India & World UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

ভারতের অভিবাসন নীতি নতুন মোড়ে, লিখেছেন ধর্মানন্দ দেব

///ধর্মানন্দ দেব//

   ভারত সরকার সম্প্রতি লোকসভায় “ইমিগ্রেশন ও ফরেইনার্স বিল, ২০২৫” উত্থাপন করেছে, যা বিদ্যমান চারটি পুরনো আইন প্রতিস্থাপন করবে। বর্তমান অভিবাসন আইনগুলোর বেশিরভাগই ঔপনিবেশিক যুগের, যা আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। বিলটি ২০০০ সালের “ইমিগ্রেশন (ক্যারিয়ারস’ লায়াবিলিটি) অ্যাক্ট” এবং স্বাধীনতার আগের তিনটি আইন—পাসপোর্ট (এন্ট্রি ইন্টু ইন্ডিয়া) অ্যাক্ট, ১৯২০; রেজিস্ট্রেশন অব ফরেইনারস অ্যাক্ট, ১৯৩৯; এবং ফরেইনারস অ্যাক্ট, ১৯৪৬—প্রতিস্থাপন করবে। সরকারের যুক্তি, এই আইনগুলো মূলত বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে প্রণীত হয়েছিল এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক অভিবাসন নীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাই একটি আধুনিক ও সুসংগঠিত অভিবাসন নীতির জন্য নতুন আইন প্রয়োজন। এই বিলের মাধ্যমে ভারতের অভিবাসন ব্যবস্থা আরও কঠোর ও আধুনিক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সহজতর করা এবং বিদেশি নাগরিকদের গতিবিধির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করা। প্রস্তাব অনুযায়ী, Bureau of Immigration নামে একটি সংস্থা গঠিত হবে, যা দেশের অভিবাসন সংক্রান্ত যাবতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। এছাড়া, বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ, অবস্থান ও প্রস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নিয়ম চালু করা হবে, যার লঙ্ঘন করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

এই নতুন আইনের আওতায়, কোনও বিদেশি যদি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ভারতে থেকে যান, তাহলে তাঁকে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে। দালালদের ক্ষেত্রেও পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুপ্রবেশকারীদের জন্য পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, কোনও বিদেশি যদি ভারতের হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেবা নেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনকে সেই বিষয়ে অবহিত করতে হবে। একইভাবে, কোনও বিদেশি যদি কোনও বাড়িতে ভাড়া থাকেন, তাহলে সেই বাড়ির মালিককেও প্রশাসনকে বিষয়টি জানাতে হবে।

বিলের আরও কিছু কঠোর বিধান রয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বাড়ির মালিক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে তাঁদের সংস্পর্শে আসা বিদেশিদের বিস্তারিত তথ্য নিয়মিত প্রশাসনকে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বৈধ পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই ধরা পড়লে পাঁচ লাখ টাকার বেশি জরিমানা এবং পাঁচ বছরের জেলের বিধান রাখা হয়েছে। ভুয়া পাসপোর্ট বা ভিসা নিয়ে ধরা পড়লে জরিমানার পরিমাণ এক থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে এবং কারাদণ্ড দুই থেকে সাত বছরের মধ্যে নির্ধারিত হবে।

নতুন আইনে ইমিগ্রেশন অফিসারদের বিনা পরোয়ানায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। কোনও অভিবাসী বা বিদেশি নাগরিক যদি ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কার্যকলাপে লিপ্ত হন বা ভারত সরকারের বিরোধী অবস্থান নেন, তাহলে তাঁদের ভারতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়েছে। আইনের লঙ্ঘন করলে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায় এই বিলের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “ভারত সবসময়ই বৈধ ভ্রমণকারীদের স্বাগত জানায়, তবে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে অভিবাসন আইন মেনে চলা আবশ্যক। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা যাবে না, বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে।” সরকারের মতে, অবৈধ অনুপ্রবেশ শুধু নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যও নষ্ট করে। তাই অভিবাসন ব্যবস্থার কড়া নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।

তবে, এই বিল নিয়ে বিরোধীদের কড়া আপত্তি রয়েছে। কংগ্রেস নেতা মণীশ তেওয়ারি অভিযোগ করেছেন যে, এই বিল মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করছে এবং সরকারের হাতে অপ্রত্যাশিত ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই আইনের অপব্যবহার হলে রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সৌগত রায় বলেন, “এই বিল বিদেশি মেধাবী কর্মীদের ভারতে প্রবেশ কঠিন করে তুলতে পারে, যা গবেষণা, প্রযুক্তি ও শিক্ষাক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

মানবাধিকার সংস্থাগুলিও এই বিলের কঠোর বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, নতুন আইন বৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও অযথা হয়রানির সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনের ফলে সরকারের হাতে এত বেশি ক্ষমতা থাকবে যে, প্রয়োজনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারবে।

“ইমিগ্রেশন ও ফরেইনার্স বিল, ২০২৫” ভারতের অভিবাসন নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে চলেছে। বিলটি একদিকে যেমন জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর বিধান প্রস্তাব করেছে, অন্যদিকে এটি বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ ও অবস্থান সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোরতর করবে। অবৈধ অভিবাসন রোধ, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সংগঠিত করা এবং প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধি করাই এর মূল লক্ষ্য।

তবে, এই বিলের কিছু কঠোর ধারা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, উচ্চমাত্রার জরিমানা এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদান মানবাধিকারের প্রশ্ন তোলে। বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংস্থাগুলি আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, এই আইনের অপব্যবহার হতে পারে এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর ওপর বৈষম্যমূলক আচরণের আশঙ্কা তৈরি করছে।

যদি সরকার এই বিলের বিতর্কিত ধারা পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনে, তবে এটি ভারতের অভিবাসন নীতি আরও কার্যকর ও সুসংগঠিত করতে পারে। নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে আইন প্রণয়নই হবে সময়ের দাবি।

(লেখক পেশায় আইনজীবী)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker