India & World UpdatesHappeningsBreaking News

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণে’ হতাশার সুর

ওয়েটুবরাক, ২৮ আগস্ট: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণ’ দলের সম্ভাবনাকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে ভোটাররা ইতিহাসে প্রথমবার রাজ্যে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে বিপুল উৎসাহে ভোট দিয়েছেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।

২০১১ সালে ‘পরিবর্তন’-এর ডাক দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় ঝড়ের গতিতে এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর মধ্য দিয়ে সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। মমতা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দল ও প্রশাসন একাকার হয়ে যাওয়ার যে বামফ্রন্ট মডেল, এর অবসান ঘটাবেন। বন্ধ করবেন রাজনৈতিক হিংসা এবং শিল্পায়নের নামে জোর করে জমি অধিগ্রহণের প্রথা—যা সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে বামফ্রন্ট সরকার করার চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় দেখা গেল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু বামফ্রন্ট সরকারের কিছু ভুলের পুনরাবৃত্তিই করেননি, নিজের কিছু ভুলও যুক্ত করেছেন। তাঁর দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল, সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প থেকে বেআইনি কমিশন বা ‘কাটমানি’ নেওয়া, ব্যবসায়ী, পরিবহণকর্মী ও দোকানদারদের কাছ থেকে ‘তোলাবাজি’ করা এবং জমি দখল করা।

পশ্চিমবঙ্গে কখনও ক্ষমতায় না থাকা বিজেপির কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছিল ঐতিহাসিক সুযোগ। শুধু আগের সরকারের ভুল শুধরে দেওয়াই নয়, প্রথম হিন্দুত্ববাদী সরকার হিসেবে নিজেদের ছাপ রাখারও সুযোগ ছিল তাদের সামনে।

কিন্তু তার বদলে ইতিমধ্যেই হতাশার সুর শোনা যাচ্ছে। শুধু রাজ্যের বিজেপি বিরোধীদের মধ্যেই নয়, যারা বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছেন, তাঁদের একাংশের মধ্যেও হতাশা দেখা দিয়েছে। ১৫ বছর ধরে চলা তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকে গ্রাস করেছিল তিনটি বিষয় —তোলাবাজি, ঔদ্ধত্য এবং জমি দখল। বিজেপির ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও সেগুলিই আবার ফিরে আসছে।

দলের রাজ্য নেতৃত্বের কাছে ইতিমধ্যেই কয়েক ডজন অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কলকাতা ও তার আশপাশের এলাকা এবং বিভিন্ন জেলার কয়েকজন বিধায়ক-সহ দলের একাংশের নেতা প্রাক্তন তৃণমূল সরকারের ‘সিন্ডিকেট সংস্কৃতি’র পুনরাবৃত্তি করছেন।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘কাটমানি’, সিন্ডিকেটের তোলাবাজি এবং বেআইনি টোল আদায় সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর জন্য তিনটি টোল-ফ্রি হেল্পলাইন চালু করেছেন। সাধারণ মানুষকে এই ধরনের অপরাধের খবর জানাতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

তিনজন সিনিয়র আইপিএস অফিসারকে দুর্নীতি দমন শাখায় বদলি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দলের নেতা ও সরকারি আধিকারিক—উভয়ের কর্মকাণ্ডের ওপর ২৪ ঘণ্টা নজরদারি বজায় রাখবে। তোলাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগে বিজেপি ইতিমধ্যেই প্রায় ৫০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে এবং ১০০-রও বেশি নেতাকে সরিয়ে দিয়েছে। এঁদের বিরুদ্ধে প্রাক্তন তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে।

বিজেপির সমর্থক এবং দলের অভ্যন্তরের লোকজনও বাংলায় বিজেপিকে ঘিরে জনমানসে ধারণা এত দ্রুত বদলে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন। তাঁরা বলছেন, বাংলার ঐতিহাসিক জনাদেশ শুধু বিজেপির পক্ষে ছিল না, তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও ছিল। দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তৃণমূলের সামান্যতম অপসংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি নিয়েও বিজেপিকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। নতুন সরকারের আমলে দুর্নীতি নিয়ে কিছু রিপোর্ট ও সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট অতিরঞ্জিত হলেও সেগুলি পুরোপুরি মিথ্যা নয়। সরকারকে অবিলম্বে দুর্নীতি ও তোলাবাজির বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে।

জনমানসে পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি বিজেপির নরম মনোভাব। মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৃণমূলের বহু শীর্ষ নেতাকে যেভাবে দ্রুত এনডিএ-তে জায়গা দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে।

রাজ্যস্তরে বিজেপি সরকারকে তৃণমূলের সেই বিধায়কদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে দেখা যাচ্ছে, যারা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিধানসভায় প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের দাবি করেছে।

বাংলায় জনমানসের এই ‘অপটিক্স’ বা ভাবমূর্তি সামলাতে ব্যর্থ হওয়া আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির জন্য ভালো বার্তা নাও বয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে, বিজেপি যদি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং বাংলায় শিল্প ফিরিয়ে আনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে, তাহলে গোটা ভারতের সামনে তুলে ধরার মতো একটি ‘বেঙ্গল মডেল’ তৈরি হতে পারে।

সম্প্রতি দিল্লির চিত্তরঞ্জন ভবনে এক আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, রাজ্য প্রায় পাঁচ দশক ধরে “স্থায়ী হতাশার মানসিকতা”-র মধ্যে ছিল। ক্রমশ এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্পে পশ্চিমবঙ্গ আর প্রাসঙ্গিক নয়।

দাশগুপ্ত বলেন, চ্যালেঞ্জ শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ করা নয়। বাঙালি উদ্যোক্তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনাও জরুরি, যাতে স্থানীয় ব্যবসাগুলি ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের স্তর থেকে উঠে ‘বড় লিগে’ প্রবেশ করতে পারে।

নতুন রাজ্য সরকার যদি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে, তাহলেই পুনরুত্থিত বাংলা ২০২৯ সালের জন্য বিজেপির অন্যতম বড় রাজনৈতিক তুরুপের তাস হয়ে উঠতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker