Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

অনন্ত ভাসান— লিখেছেন সঞ্জীব দেবলস্কর 

// সঞ্জীব দেবলস্কর //

‘ভাসানের গান শুনে ঘর আর খড় গেল ভেসে’, জীবনানন্দের রূপসী বাংলার কিছু চিত্রকল্প বরাকের গ্রামে-গঞ্জে শ্রাবণের মনসামঙ্গল-শ্রবণের সঙ্গে যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে—

বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে –

কৃষ্ণা দ্বাদশীর জ্যোন্সা যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায়—

সোনালী ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়,

শ্যামার নরম গান শুনেছিল—একদিন অমরায় গিয়ে

ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়

বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।

এইসব দৃশ্য বাঙালি জীবনে একদিন বাস্তব ছিল, তা বলা যাবে না, এসব তো আজও বাস্তব, আমাদের সেভাবে দেখা হয়ে ওঠে না। এখনও হাতে লেখা বাইশ কবির পুথি সামনে রেখে পাখোয়াজ, করতাল সহযোগে সুরেলা পাঠ এবং ‘দিশা’র কলি ধরে দীর্ঘ সময় ধরে ভাসানের গানের আসর বসে।

‘নারায়ণ দেবে কয় সুখবিবল্লব হয়”, “গায় কবি ষষ্ঠীবর, মনসার কিংকর” ইত্যাদি ভণিতাযুক্ত গীত শ্রাবণের আকাশে কান পাতলে এখনও শোনা যায়, এখনও শোনা যায় ‘পয়ার প্রবন্ধে বলি একটি লাচাড়ি।’

এই ‘লাচাড়ি’ হল সুরেলা গদ্যে চান্দ সওদাগর এবং মনসার বিবাদ, বেহুলার ভাসান, কলার ভোরায় ভেসে মৃত স্বামীকে নিয়ে দেবপুরীতে পৌঁছানো, নৃত্যগীতে দেবতাদের তুষ্ট করে প্রকাশ্য দেবসভায় তাঁর স্বামীর প্রতি মনসার রুঢ় আচরণের প্রতিকার প্রার্থনা, চণ্ডী ও শিবের প্রশ্রয়ে মনসার বিচার এবং শেষ পর্যন্ত মনসাকে বাধ্য করে লক্ষীন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে আনা– এ এক মহাকাব্যিক ন্যারেটিভ। মহাকাব্যিক এই অর্থে যে, এর ব্যাপ্তি বহুধা বিস্তৃত, যার সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত একটি অচ্ছেদ্য সুতোয় গাঁথা। হাজার ঘটনা, হাজার চরিত্র, ঘটনার ভিতর আরেক উপকাহিনি, তার সূত্র ধরে আরও অনেক কাহিনির জাল বিস্তার, এবং এরই স্তরে স্তরে তত্ত্বকথা, মানবিক দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, এমনকি কূট রাজনীতির বিশ্লেষণও মিশে রয়েছে।

এ কাহিনি প্রকৃত অর্থেই একটি লৌকিক মহাকাব্য, যাকে ইউরোপীয় পরিভাষায় folk epic বলা চলে। Beowulf-এর মতো ইউরোপীয় লোকমহাকাব্যের সঙ্গে এর তুলনা করা যেতে পারে। তবে মনসামঙ্গল-এর বিশেষত্ব তার দীর্ঘায়িত মৌখিক ও পরিবেশনামূলক উপস্থাপনা।

কাহিনিটি যেখান থেকে শুরু, সেখানেই এসে সমাপ্ত। বেহুলা-লক্ষীন্দরের কাহিনির সূচনা দেবসভায়। এরা ছিলেন ইন্দ্রের সভায় নর্তক-নর্তকী, শাপভ্রষ্ট হয়ে এদের মর্ত্যের পৃথিবীতে মনুষ্যসন্তান হিসেবে নবজন্ম। দৈব অভিপ্রায়ে এদের দীর্ঘ মর্ত্যজীবনের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে দেবতা তাঁদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করেন। এতে অবশ্য প্রধান ভূমিকা নেন মহাদেবের কন্যা মনসা যার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন বণিক্য বংশের এক সন্তান, চান্দ সওদাগর– যাকে পদনত করা এবং অবশেষে তাঁর উপাসনা স্বীকার করতে বাধ্য করা—এই ছিল দেবী মনসার ছল। না হলে দেবসভায় যে তাঁর সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানলাভও হচ্ছে না। আরদ্ধ কর্ম সমাপনান্তে অনিরুদ্ধ-উষা, অর্থাৎ বেহুলা-লক্ষীন্দর অবশেষে ফিরে যায়, পুনরায় প্রতিষ্ঠিত পায় স্বর্গে ইন্দ্রের সভায়।

অর্থাৎ কাহিনি শেষ পর্যন্ত ফিরে যায় তার সৃচনা-বিন্দুতে।

এই বিন্যাসের মধ্যেই মহাকাব্যিক লক্ষণ। মিল্টনের Paradise Lost-এর সমাপ্তিতে প্রথম মানব-মানবী জ্ঞানবৃক্ষের ফল আস্বাদন করে শাস্তিস্বরূপ স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হয়ে পৃথিবীর পথে তাদের যাত্রা। একে অপরের হাত ধরে এরা এগিয়ে যায় পৃথিবীর দিকে। হারানো স্বর্গ একদিন ফিরে পাওয়ার প্রত্যয় থাকে তাদের মনে।

কাব্যের শুরুতেই মানবজাতির নির্বাসনের মুহূর্তে এ প্রত্যয়ের একটি ইঙ্গিত আছে, “Till one great man restore us and regain / The blissful seat।” অর্থাৎ হারানো স্বর্গে পুনরায় উত্তরণের স্বপ্নই Paradise Lost-এর অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষা। পরে মিল্টন এই পুনরুদ্ধারের কাহিনিকেই Paradise Regained-এ স্বতন্ত্র কাব্যরূপ দেবার প্রয়াস পেয়েছেন।

পদ্মাপুরাণ-এর ক্ষেত্রে যেন সেই পুনরাগমনের সংকেতটি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এখানে শুধু হারানো স্বর্গ ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা নয়, কাহিনির অন্তিম মুহূর্তেই অনিরুদ্ধ-উষা, অর্থাৎ বেহুলা-লক্ষীন্দর স্বর্গে ইন্দ্রের সভায় পুনরায় সংস্থাপিত হয়। মর্ত্যের দীর্ঘ পরীক্ষা, বেদনা, সংগ্রাম ও বিচ্ছেদের পর দেবসভায় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে কাহিনি তার আদিবিন্দুতে ফিরে আসে। এই অর্থে পদ্মাপুরাণ-এর সমাপ্তি যেন প্রকৃত অর্থেই একটি Paradise Regained।

কিন্তু এখানেই পদ্মাপুরাণ ও মিল্টনের মহাকাব্যের মৌলিক পার্থক্য। মিল্টনের কাব্য একটি সচেতন সাহিত্যিক সৃজন– কবির একক প্রতিভা, পরিকল্পনা ও শিল্পদক্ষতায় এর নির্মিতি। সে অর্থে এটি একটি literary epic। কিন্তু পদ্মাপুরাণ কোনও একক কবির সৃষ্টিকর্ম নয়। বহু কবিকণ্ঠে বহু প্রজন্মের স্মৃতি, বিশ্বাস, কল্পনা ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এর সৃজনপ্রক্রিয়া–যে প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত।

লোকসংস্কৃতি অধ্যয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি একটি সামূহিক সৃষ্টি, একটি collective creation। পুঁথি এখানে তার একটি লিখিত আধার মাত্র। প্রকৃত সৃষ্টিকর্ম সম্পন্ন হয় গায়কের কণ্ঠে, অসংখ্য দিশার কলিতে, পাখোয়াজ ও করতালের তালে, নৃত্যে এবং দোহার ও শ্রোতার সক্রিয় অংশগ্রহণে। কথক বা গায়ক যেমন সৃষ্টির অংশীদার, শ্রোতাও তেমনি সেই সৃষ্টির অংশীদার। এই কারণে পদ্মাপুরাণ একটি মুক্ত গ্রন্থ, যার সৃজন কখনও শেষ হবার নয়।

বরাক-সুরমা উপত্যকা থেকে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, নগাঁও এবং করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দি সহ অবিভক্ত কাছাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এখনও সচল।

মনসার মূর্তি স্থাপন করে পুরোহিতের মাধ্যমে পূজা, আরোপিত বৈদিক কর্মকাণ্ডের সংযোজন, দেবীকে ‘আস্তিকস্য মণির মাতা ভগ্নি বাসুককির অপি জরৎকারু মুণির পত্নি নাগমাতা ইত্যাদি পরিচিতি প্রদান এসব নেহাতই ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাব (আগ্রাসনও বলা অসঙ্গত নয়); ইংরেজিতে cultural appropriation এর পরিবর্তে acculturation শব্দের প্রয়োগ করা যায়। তবে এসব ধর্মাচার নিয়ে নিয়ে আলোচনা এ লেখার উপজীব্য নয়। মনসামঙ্গল হল সংগীত, নৃত্য ও বাদ্যের সহযোগে প্রান্তিক বাংলা এবং সংলগ্ন অঞ্চলের এক লোকমহাকাব্যের দীর্ঘ পাঠ ও পরিবেশনা। এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক সর্প উপাসনা, সর্পভয় নিবারণার্থ বিষহরি দেবীর তুষ্টিবিধান, ওঝার ভূমিকা, প্রয়োজনে ঝাড়ফুক (সর্পদংশনে), এবং এ কাহিনির সঙ্গে সম্পৃক্ত নৌবাণিজ্য, নারী উপাসকদের অবস্থান ইত্যাদি বশ্য স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয় হতে পারে, এখানে এ দিকে আর যাওয়ার অবকাশ নেই।

শ্রাবণের সন্ধ্যায় গৃহস্ত বাড়িতে পুঁথি খুলে বসা, গায়েনের কণ্ঠে উচ্চারিত কাহিনির এগিয়ে চলা, ‘দিশা’র কলিতে শ্রোতার মন ধরে রাখা, বাদ্যের তালে কাহিনির আবেগকে জাগিয়ে তোলা– এ এক সম্পূর্ণ লোক-নান্দনিক পরিসর। ধর্ম-সাহিত্য-সংগীত, স্মৃতি ও সমবেত সৃষ্টির এমন মিলনেই পদ্মাপুরাণের যেন এক জীবন্ত সত্তায় উত্তরণ।

ভাসানের মধ্যে কেবল বেহুলার ব্যক্তিগত শোক বা লক্ষীন্দরের পুনর্জীবনই নেই। ভাসান লোকায়ত বাঙালি জীবনের এক প্রতীকেও পরিণত হয়েছে।

হারিয়ে যাওয়া সম্পদ, ক্ষমতা, প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, মর্ত্য থেকে স্বর্গে এবং স্বর্গ থেকে আবার মানুষের স্মৃতিতে ফিরে আসার এক অনন্ত যাত্রার প্রতীক।

বরাকের কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কাব্যে সেই অনন্ত ভাসানের প্রতীকী ব্যঞ্জনাই যেন নতুন করে ধ্বনিত হয়েছে:

‘এখনও বুকের দ্বিজ বংশীদাস কহে

হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কালীদহে।

ডহরের ঘোর লাগা গহনের টানে

সায়ের ঝিয়ারী যায় অনন্ত ভাসানে।’

এ অনন্ত ভাসান কেবল বেহুলার ভেলা ভেসে যাওয়া নয়। এটি একটি জীবন্ত কাব্যের, একটি এবং কাব্য আধারিত লোকসমাজের, একটি সংস্কৃতির অবিরাম যাত্রা।

পুথির পাতা শেষ হয়, আসর ভেঙে যায়, গায়েন বাড়ি ফেরেন, কিন্তু কাহিনি শেষ হয় না।

পরবর্তী বর্ষায় আবার পুথি খুলবে, পাখোয়াজ-করতাল বাজবে, নৃত্যের পোশাক পরে ওঝা (এবং তৃতীয় লিঙ্গের উপাসক-গায়কের) কণ্ঠে আবার দিশার কলি উঠবে, দেবসভায় বেহুলার পায়ের ঘুঙুরের ঝংকার উঠবে—‘নাচে সুন্দরী/রঙ্গে মোহিলা দেব ত্রিপুরারী।’ বাঙালির চলমান জীবন স্রোতে এ ভেলা ভাসতেই থাকবে। সেই অর্থে পদ্মাপুরাণ কোনো সমাপ্ত গ্রন্থ নয়, তো অবিরাম সৃজনপ্রক্রিয়ায় ভেসে চলা এক লৌকিক মহাকাব্য, যার শেষ পঙ্‌ক্তির পরেও তার ভাসান চলতেই থাকে—‘হেথা নয় হেথা নয় অন্য কালীদহে…।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker