India & World UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story
ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে অবক্ষয় (১), লিখেছেন ড. মনোজ কুমার পাল

✍️ ড. মনোজ কুমার পাল✍️
ভারতবর্ষ বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ১৯৫০ সালের সংবিধান প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে এখানে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। সংসদ মানুষের প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নীতি-নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। স্বাধীনতার আট দশক পর আজ সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যায়, জনসাধারণের আস্থা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। সংসদীয় বিতর্কের মান নিচে নামছে, রাজনীতিতে অর্থ, দুর্নীতি ও পেশিশক্তির প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবক্ষয় শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিমণ্ডল নয়, সমাজব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।
সংসদীয় বিতর্কের গুণমান হ্রাস
স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকে সংসদ জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তি ও মতাদর্শের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। নেহরু, প্যাটেল, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, জয়প্রকাশ নারায়ণ, অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রমুখ নেতাদের আলোচনায় বিষয়ভিত্তিক যুক্তি, পরিসংখ্যান এবং নীতিগত প্রশ্ন গুরুত্ব পেত। কিন্তু বর্তমানে সংসদে শৃঙ্খলাভঙ্গ, স্লোগানবাজি, বিলের প্রতিলিপি ছিঁড়ে ফেলা, একে অপরের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য, কটাক্ষ, মাইক্রোফোন বন্ধ করা বা অধিবেশন বয়কট প্রায়ই ঘটছে। বিল বা নীতিনির্ধারণী আলোচনায় প্রকৃত বিতর্ক না হয়ে রাজনৈতিক দলগুলির কাদা ছোড়াছুড়ি মুখ্য উপাদান হয়ে উঠেছে। এতে সংসদের বৌদ্ধিক মান ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। বিশেষভাবে বাজেট অধিবেশনে শ্রমিক, কৃষক বা মধ্যবিত্তের স্বার্থের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা না হওয়ায় গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা সংকুচিত হচ্ছে।
বিরোধী কন্ঠস্বরের উপেক্ষা
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদলকে বলা হয় “বিকল্প সরকার”। সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন আইন পাসের ভিত্তি, তেমনই বিরোধী দলের যুক্তি, সংশোধনী প্রস্তাব, এবং জনস্বার্থমূলক প্রশ্নগুলি গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দশকে দেখা যাচ্ছে, গরিষ্ঠ দলের আধিপত্যে সংসদে বিরোধীদের কণ্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিল প্রায়ই আলোচনা ছাড়াই পাশ হয়ে যাচ্ছে, বিরোধী দলের প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রায় সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য হচ্ছে। ফলে সংসদীয় আলোচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য—বিভিন্ন মতাদর্শ ও নীতির সংঘাত থেকে একটি যুক্তিসঙ্গত সমাধান বের করা—সেটি আর ঘটছে না।
এই প্রবণতা শুধু সংসদীয় ঐতিহ্যকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেও দুর্বল করছে। জনগণ যখন দেখে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বললেও সেই কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত, তখন সংসদের প্রতি আস্থা হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। একদিকে গরিষ্ঠ দলের সংখ্যা বলে একতরফা সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে বিরোধী দলের বক্তব্যের প্রতি উদাসীনতা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে সংসদ কেবল সংখ্যার খেলার মঞ্চে পরিণত হচ্ছে, গণতান্ত্রিক বিতর্কের কেন্দ্রে নয়।
বিরোধী পক্ষের যুক্তি গ্রহণে সরকারের অনীহা
সংসদীয় প্রথায় সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক সহযোগিতা গণতন্ত্রকে সুস্থ ভাবে বিকশিত করে। বিরোধী দলের কাজ কেবল সমালোচনা করা নয়, বরং বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় গরিষ্ঠ সরকার প্রায়শই মনে করে, বিরোধী দলের কোনো বক্তব্য গ্রহণ করা মানেই সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়া। এর ফলে সংসদীয় বিতর্ক অনেক সময় একতরফা সিদ্ধান্তে গিয়ে ঠেকে।
উদাহরণ স্বরূপ ২০২১ সালের কৃষি বিল ও কেন্দ্রশাসিত সংস্থা সংশোধনী বিলের আলোচনায় বিরোধী দলের যৌক্তিক সমালোচনা উপেক্ষিত হয়েছে, যার কারণে জনমুখী সমাধান তৈরি হয়নি। এর ফলে সংসদ কেবল সংখ্যার শক্তির প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, যা গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর
সংসদে বিরোধিতার সংস্কৃতি
ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী পক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র তখনই সুস্থ ভাবে বিকশিত হয় যখন সরকারের পাশাপাশি একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল বিরোধী শক্তি সংসদে সক্রিয় থাকে। বিরোধিতা মানে কেবলমাত্র সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ করা নয়, বরং জনস্বার্থ রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপের গঠনমূলক সমালোচনা করা। সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে, নীতিনির্ধারণী আলোচনায়, কিংবা বাজেট নিয়ে বিতর্কে বিরোধী দল যদি যুক্তি, পরিসংখ্যান এবং নৈতিক অবস্থান থেকে নিজেদের মতামত তুলে ধরে, তবে সরকারের নীতি আরও স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সংসদে বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর কখনও দুর্বল হয়েছে, কখনও বা প্রবল ভাবে শোনা গেছে। তবে সাম্প্রতিককালে অনেক সময় দেখা যায়, বিরোধিতা যেন কেবলমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং যেহেতু বিরোধী দলের তাই সরকারের বিরোধিতা অথবা যেহেতু প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছেন বিরোধী দলের সাংসদ তাই সরকারি পক্ষকে তার বিরোধিতা করতেই হবে। এর ফলে সংসদীয় কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিরোধিতার প্রকৃত সংস্কৃতি অর্থাৎ গঠনমূলক সমালোচনা ও বিকল্প নীতি প্রস্তাবনার ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা, একটি সুস্থ বিরোধিতা কেবল সরকারের ত্রুটি ধরিয়ে দেয় না, বরং জাতির গণতান্ত্রিক যাত্রাপথকে সঠিক দিকনির্দেশও প্রদান করে।
ইতিহাস সাক্ষী, ভারতের সংসদে এক সময় বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাব বা যৌক্তিক পরামর্শ গ্রহণ করা হতো এবং তাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতো না, বরং গণতন্ত্রের পরিপক্বতা প্রকাশ পেত। কিন্তু বর্তমানে এই সংস্কৃতি যেন হারিয়ে গেছে। বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর শোনা তো দূরের কথা, অনেক সময় তাদের বক্তব্য সংসদের কার্য বিবরণীতেও স্থান পায় না। এই প্রবণতা সংসদকে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহমিকার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করছে, যেখানে নীতি-নির্ধারণের যৌক্তিকতা আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।
অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব
ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তির হস্তক্ষেপ ক্রমবর্ধমান। নির্বাচন কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, অধিকাংশ সাংসদের সম্পত্তি কয়েক কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জেতা ৫৪৩ জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে ৫০৪ জন, অর্থাৎ ৯৩% কোটি পতি (ADR) । ২০০৯ সালে এই অনুপাত ছিল মাত্র ৫৮%; ২০১৪ সালে বেড়ে ৮২%, ২০১৯ সালে ৮৮%, এবং ২০২৪-এ পৌঁছেছে ৯৩%। রাজনৈতিক দলে টিকিট পাওয়া এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে প্রার্থীর অর্থসামর্থ্য ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আনুকূল্যের উপর।
এছাড়াও, সম্পদের ভিত্তিতে জয়ের সম্ভাবনাও ভিন্ন—কোটিপতি প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা ছিল ১৯.৬%, যেখানে ১ কোটি টাকার কম সম্পদশালীরা পেয়েছেন মাত্র 0.৭% ।
এর পাশাপাশি, অপরাধমূলক প্রেক্ষাপটেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে নির্বাচিত ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে ২৫১ জন (৪৬%)’র বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ১৭০ জন (৩১%) গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ।
এর ফলে যোগ্য, শিক্ষিত ও জনমুখী নেতারা পিছিয়ে পড়ছেন। সাধারণ মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সংসদে উপেক্ষিত থেকে কর্পোরেট, লবি বা আঞ্চলিক গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে অর্থ ও প্রতিপত্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।
আঞ্চলিকতা ও দলীয় স্বার্থ
ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিকতা ও দলীয় স্বার্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক দশক জাতীয় স্তরের দলগুলিই সংসদে প্রভাব বিস্তার করলেও, ১৯৮০–এর দশকের পর থেকে আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। যেমন—তামিলনাডুতে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস, উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি কিংবা বিহারে রাষ্ট্রীয় জনতা দল। এই দলগুলি নিজেদের রাজ্যের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংসদে বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থান গ্রহণ করে থাকে।
২০১৪ সালের পর বিজেপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও, রাজ্যভিত্তিক দলগুলির চাপ এখনও সংসদের আলোচনায় স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি আইন ২০২০ নিয়ে বিতর্কে আকালি দল পাঞ্জাবের কৃষকদের স্বার্থে এনডিএ জোট থেকে বেরিয়ে যায়। আবার তেলেঙ্গানারই টিআরএস (বর্তমান বিএআরএস) কৃষি বিলের বিরোধিতা করে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত লোকসভা ও রাজ্যসভায় আঞ্চলিক দলগুলির প্রায় ৪০% হস্তক্ষেপ সরাসরি তাদের রাজ্যের নির্দিষ্ট সমস্যা—ভাষা, শিল্প, কৃষি, বা অনুদান ইত্যাদি—কেন্দ্র করে ছিল (PRS Legislative Research, 2023)। এভাবে দেখা যায়, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিকতা জাতীয় নীতি নির্ধারণকে প্রভাবিত করছে। ইতিবাচক দিক হলো—এটি ভারতের বহুত্ববাদী গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে। তবে নেতিবাচক দিক হলো—জাতীয় স্বার্থ অনেক সময় দলীয় বা আঞ্চলিক স্বার্থের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে।
দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব
ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব দীর্ঘদিন ধরে একটি গভীর সংকট হিসেবে চিহ্নিত। স্বাধীনতার পর থেকে একাধিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারি সংসদকে কাঁপিয়েছে—১৯৮০-র দশকে বোফর্স কেলেঙ্কারি, ২০১০ সালে ২জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা গণতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নড়বড়ে করেছে। সরকারি টেন্ডার, রেলওয়ে চুক্তি কিংবা প্রতিরক্ষা ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ সংসদে প্রায়শই তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, তবে কঠোর শাস্তির নজির তুলনামূলক ভাবে কম। এর ফলে সাংসদদের প্রতি জবাবদিহি কমে গেছে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরে এক প্রকার দায়হীনতা তৈরি হয়েছে।
যদিও মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে এই ইলেকট্রোরাল বন্ড ব্যবস্থা বর্তমানে স্থগিত, কিন্তু এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় বিতর্ক তৈরি করেছিল । ২০১৭ সালে চালু হওয়া ইলেক্টোরাল বন্ড ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোকে বেনামী কর্পোরেট অনুদান গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। ২০১8 থেকে ২০২৩-এর মধ্যে প্রায় ₹১২,০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ এই বন্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলির কাছে পৌঁছেছে, যার অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের হাতে গিয়েছে (Association for Democratic Reforms, 2023)। অনুদানদাতাদের নাম গোপন থাকায় জনগণ জানতে পারেনি কোন কর্পোরেট বা শিল্পগোষ্ঠী কোন দলের পিছনে কত অর্থ দিচ্ছে।
(আগামীকাল সমাপ্য)


