Barak UpdatesHappeningsBreaking News

সার্ধশত বর্ষে কাছাড় নেটিভ জয়েন্ট স্টক কোম্পানি

//উত্তমকুমার সাহা//

ওয়েটুবরাক, ১ সেপ্টেম্বর: শিলচর শহরের ঠিক নাভিকেন্দ্রে, দেবদূত মোড়ে এক অভিজাত ভবন। দেখলেই সময় থমকে দাঁড়ায়। দেড়শো বছরের ইতিহাসের সাক্ষী। ব্রিটিশকে চ্যালেঞ্জ করে গড়ে ওঠে বাঙালির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান —- কাছাড় নেটিভ জয়েন্ট স্টক কোম্পানি।

১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত এই অঞ্চলে প্রথম চা গাছ আবিষ্কৃত হয়। এর ২১ বছরের মধ্যে যৌথ কোম্পানি স্থাপন করে কাটাখালের তীরে চা উৎপাদন শুরু করেন স্বপ্নদ্রষ্টা দুই বাঙালি দীননাথ দত্ত ও বৈকুণ্ঠ চন্দ্র গুপ্ত। দেড়শো বছর আগের এই প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলের গর্ব, বরাক উপত্যকার নাগরিক অহঙ্কার।

দক্ষিণ অসমে খুব কম চা বাগানই রয়েছে, যারা নিয়মিত লাভের মুখ দেখে। অনেক বাগান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সেখানে নেটিভ জয়েন্ট স্টক কোম্পানির বহু শেয়ারহোল্ডার গত সোমবার সার্ধশত বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে কোম্পানি পরিচালনা নিয়ে সন্তোষই প্রকাশ করলেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত শহরের বিশিষ্টজনদের কাছে অবশ্য লাভ লোকসানের হিসেব বড় নয়, বরং কথা হলো, তখনকার সময়ে ব্রিটিশকে চ্যালেঞ্জ করে এই কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন এই অঞ্চলের দুই বাঙালি। নেটিভ বলে ভারতীয়দের উপহাস করত ব্রিটিশরা। কিন্তু জাতীয়তাবাদী চেতনায় তাঁরা এই নেটিভ শব্দ জুড়েই তৈরি করেছিলেন ভারতের তৃতীয় জয়েন্ট স্টক কোম্পানি । একদিকে ব্রিটিশের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল যে চা ব্যবসায়ে, সেখানে হাত দেওয়া, অন্যদিকে যৌথ কোম্পানি হিসেবে একে টিকিয়ে রাখা — ওইসব মোকাবেলা করেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল কাছাড় নেটিভ জয়েন্ট স্টক কোম্পানি। এরই সুবাদে সার্ধশত বর্ষ পালন করছে বর্তমান পরিচালনা সমিতি। সোমবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোচনা, সঙ্গীতের সঙ্গে ছিল পুস্তিকা প্রকাশও। এর উন্মোচন করেন বিশিষ্ট লোক গবেষক অমলেন্দু ভট্টাচার্য। উপস্থিত ছিলেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য, সাহিত্যিক অতীন দাশ, ড. দেবশ্রী দত্ত, বিবেক বর্ধন, বাবুল হোড়, অধ্যাপক বিশ্বতোষ চৌধুরী, মধুমিতা দত্ত সহ বিশিষ্টজনরা।

পরিচালন সমিতির পক্ষে চন্দ্রিমা দত্ত বলেন, ১৮৭৬ সালের ৩১ আগস্ট। বরাক উপত্যকায় চা উৎপাদন ও বিপণনের যৌথ কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন দীননাথ দত্ত ও বৈকুণ্ঠ চন্দ্র গুপ্ত —- সিলেটের দুই জমিদারের দুই সন্তান। তাঁর কথায়, কোম্পানির সমৃদ্ধ অতীত ছিল বলেই বর্তমানটা সমৃদ্ধ। আর সেখান থেকেই সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা।

তবে শুধু ব্রিটিশ ভারতে নয়, কয়েক বছর আগেও কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছিল কোম্পানিকে। এই মন্তব্য করে পরিতোষ পাল ও অরূপ দেব জানান, দুই বাঙালির প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি অবাঙালির হাতে চলেই যাচ্ছিল। লড়াই করে একে ঠেকিয়েছিলেন তৎকালীন কোম্পানি সেক্রেটারি পরিমল চন্দ্র পাল। সঙ্গে ছিলেন অসিত দত্ত ও শর্মিলা দত্ত।

মহিলা কলেজ শিলচরের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা ড. দেবশ্রী দত্ত জানান, জাতীয়তাবাদী ভাবনাতেই যে এই কোম্পানি গড়ে তোলা হয়েছিল এর প্রমাণ রয়েছে নানা ব্রিটিশ রিপোর্টে। উল্লেখ রয়েছে, ১৯২৯ সালে ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস পালন শুরু হলে এই কোম্পানিতেও প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারিতে পতাকা উত্তোলন করা হতো।

অতীন দাশ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিকে নাগরিক সম্পদ বলে উল্লেখ করে বলেন, এটি সামগ্রিক ভাবে এই অঞ্চলের গর্বের জায়গা।

এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তায় গুরুত্ব দেন লোকগবেষক অমলেন্দু ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, এর ইতিহাস বাঙালি সমাজকে নতুন আলো দেখাতে পারে। এই নতুন আলোর কথাই গানে গানে শুনিয়ে গেলেন ড. শান্তনু সরকার, বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য ও নীলাক্ষ চৌধুরী।

নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্রের পক্ষে ড. সুমিতা ঘোষ শোনান, এই কোম্পানির সদর কার্যালয়কে শুধুই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বলা যায় না। এই অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে। এরই স্বীকৃতি স্বরূপ কোম্পানির তরুণ প্রজন্মের দুই প্রতিনিধির হাতে অভিনন্দন স্মারক তুলে দেন ড. ঘোষ ও মঞ্জুরি হীরামণি রায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker