুয়াহাটিতে গিয়ে সময়প্রবাহে যোগ দিই বটে, কিন্তু থাকার জায়গা জুটছিল না। প্রথম দুদিন ত্রিপুরা ভবনে ছিলাম। তখনকার সময়েই দৈনিক ২৭০ টাকা রুমভাড়া। দ্বিতীয় দিনে তুষার (সাহা)-দা এ কথা জেনে ঘর খুঁজতে নিয়ে বেরোলেন। বহু জায়গা ঘুরেও আমার সাধ্যের মধ্যে ঘর মিলল না। পরে তিনিই কুন্তলকে ডেকে বললেন, ওকে তোদের সঙ্গে রাখ। দৈনিক ২৭০ টাকায় থাকছে, কতটাকা বেতন পাবে!
কুন্তল-পার্থ সে সময়ে একসঙ্গে থাকত। দুজনেই তুষারদার কথা ফেলতে পারেনি। এ ভাবেই আমি তাদের রুমমেট হয়ে গেলাম। প্রথম দুদিন জড়তা থাকলেও তৃতীয় দিনে কুন্তলই ডেকে গল্প জুড়ল। কিন্তু আকাশবাণী শিলচর কেন্দ্রের অস্থায়ী ঘোষক পদের লিখিত পরীক্ষায় পাশ করার খবর পেয়ে ১৮-তম দিনে সময়প্রবাহের চাকরিতে ইতি টানি। ফিরে আসি শিলচরে। ফিরে আসি যুগশঙ্খের বার্তা সম্পাদক পদেও।
১৯৯৯-র ডিসেম্বরে যুগশঙ্খ গুয়াহাটি সংস্করণ শুরু করার দায়িত্ব দিয়ে আমাকে গুয়াহাটিতে পাঠালে আবার কুন্তলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হতে লাগল। কিছুদিন পর সে সময়প্রবাহ ছেড়ে যুগশঙ্খে যোগ দেয়। একসঙ্গে আমরা প্রায় চার বছর কাজ করি। ঘনিষ্ঠতা তখন বন্ধুত্বের রূপ নেয়। বাড়তে থাকে ঘোরাফেরা, গল্প, আড্ডা।
গুয়াহাটিতে আমাদের আড্ডায় অবশ্য কুতর্ক, পরনিন্দার চেয়ে সমসাময়িক সাহিত্য নিয়েই বেশি আলোচনা হতো। কুন্তলের পত্রিকা ও বইপত্র পড়ার আগ্রহ ছিল প্রচণ্ড। কলকাতার কোন পত্রিকা কোন সংবাদটাকে কীভাবে লিখেছে, কী শিরোনাম করেছে, সে সবই সে খুব খেয়াল করত। বাক্য গঠন এবং বাংলা বানানেও তার দখল ছিল অসাধারণ। ওই নিয়েই জমত আমাদের আড্ডা। অংশ নিত বিকাশ (সরকার), সমর (দেব)-দা, বাসব (রায়), জয়রাজ (সিনহা)-ও। সকলের সঙ্গে মেশার সহজাত প্রবণতা থেকে আড্ডায় নতুনদেরও বেশ গুরুত্ব দিত সে।
২০০৪ সালে কুন্তল যুগশঙ্খ ছেড়ে সাময়িক প্রসঙ্গে যোগ দেয়। এর কিছুদিন পর আমিও একইভাবে সাময়িক প্রসঙ্গে আসি। কুন্তল গুয়াহাটিতে নতুন পত্রিকার প্রতিনিধি, আর আমি চলে আসি শিলচরের কার্যালয়ে। মোবাইলে প্রায় প্রতিদিন দুজনের কথা হতো।
সে ছিল কাজপাগল, নিজের দায়িত্বটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করত। তাই পেশার জায়গায় কুন্তল ছিল সকলের প্রিয়। কোনও কাগজেই কর্তৃপক্ষকে তার কাজ নিয়ে কথা বলতে হয়নি। সাময়িক প্রসঙ্গের কর্ণধার তৈমুর রাজা চৌধুরীর অত্যন্ত প্রিয় কয়েকজনের অন্যতম ছিল কুন্তল চক্রবর্তী। সদস্য না হয়েও গুয়াহাটিতে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের নানা কাজে সে সাহায্য করেছে। গুয়াহাটিতে থেকেও নির্ভয়ে বাঙালি বঞ্চনার বিরুদ্ধে এবং বরাক উপত্যকার প্রতি অবহেলার প্রতিবাদে নিয়মিত লিখে গিয়েছে সাময়িক প্রসঙ্গে।
পরবর্তী সময়ে গুয়াহাটিতে গেলে কুন্তলের সঙ্গে দেখা করা ছিল আমার সফরসূচির অন্যতম। আনন্দবাজারের প্রতিনিধি হিসেবেও যখনই গুয়াহাটির দায়িত্ব পড়ত, তখনও কুন্তলকে পাশে পেয়েছি। তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়ার পর ফোন করতে কিছুটা ইতস্তত বোধ করতাম । সে-ই নানা সংবাদ, সংবাদের বিশ্লেষণ নিয়ে ফোনে আলোচনা জুড়ে দিত।
কত কথা, কত কথা যে অসমাপ্ত রয়ে গেল, কুন্তল!



