India & World UpdatesHappeningsSportsBreaking News
ফুটবল নামা: বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির উত্তরাধিকার, লিখেছেন সঞ্জীব দেবলস্কর

//সঞ্জীব দেবলস্কর //
“You will be nearer to Heaven through football than through the study of the Gita.”
— Swami Vivekananda
ফুটবল এমন এক প্রাণ কেঁড়ে নেওয়া খেলা যার আকর্ষণ স্বামী বিবেকানন্দকেও এড়িয়ে যেতে পারেনি। তাঁর এই বহুল উদ্ধৃত উক্তি যদিও ফুটবলের প্রশস্তি নয় তবুও বাঙালির প্রাণপ্রিয় এ খেলার একটা স্বীকৃতি তো বটেই। বাঙালির ইতিহাসে যদি কোনও খেলা সত্যিই মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছতে পেরে থাকে, তা নিঃসন্দেহে ফুটবল ছাড়া আর কিছুই নয়।
জ্যৈষ্ঠ শেষ না হতেই আকাশে মেঘ জমে আর বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে জেগে ওঠে ফুটবলের স্মৃতি। পাঠকেরা মনে করতে পারেন ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সেই দিনগুলো? কত না জল্পনা কল্পনা! কিন্তু হায় ফুটবল জ্বর পৃথিবীকে গ্রাস করতে না করতে নভেম্বরেই যে প্রতিযোগিতা শেষের দিকে এগিয়ে চলল সেটা কে ভেবেছিল! অবশেষে সমস্ত চিন্তার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে এ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পরাজয়! ভারত বাংলাদেশ সহ এ উপমহাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের হতবাক্ করে দেওয়া ঘটনা !
কোথাকার কোন মার্কিন মুলুকের ছোট্ট দেশ ব্রাজিল।
ভারতের সঙ্গে না তাঁর ভৌগোলিক নৈকট্য, না রাজনৈতিক সম্পর্ক। কিন্তু সেমি-ফাইন্যালে সেই নাটকীয় পেনাল্টি শ্যুট-আউটে চার দুই গোলে ক্রোয়েশিয়া সাত সাগর তেরো নদীর ওপারের দেশটিকে কুপোকাত করে দিলে আপামর ভারতবাসী শোকে মুহ্যমান।
এদের মধ্যে সবচাইতে বেশি শোকাকুল ছিল বোধ হয় বাঙালিরা। রেফারি ব্রুনো পেটকোভিক গোল করার আরও একটি সুযোগ না দিয়ে খেলাটিকে ফ্রি কিকে পাঠিয়ে সমাপ্তির দিকে নিয়ে গেলেন। বাঙালি কি তাঁকে ক্ষমা করবে?
বাঙালির এই শোকের কারণ অনুসন্ধান করে মনে হল, কারণটা মূলত সাংস্কৃতিক। ফুটবলের অন্যতম পীঠস্থান কলকাতায় ষাটের দশকে যে স্বর্ণযুগের ফুটবল তারকাদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল এতে ব্রাজিলের ছিল পথপ্রদর্শকের ভূমিকা। চুনী গোস্বামী পি-কে সহ সেদিনের দিকপাল খেলোয়াড়রা সবাই ছিলেন ব্রাজিল অনুরক্ত। পেলে ছিলেন তাঁদের রোলমডেল।
পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে আসাম, ত্রিপুরা সহ পূর্বোত্তর ভারতে ব্রাজিলের কুশীলবেরা নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন সেদিনগুলোতে যখন রেডিওর ধারাভাষ্য, সংবাদ পরিক্রমা আর আনন্দবাজার-যুগান্তর, এবং সঙ্গে সাপ্তাহিক দেশ, অমৃতের মুদ্রাযন্ত্রে পিষ্ট অজস্র অক্ষরমালা যে ফুটবল-উন্মাদনা সৃষ্টি করত এটা পরবর্তী দিনে ক্রিকেট উন্মাদনার প্রাক মুহূর্ত পর্যন্ত বাঙালিকে নেশাচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
ফুটবল নিয়ে বাঙালির গভীর রোমান্টিকতার মূলে সেই ব্রাজিলমুগ্ধতা। শিশু-কিশোর পত্রিকা ‘শুকতারা’, ‘কিশোর ভারতী’তেও ফুটবল আলোচিত, ফুটবল নিয়ে শুরু হল কমিক্স ‘রোভার্সের রয়’। এ কমিকসের জন্য প্রতীক্ষার সেই সব দিনগুলো অনেকেই মনে করতে পারেন।
আর সব কিছুর চূড়ান্ত রূপ দেখা গেল ‘জয়জয়ন্তী’ ছবিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সেই গানে—
“কে প্রথম চাঁদে গেছে বলো তো নাম…
…সব চেয়ে নাম করা ফুটবলে?”
শিশুদের উত্তর– ‘পেলে, ব্রাজিলের পেলে…’! এখানে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মধুক্ষরা কণ্ঠে উচ্চারিত ‘ব্রাজিলের পেলে।’ এ উচ্চারণ ছেলেবুড়ো কিশোর কিশোরীদের মোহিত করে রাখল দীর্ঘদিন। আজও রাখছে। (মাতৃভাষাহারা বাঙালির সাম্প্রতিক প্রজন্ম এর মাহাত্ম্য কি বুঝবে?) এ বাঙালি ব্রাজিলের জন্য আন্তরিক ভাবেই শোকাহত হবে এতে সন্দেহের কি আছে?

সাতের দশকে ফুটবল উন্মাদনায় বাঙালিকে আরেক ধাপ এগিয়ে দিলেন সুখেন দাস– ‘ধন্যিমেয়ে’ ছবিতে গানের প্রয়োগ দিয়ে –‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’। এ গান তো এটাই প্রতিষ্ঠিত করে দিল যে, ফুটবল বাঙালির খেলা। পাঁজিপুথি খুঁজে ফুটবলের জন্মবৃত্তান্ত বের করার আর প্রয়োজন রইল না। এই বাংলার মাটিতে, বলা উচিত বাংলাভাষা ভূগোলের এই আলো হাওয়া রোদ্দুরে, এই ঘাস-মাটি-কাদা জলে জন্ম নিল বাঙালির ফুটবল। কে বলবে এ খেলা একান্তভাবেই ঔপনিবেশিকদের আমদানি?
সাহেবদের আগমনের আগেই এ দেশে নিশ্চয়ই ‘জাম্বুরা’ বলে একটা ফল ছিল। গোলাকৃতি এ ফল দিয়ে ভরদুপুরে খেলা শেষে এ ফলটিরই বুক চিরে ভেতরের শাঁস বের করে গলা ঠাণ্ডা করার প্রথাও ছিল নিশ্চিত।
আমাদের এই ভুবনে চা’ বাগিচার মুক্তভূমি, গ্রামের মাঠ, পরিত্যক্ত ফসল খেত, এমনকি গৃহস্থ বাড়ির চাতলে ফুটবল টুর্নামেন্ট তো গ্রামীন জীবনে একটা পরম্পরা সৃষ্টি করে ফেলেছিল। ব্যাট-বল আর স্টাম্প-বেল এসে পাকাপাকি ক্রিকেট-ঔপনিবেশিতা প্রতিষ্ঠা করলেও এ ফুটবল মোহ কি কমেছে?
এই সব গ্রামীন টুর্নামেন্টে উৎসাহী খেলেয়াড়, দর্শকদের মুখে ইংরেজি পরিভাষাগুলোর দেশীয় রূপ আজও মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। ‘প্লান্টিক’, ‘হফ সাইট’, ‘বেকি’, ‘গৌলি’, ‘হ্যানবল’, ‘ডিবলিং’, ‘ক্যারি’, ‘ফাউল থ্রো’, ‘হ্যাডিং’, ‘কন্নার কিক’ –এরকম পরিভাষা তো আমাদের ব্রাত্য লোকায়ত জীবনে এসে গেছে, আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের ধারাভাষ্য আমাদের কানে শুদ্ধ পরিভাষা ঢেলে দেওয়া সত্বেও। ফুটবল যে আমাদের জীবনের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
এ খেলার সঙ্গে আমাদের জাতীয় আন্দোলনের যে একটা সম্পর্ক ছিল এটা ‘মোহনবাগানের মেয়ে’ ছবিতে আবছা হলেও বেশ ভালোভাবেই ধরা পড়েছিল। সেই যে ১৯১১ সালে গোষ্টপালের নেতৃত্বে মোহনবাগানের খেলোয়াড়রা খালি পায়ে ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের বুটপরা সাহেবদের হারিয়ে দিয়ে এ বিজয়কে স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন– এ তো আমাদের জীবন্ত ইতিহাস।
বাংলার অন্যতম চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের এক সিনেমায় আমরা ফুটবল-পাগল সংবেদনশীল এক ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎ পেয়েছি (বড়বাজারের বিশ্বনাথ বোস, অভিনয় উৎপল দত্ত)। সোমনাথের বন্ধু সুকুমারের মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার কথা শুনে তিনি সান্ত্বনা দিলেন ওই ফুটবল প্রসঙ্গ টেনেই—পাংচার্ড বলের ব্লাডারে যেমন একটা তাপ্পি লাগিয়ে রিপেয়ার করা যায় তেমনি বন্ধুর ডিপ্রেসনের চিকিৎসা করিয়ে নিলেই ওকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা যায়। কী চমৎকার ফুটবলের উপমা! ব্যবস্থা নিলে বলটি আগের মতো ফুলে ফেঁপে নাচবে মাঠে! (বিষয়টি শঙ্করের উপন্যাসে যে রকম এসেছে সিনেমায় ঠিক তেমনি আসেনি অবশ্য, এসেছে কি? মানে সত্যজিৎ রায় রেখেছেন কি না মনে করতে পারছি না)। নব্বুইতে সুমন চাটুজ্জের (অধুনা কবীর সুমন) গানেও শুনেছি ‘প্রথম খেলা লেকের মাঠে প্রথম ফুটবল/ মান্না, পি,কে, চুনীর ছবি’র গল্প’।

সেই সময় টেলিভিশন ছিল না। ছিল অকিঞ্চিৎকর শ্রুতি মাধ্যম (রেডিও) আর মুদ্রণ মাধ্যম। আর ছিল ফুটবল প্রেমীদের মুক্ত দেদার কল্পনার ডানা। সংবাদপত্রে ছাপা অক্ষরই সৃষ্টি করত এ ফুটবল-উন্মাদনা যে উন্মাদনা বাঙালিকে আবিষ্ট করে রাখত।
শিশু-কিশোরদের কাছেও ফুটবল হয়ে উঠেছিল কল্পনার জগৎ। ফুটবল ছিল তাদেরও এক স্বপ্নলোক।
বিশ্বকাপে এসে গেলে ফুটবল অনুষঙ্গে বাংলার সঙ্গীত জগতের আরও ক’জন দিকপালের কথাও স্মরণ করতে হয়। শচীন দেববর্মণ থেকে শুরু করে বহু গুণী শিল্পীর জীবনেই ফুটবল ছিল এক প্রিয় আবেগ। শুনেছি, পঙ্কজকুমার মল্লিক ছিলেন অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ মানুষ। আর তাঁর চোখ এড়িয়ে রিহার্সেলে ফাঁকি দিয়ে ফুটবল দেখতে চলে যেতেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্রের মতো শিল্পীরা। শোনা যায়, এমন দুঃসাহসের জন্য একবার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র শিল্পী তালিকা থেকেই এদের নাম বাদ পড়ার উপক্রম হয়েছিল।
ফুটবল কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সাহিত্যের পাতাতেও জায়গা করে নিয়েছে। বরাকের সাহিত্য, এমনকি নাট্যমঞ্চ এর বাইরে নয়। বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের ‘রূপসী বাংলার কবিতা’ উপন্যাসে ফুটবল এসেছে জীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে। হাইলাকান্দির কিংবদন্তি ফুটবলার বেচন ভট সহ বহু খেলোয়াড়ের কথা উষারঞ্জন ভট্টাচার্যের ‘সেই সকাল’ গ্রন্থে উঠে এসেছে।
শিলচর অবশ্য আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নাট্যকার চিত্রভানু ভৌমিক তাঁর ‘গো ফুটবল’ নাটকে প্রায় পুরো ফুটবল মাঠকেই মঞ্চে হাজির করেছিলেন। এ এক অভিনব নাট্য-প্রয়াস।
ফুটবলের এমনই মোহ যে, এ অধম জীবনে একটি বলে লাথি মারার চেষ্টাও করেনি, সেও একাধিকবার ফুটবল নিয়ে কলম ধরেছে।
গত শতকের ষাটের দশকে গ্রাম কাছাড়ে ফুটবল ছাড়া মানুষের বিনোদনের আর তেমন কোনও মাধ্যম ছিল না। সে সময়ের কথা এ লেখক ইতিপূর্বে লিখেছেন (‘ও গো শ্যামছায়াঘনদিন’ আখ্যানে, কেউ কেউ পড়ে থাকতেও পারেন)। সামান্য পুনরাবৃত্তি চোখে পড়লে আশা করি পাঠক ক্ষমা করবেন।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে সেদিন গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ফুটবল ক্লাব—Eleven Brothers, Eleven Bullets, The Champions, Winners Club, Kashipur Club—সবই ইংরেজি নাম। খেলার মরশুমে গ্রামের পোস্ট অফিসে আসা আনন্দবাজার, যুগান্তর হাতে পাওয়ার জন্য কিশোর যুবক থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। পোস্টমাস্টার মশাইয়ের কড়া নজর থাকত, খবরের কাগজের পাতা যেন সাবধানে ওলটানো হয়।
সারা মাস ধরে আলোচনায় থাকত ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডান স্পোর্টিং, চুনী গোস্বামী, পি. কে. বন্দ্যোপাধ্যায়, থঙ্গরাজ—আর কত নাম!
গ্রামের দেশীয় সেলুন, চৌমাথার চায়ের দোকান কিংবা ক্লাবঘরে সরকার-প্রদত্ত ব্যাটারিচালিত মারফি অথবা বাড়িঘর, চা স্টলে সচল ফিলিপস রেডিওতে যখন কমল ভট্টাচার্য, অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার কিংবা সুকুমার সমাজপতির কণ্ঠে ধারাভাষ্য ভেসে আসত, তখন গোটা গ্রামই যেন এক অদৃশ্য স্টেডিয়ামে পরিণত হতো।
১৯৭২ সালে আকাশবাণী শিলচর প্রতিষ্ঠিত হলে সেই ধারায় যুক্ত হলেন ভাষ্যকার হিসেবে অধ্যাপক কমলেন্দু ভট্টাচার্য এবং চিন্ময়রঞ্জন দে। তবে তারও আগে গ্রামের ফুটবল ফাইনালে পুরস্কার বিতরণের জন্য আনা মাইকে উৎসাহী যুবকেরা আকাশবাণীর ধারাভাষ্যের অনুকরণে নিজেরাই ম্যাচের ধারাবিবরণী দিতেন। চোখে ফুটবল, কানে ফুটবল— সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা।
একটি টুর্নামেন্ট মানেই সমগ্র গ্রামের উৎসব। তখন প্রতিটি স্কুলেই থাকতেন একজন স্পোর্টস ইনচার্জ। হেডমাস্টারের কাছে আর্জি করে বাজেট আদায়, জার্সি, বুট, নেট কেনা, রানিং শিল্ড বাঁচাতে বাইরের খেলোয়াড় ভাড়া করা—সব দায়িত্বই তাঁর কাঁধে। শিক্ষক, ছাত্র, গ্রামবাসী সবাই মাঠ তৈরিতে হাত লাগাতেন। কোদাল দিয়ে লাইন টানা, গোলপোস্ট বসানো, নেট লাগানো—সবই ছিল উৎসবের অংশ।
দশ-বারোটি দল নাম লেখালেই শুরু হয়ে যেত টুর্নামেন্ট। কে রেফারি হবে, কে লাইন্সম্যান, কে ভলান্টিয়ার—সব ঠিক করতে হতো আগেভাগেই। সেদিন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—উদ্বোধনে বাটুবাবুকে পাওয়া যাবে তো?
শোনা যেত, কাছাড়ের কিংবদন্তি এ খেলোয়াড় নাকি অলিম্পিক পর্যন্ত দেখে এসেছেন। বিহাড়া, উধারবন্দ, পাতিমারা, হ্যাপিভ্যালি, সোনাই, লক্ষীপুর, বিন্নাকান্দি, বড়খলা, ডলু, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ, বদরপুর, কাটিগড়া, কালাইন, জালালপুর—সাইকেল, বাস কিংবা পায়ে হেঁটে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াতেন মানুষটি। তাঁকে ছাড়া পুরস্কার বিতরণী যেন অসম্পূর্ণ।
কোনও মতে গ্রেসটেস পেয়ে কিংবা কনসিডারেশনে পাশ করে ক্লাস নাইনে উঠেই আমরা যে ক’জন পড়ুয়া গ্রামের ফুটবলপ্রেমী দাদাদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলাম এ অধম এরকমই একজন। খেলোয়াড় হিসেবে নয়, ইংরেজিতে Protest Letter লেখার জন্য এদের প্রয়োজন।
দল হেরে গেলেই আমাদের ধরে আনা হত। টি-স্টলের বেঞ্চে বসে শুনতে হতো—কোথায় অফসাইড হয়েছে, কোন ফাউল রেফারি দেখেননি, শেষ বাঁশি বাজানোর সময় লাইনস ম্যানের ঘড়ি স্লো ছিল কি না—এসব শুনে এক পৃষ্ঠার একখানা ইংরেজি অভিযোগপত্র লিখে দিতে হতো। গ্রান্ট হলে একটা অতিরিক্ত ম্যাচ প্রাপ্তি। বানান বা ব্যাকরণ শুদ্ধ হল কি না, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না। ইংরেজিতে লেখা হলেই আপিলের ওজন বেড়ে যেত।
আর যা না বললে গল্পের আসল মজাই মিস। সে সময় ফুটবলের সঙ্গে জড়িত থাকত বিস্তর লোকবিশ্বাস এবং জাদুবিদ্যা, তুক্তাক্। এটা অবশ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও আছে। আমাদের ফুটবল মাঠের নিজস্ব লোকবিশ্বাসের মধ্যে ছিল গ্রামের কোন্ দুর্ধর্ষ খেলোয়াড়ের দুই পা মন্ত্রসিদ্ধ, কোন্ দল আগের দিন গোলপোস্টের নিচে তাবিজ পুঁতে রাখত ইত্যাদি। গল্প শোনা যেত কোন প্লেয়ারের বালিশের নিচে থাকত মোটা একখান পুথি, যেখানে থাকত প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার নানা দোয়া ও মন্ত্র। গৌহাটি-প্রবাসী এক গ্রামসম্পর্কীয় এক দাদা বিশেষ বিশেষ কিছু লোকাচারের কথা বলেছেন যার ফলে মাঠের একটি দিক দিয়ে প্রতিপক্ষের বল আর এগোতেই পারত না, গোলপোস্টে ঢোকা তো অসম্ভবই। একে নাকি বলা হতো—’মাঠ থামানো’।
হায় রে! এই মাঠ থামানোর মন্ত্রটা যদি কেউ উদ্ধার করতে পারত, তবে আজ আমাদের বড়ই কাজে লাগত। দেশজুড়ে হিংসা ও বিভেদের যে দর্শন আজ বাঙালিকে খণ্ডবিখণ্ড করতে চাইছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের ফুটবল-ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সেই মন্ত্রই হতে পারত এক শক্তিশালী প্রতিরোধের ভাষা। ফুটবল আমাদের শিখিয়েছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তবে শত্রুতা নয়; আবেগ, বিদ্বেষ নয়; পরিচিতির গর্ব, অপরের প্রতি ঘৃণা নয়। সেই খেলার মাঠেই মানুষ ধর্ম, জাত, ভাষা ও মতের বিভাজন ভুলে একই পতাকার তলায় দাঁড়াতে শিখেছিল। আজ সেই শিক্ষারই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ফুটবলপ্রেমী সুধী পাঠক, এ লেখকের অনেক প্রগলভতা আপনারা এতক্ষণ সহ্য করেছেন, আশা করি এটুকু রসভঙ্গ করার জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন।
ফাইনালের রাত আপনাদের সবার জন্য আনন্দময় হোক। যে যার প্রিয় দলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে থেকেও যেন খেলার সৌন্দর্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মর্যাদা এবং খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। পক্ষে-বিপক্ষে দণ্ডায়মান সকলের মনোস্কামনা পূর্ণ হোক।
শুভরাত্রি, শুভ ফুটবল।।



