NE UpdatesAnalyticsBreaking News

১৮ বছরের কম বয়সি শিশুদের চিকিৎসা বিনামূল্যে, ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

রাজ্যে যুবশক্তির উন্নয়নে নতুন বিভাগ গঠন করা হবে, খানাপাড়ায় হিমন্তবিশ্ব

গুয়াহাটি, ১৫ আগস্ট : সমগ্র দেশের সঙ্গে অসমেও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে ৮০তম স্বাধীনতা দিবস। গুয়াহাটির খানাপাড়ার পশু চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের খেলার মাঠে কেন্দ্রীয়ভাবে ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হয়। খানাপাড়ার খেলার মাঠে জনগণের উপস্থিতিতে সকালে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত।বিশ্ব শর্মা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পতাকা উত্তোলনের পর দেওয়া ভাষণের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী প্রত্যেক স্বাধীনতা সংগ্রামীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত ৫ বছরে রাজ্যের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। অসমের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্প এবং প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রেও অসম এক নতুন ইতিহাস রচনা করতে প্রস্তুত। আগামী নভেম্বর মাস থেকেই রাজ্যের সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্ট থেকে চিপস নির্মাণ ও উৎপাদন শুরু হবে। এর মাধ্যমে বিশ্বের শিল্প মানচিত্রে অসম এক অনন্য ও নতুন মাত্রা লাভ করবে। একটা সময় ছিল, যখন অসমকে অন্যান্য রাজ্যের উন্নয়নের মডেল অনুসরণ করতে হতো। কিন্তু এখন সেই দিন বদলেছে। হাজারো চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে রাজ্য নিজস্ব ‘উন্নয়নের অসম মডেল’ গড়ে তুলেছে। অসম মডেলের বড় সাফল্য হল মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ। যার জন্য আজ অসমকে অন্য রাজ্য অনুসরণ করে। অসমের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য হিসাব করে দেড় লক্ষ কোটি টাকা খরচ করা হবে।

ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, চাওলুং চ্যুকাফার নীতি আজও অসমের পরিচয়। ২০২৮ সালে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় চ্যুকাফার ৮০০ বছর পূর্ণ হবে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত রাজ্য সরকার অভূতপূর্ব আয়োজনের মাধ্যমে উদযাপন করবে। বিশ্ববাসীর সামনে চ্যুকাফাকে তুলে ধরার চেষ্টা করবে সরকার।

দীর্ঘ ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অসমে আরও ৮টি নতুন সমজেলা হবে। সমজেলাগুলি হবে কমলপুর, রঙানদী, চাবুয়া-লাহোয়াল, খুমটাই, বড়খলা, চিচিবরগাঁও এবং বঢ়মপুর। এছাড়াও ১৮ বছরের কম বয়সি শিশুদের চিকিৎসা বিনামূল্যে করার ঘোষণা দেন তিনি।

উজান অসমের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের হৃদয় ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। এই দুর্যোগে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। ১০২টি আসন আমাদের অহংকারী করেনি, বরং আমাদের সেবা ও দায়িত্বের প্রতি আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছে। শিবসাগর, চরাইদেও, যোরহাট, গোলাঘাট জেলার মানুষকে আশ্বাস দিচ্ছি, ‘আমরা আপনাদের জেলাগুলিতে হারিয়ে যাওয়া ছন্দ ফিরিয়ে আনব। আমরা আমাদের চেষ্টায় কোনও ত্রুটি রাখব না। পুনর্বাসনের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু করেছি। ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রকৃত চিত্র আমাদের কাছে পৌঁছাবে। বন্যাপীড়িত মানুষের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে অর্থের অভাবের মুখোমুখি হতে দেব না। সমস্ত চ্যালেঞ্জ আমরা অতিক্রম করব। আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ধন্যবাদ জানাচ্ছি এনডিআরএফ ও এসডিআরএফ-এর পাশাপাশি প্রত্যেক সেনা জওয়ানকে বন্যাপীড়িতদের সাহায্য করার জন্য। ধন্যবাদ জানাচ্ছি বন্যাপীড়িত মানুষকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা প্রত্যেক ব্যক্তিকে।’

এ দিন ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বন্দেমাতরম’ গানটিকে কংগ্রেসের একাংশ নেতারা খণ্ডিত করে দিয়েছিলেন। ভারত সরকার আবারও এই গানটিকে তুলে ধরেছে। আজ লালকেল্লা থেকে ‘বন্দেমাতরম’ গানটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এই গান ছিল মাতৃভূমির প্রতি এক ঐশ্বরিক বন্দনা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই গান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যতই ভেদাভেদ থাকুক না কেন, আমরা একই মায়ের সন্তান। ক্রীড়াক্ষেত্রে অসমের নাম উজ্জ্বল করা খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘লভলীনা বরগোঁহাই এবং অস্মিতা চলিহাকে অসমবাসীর পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমরা আরও অনেক লভলীনা, অস্মিতা, হিমা, নয়নমণি জন্ম দিতে পারব।’

এ দিন সরকারি কর্মচারীদের সতর্কবার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবারও সতর্ক করে দিচ্ছি। মানুষের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না। এই ডিজিটাল যুগে মানুষ আর সহ্য করে না। মানুষের জন্য উৎসর্গীকৃত হতেই হবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। মুখ্যমন্ত্রী কটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও ঘোষণা করেন। পাশাপাশি ১,০০০ জন কৃষককে মুখ্যমন্ত্রী কৃষি উৎকর্ষ পুরস্কারে সম্মানিত করার কথাও জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জেন-জি কনসেপ্টে বিশ্বাস করি না। এগুলি ইউরোপীয় বিষয়। আমার দৃষ্টিতে কলেজে পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা জেন-জি নয়। সবাই আমার কাছে পুত্র-কন্যা। রাজ্যে যুবশক্তির উন্নয়নের জন্য নতুন একটি বিভাগ গঠন করা হবে।’ মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘রাজ্যের ৪০টি রাজস্বচক্রে এখন থেকে তিন প্রজন্মের নথিপত্র থাকলেই জমি কেনাবেচা করা যাবে। নতুন করে ৬,০০০ কিলোমিটার অসম মালার অধীনে সড়ক নির্মাণ করা হবে।’ মুখ্যমন্ত্রী সন্তানদের শিক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ করার জন্য অভিভাবকদের আহ্বান জানান। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষকে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

বাল্যবিবাহ, সরকারি কর্মচারীদের অবৈধ সম্পর্ক নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাল্যবিবাহের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত ৫ বছরে বাল্যবিবাহের ১২,১৯৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। বাল্যবিবাহে অভিযুক্ত ১,০৯৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অসম পুলিশ ১ নভেম্বর থেকে ফের এক মাসের জন্য বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে। অসম পুলিশ আপসহীনভাবে অভিযান চালাবে। অন্যদিকে, বিবাহবিচ্ছেদ না করে অন্য মহিলার সঙ্গে সংসার করা সরকারি কর্মচারীরাও সাবধান হন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ না করে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে সংসার বা সম্পর্ক করার অভিযোগ এলেই ওই সরকারি কর্মচারীর বেতনের ২০ শতাংশ কেটে প্রথম স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হবে। এই আইন বিধানসভায় আনার চেষ্টা করব। অসম সরকার বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিয়ে ইতিমধ্যেই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।

উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী পুলিশের অভিবাদন গ্রহণ করার পাশাপাশি বিভিন্ন কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত হয়ে ওঠে খানাপাড়ার খেলার মাঠ। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে অসমের বৈচিত্র্যময় শিল্প ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়।। এদিকে, সকালে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের পবিত্র মুহূর্তে গুয়াহাটির শ্রদ্ধাঞ্জলি কাননে স্বাধীনতা সংগ্রামী শহিদদের প্রতি পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করা বীর শহিদদের পবিত্র স্মৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে মুখ্যমন্ত্রী অসমবাসীকে ঐক্য, সংহতি ও শান্তির পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker