Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story
অদম্য ইচ্ছাশক্তিই ৫৬৫০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে তমাল-শম্পাকে
বরফপ্রপাত মুহূর্তে চেহারা বদলায়! বেস ক্যাম্পের প্রস্তর খণ্ডেও বিভেদের রাজনীতি!

//উত্তমকুমার সাহা//
শিলচর, ৮ জুন: এভারেস্ট বেস ক্যাম্প। নামেই স্পষ্ট, এখান থেকে মূলত পর্বতশৃঙ্গের দিকে যাত্রা শুরু। মাউন্টেনিয়ারিং ল্যাঙ্গুয়েজে, সামিট করা। এ যে কী কঠিন কাজ, বেস ক্যাম্পে পৌঁছাতে গিয়েই টের পেয়ে যান বণিক দম্পতি। ২৩ মে রাতে শম্পা এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে, পুরো রাত বসে কাটান। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তাঁর কথায়, “ভাবছিলাম, এতটা এসে বুঝি ব্যর্থ মনোরথে ফিরতে হবে। চোখে ভাসছিল, সামিট করার পরও রুম্পা দাসের মনমরা ছবিটা। সঙ্গী সুব্রত ঘোষের দেহ হিলারি স্টেপের কাছে পড়ে রয়েছে। তাঁকে ছেড়েই রুম্পাকে নেমে আসতে হচ্ছে।”

পরদিন সকালেই শম্পা সুস্থ হয়ে ওঠেন। ২৫ মে বিকাল চারটায় আসে সেই স্বপ্নপূরণের মুহুর্ত। শম্পা বললেন, “সাগরমাতাকে ছোঁয়ার নেশায় ভুলেই যাই, কী অসহ্য কেটেছে ২৩-র রাতটা।”
বেস ক্যাম্পের সুবিশাল এক প্রস্তরখণ্ডকে নেপালিরা ‘সাগরমাতা’ বলেন। একেই শেরপারা বলেন ‘চমোলুঙমা’। এত উচ্চতায়ও কিন্তু বিভেদের রাজনীতি ফুরিয়ে যায়নি। শেরপারা বড় বড় হরফে লাল কালিতে ওই পাথরের গায়ে ‘চমোলুঙমা’ লিখে রেখেছেন। নেপালিরা একই কালিতে এক ডিজাইনে এর সামনে ‘নো’ লিখে দিয়েছেন। শেরপাদের বোঝা বহনের কষ্টে মন কাঁদলেও শম্পার কাছে ওই প্রস্তরখণ্ড ‘সাগরমাতা’ই।

২০২৩ সালে এগারোদিন হেঁটে অমরনাথ, চারধাম গিয়ে এভারেস্ট চড়ার মনোবল পেলেও রোটারিয়ান তমালের এ স্বপ্ন যে অনেকদিনের, তা জানালেন বরাক উপত্যকার প্রথম এভারেস্ট বেস ক্যাম্প (ইবিসি) আরোহী ইন্দ্রনীল চৌধুরী। তিনি জানান, “২০২১ সালে আমার রেকর্ড গড়ার পরই তমালদা ডেকে চায়ে আপ্যায়িত করেছিলেন। তিনি যে স্ত্রীকে নিয়ে বেস ক্যাম্প থেকেও ২৮৬ মিটার উপরে কালাপাথর পর্যন্ত চড়ে এলেন, এটা বরাকবাসীর কাছে এক বড় প্রাপ্তি।”
চার বছর আগের অভিজ্ঞতায় ইন্দ্রনীল বললেন, “অনেক দুর্গম পথ। প্রবল ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন। কোনও রেকর্ড গড়ব ভাবিনি সে দিন।”
রেকর্ডের কথা ভাবেননি বণিক দম্পতি বা বরাকের প্রথম মহিলা ইবিসি জয়ী শম্পাও। তবে তাঁদের সাফল্যে অন্যদের মধ্যে পর্বতারোহন বা ট্রেকিং সম্পর্কে আগ্রহ বাড়বে বলে মনে করছেন এক্সপ্লোরার ক্লাবের প্রধান ডা. লক্ষণ দাস। তাঁর এই বক্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ মেলে নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিঙের স্নাতক আর্চি রায়ের কথায়। তমাল-শম্পার বেস ক্যাম্পে চড়ার সংবাদ শুনে তিনি অভিভূত হয়ে পড়েন। বলেন, “সারা বছর ট্রেক করে আমি যেতে পারিনি। এ বছরেই আমাকে যেতে হবে।” বিশেষ করে, শম্পার সফল অভিযানে বিস্মিত আর্চি। তাঁর বিস্ময়ের কারণ, তমাল নিয়মিত শরীরচর্চা করেন। এক-দুইবার ট্রেকিংয়েও গিয়েছেন। কিন্তু শম্পা কখনও ট্রেকিংয়ে যাননি। এ ব্যাপারে কোনও অভিজ্ঞতাই নেই তাঁর। এমন মনের জোরকে অকল্পনীয় বলেই প্রশংসায় ভাসান আর্চি।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট ৮৮৪৯ মিটার উঁচু। সেখানে চড়া যে অসম্ভবের পর্যায়ে, তা মেনে নিয়েই অধিকাংশ পর্বতারোহী অন্যান্য শৃঙ্গে চড়ার লক্ষ্যস্থির করেন। সে জন্য সবার আগে পৌঁছনো চাই এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে। এর উপরে রয়েছে ক্যাম্প ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর। চতুর্থ ক্যাম্প ছাড়িয়ে কোনও শৃঙ্গে চড়তে পারলেই সামিট সম্পন্ন হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ৭৯০০ মিটারের মধ্যে সীমিত থাকে। কারণ ওই উচ্চতায় অক্সিজেন একেবারেই মেলে না। তাই একে বলাই হয় ডেথ জোন।
তমাল জানান, “এতটা ঝুঁকি নিইনি। প্রথমেই চূড়ান্ত করি, বেস ক্যাম্পে যাব। তাও তিব্বত রুট বাদ দিয়ে কাঠমান্ডুকে বেছে নিই। কারণ ওই পথে বিমানে লোকলা পর্যন্ত যাওয়া যায়।” এও অবশ্য কম ঝুঁকির নয়। ১৮ আসনের বিমান। প্রতি দুই-তিন বছর অন্তর দুর্ঘটনায় পড়ে।
লোকলা থেকে তমালদের পর্বতাভিযান শুরু। প্রথমেই ফাকডিং হয়ে নামচে বাজার। যাকে সাধারণত শেরপা ওয়ার্ল্ড বলে। পর্বতপ্রিয়দের প্যারাডাইসও বলা হয়। পথে পড়ে কুম্ভ আইস ফল্ট। এই বরফপ্রপাত আবার মুহূর্তে চেহারা বদলায়। সেখানে শেরপারাই ভরসা। তাঁরাই বুঝতে পারেন, কোন বরফখণ্ড কতক্ষণ এক জায়গায় থাকবে। নামচে বাজার থেকে খুমজুং। এর পরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৮৬০ মিটার উচ্চতায় রয়েছে ডিবুচে। এরও ৫৫০ মিটার উঁচুতে ডিংবুচে। সেখানে একরাত থাকা। ডিংবুচেতেই সবুজ শেষ, শুধুই ছোট-বড় পাথর। পর্বতের এই প্রতিকূলতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পরের দিন ৩৫০ মিটার উঁচুতে চড়া, আবার ফিরে আসা। পরে লবুচে (৪৯৪০মিটার)-তে চড়ে একরাত থেকে গোরকসেপের দিকে যাত্রা। তখন থেকেই ৫১৭০ মিটার উঁচু ওই জায়গায় পৌঁছনোর উত্তেজনায় টগবগ করতে থাকেন সবাই। তমাল-শম্পা জানান, তাঁদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। কারণ আর ১৯৪ মিটার পরেই যে বেস ক্যাম্প! ২৫ মে গোরকসেপে মধ্যাহ্নভোজন সেরে চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে যাত্রা। বিকাল চারটায় আসে সেই মুহুর্ত। স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত। না জেনেই রেকর্ড গড়ার মুহূর্ত।
সেখানে আধ ঘণ্টা কাটিয়ে এ বার নামা। নামা মানে শুধুই নাগাড়ে নামতে থাকা এমন নয়। ওঠা-নামা দুটোই চলতে থাকে। গোরকসেপে ফিরে সেখানেই রাত কাটান তাঁরা। পরদিন ভিন্ন পথে কালাপাথরে (৫৬৫০ মিটার) চড়়া এবং ফেরিসিতে নামা। ২৭ মেতে নামচে বাজারে ফিরে আসা। এর পরদিন লোকলা। আর লোকলা মানেই মোবাইল ফিরে পাওয়া, শিলচরে ফেরার তীব্র বাসনা। বিমান ধরো, রেলে চড়ো, পাহাড়লাইনে ঠিকঠাক পেরনো যাবে কিনা, এ নিয়ে দুশ্চিন্তা। শেষপর্যন্ত প্রবল বন্যাতঙ্কের মধ্যে ঠিকঠাক শিলচরে ফিরলেন সফল পর্বতারোহী তমাল-শম্পা। (শেষ)
(তিনজনের ছবিতে রুম্পা দাসের সঙ্গে বণিক দম্পতি)


