Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

শিলচরে নেতাজির পূর্ণাবয়ব মূর্তি উন্মোচন: ইতিহাস, বরাক উপত্যকা তথা উত্তর–পূর্ব ভারতের সংযোগ ও প্রেরণা, লিখেছেন ড. মনোজ কুমার পাল

//ড. মনোজ কুমার পাল//

৩১ আগস্ট ২০২৫, আমাদের স্বাধীনতা মাসের সমাপ্তির দিনে, শিলচরের অগণিত মানুষ রাঙিরখাড়ি পয়েন্টে, ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইলো। বলা যেতে পারে, সমগ্র বরাক উপত্যকার মানুষ মিলিত হলেন স্বদেশপ্রেম ও ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, যখন জাতির মহানায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পূর্ণাবয়ব মূর্তির আবরণ উন্মোচন করলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।

শিলচরের বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাঁর এই উদ্যোগ ও সদর্থক ভূমিকার জন্য।

রাঙিরখাড়ি, শিলচর শহরের এক ব্যস্ততম কেন্দ্র। কয়েক দশক আগে, এখানেই নেতাজির একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি ( আকারে তুলনামূলক ভাবে এতো বড় ছিল না) স্থাপন করা হয়েছিল, যা স্থানীয় মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজির অবদানের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিত। সেই একই জায়গায় সুন্দর, সুউচ্চ, পূর্ণাবয়ব মূর্তির প্রতিস্থাপন যেন পুরনো ইতিহাসকে আরও জীবন্ত করে তুলল।

এটি নিছক এক ভাস্কর্য নয়, বরং বাঙালির বীরত্ব, স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালির আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু শুধু স্বাধীনতার সংগ্রামী নন, তিনি বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাস এবং আত্মত্যাগেরও প্রতীক। তাই, ঠিক একই জায়গায়, এই পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপন এই অঞ্চলের জন্য এক বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা আমাদের আত্মমর্যাদাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিল।

নেতাজির সঙ্গে উত্তর–পূর্ব ভারতের সংযোগ ছিল গভীর। আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাসে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সালে ইম্ফল ও কোহিমার যুদ্ধ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অমোঘ দৃষ্টান্ত। সামরিক সাফল্য না এলেও এই অভিযান ভারতীয়দের মনে স্বাধীনতার অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করেছিল। সেই সময় আজাদ হিন্দ ফৌজ মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও আসামের সীমান্ত এলাকায় অসীম সাহস নিয়ে যুদ্ধ করেছিল। স্থানীয় নাগা, কুকি, মণিপুরি এবং অন্যান্য উপজাতি আইএনএ-কে খাদ্য সহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করেছিল এবং এই সহযোগিতায় আইএনএ তাদের নিজস্ব কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এই সহযোগিতা প্রমাণ করে যে উত্তর–পূর্ব ভারতের জনগণও স্বাধীনতার সংগ্রামে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।

বরাক উপত্যকায় নেতাজির উপস্থিতি ও এই অঞ্চলের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৩৮ সালে কংগ্রেস সভাপতি রূপে তিনি প্রথম শিলচরে আসেন এবং স্থানীয় ছাত্রনেতা সুশীল রঞ্জন চক্রবর্তীকে অনুপ্রাণিত করে বলেছিলেন— “বর্তমানের জন্য কাজ করো, তবে ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুত হও”। পরের বছর, ১৯৩৯ সালে, ফরওয়ার্ড ব্লকের সভাপতি হিসেবে তিনি আবারও শিলচর এসেছিলেন। তাঁর সেই সফরেই বহু স্থানীয় নেতা যেমন মাতা দাস রায়, মৌলবী গোলাম সাবির খান, দেবেন্দ্র পুরকায়স্থ, সুখময় সিং ও হিরণ্ময় সিং তাঁর আহ্বানে ফরওয়ার্ড ব্লকে যোগ দেন। এভাবে শিলচরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর প্রভাব আরও দৃঢ় হয়।

 হাইলাকান্দি অঞ্চলের কংগ্রেস নেতা আবদুল মতলিব মজুমদারের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। তিনি তাঁর আহ্বানে হাইলাকান্দি গিয়ে তাঁর বাড়িতে বসেই রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। তিনি আবুল কালাম আজাদকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেন যাতে এই অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতারা একত্রিত হয়ে মুসলিম লিগের প্রভাব মোকাবিলা করতে পারেন।

ঐতিহাসিক ড. সুহাস চট্টোপাধ্যায় স্মরণ করেছেন যে ১৯৩৮ সালের এপ্রিল মাসে নেতাজির আগমনে শিলচর শহর ফেস্টুন ও বিজয় তোরণে সেজে উঠেছিল। তিনি উকিলপট্টির স্বাধীনতা সংগ্রামী রুক্মিণী দাসের বাড়িতে অবস্থান করেন এবং সেখানেই স্থানীয় কংগ্রেস কমিটি ও চা-বাগানের কর্মীদের উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সভা পরিচালনা করেন।

নেতাজির এই সফরগুলি শিলচরের রাজনৈতিক আবহকে নাড়িয়ে দেয় এবং স্থানীয় মানুষ আইএনএর প্রচারপত্র ও স্লোগানের মাধ্যমে স্বাধীনতার আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন। বরাক উপত্যকার মানুষ আজও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন তাঁদের ভূমিকা।

আজকের ভারত তার প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বিশ্বকূটনীতিতে অনেক এগিয়েছে, তবু নেতাজির বাণী আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর অমর আহ্বান—“তুমি আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাকে স্বাধীনতা দেব”—আজ শুধু স্বাধীনতার প্রতীক নয়, বরং ঐক্য, আত্মত্যাগ ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখার শিক্ষা। নেতাজির জীবন প্রমাণ করে যে এক ব্যক্তির অদম্য ইচ্ছাশক্তি কোটি কোটি মানুষের চেতনায় আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। বর্তমান প্রজন্ম যখন বিভাজন ও সংকটে পড়ে, তখন তাঁর আদর্শ জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে শেখায়।

শিলচরে তাঁর পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপন তাই নিছক সৌন্দর্যায়নের কাজ নয়। এটি ইতিহাসের ধারাবাহিকতা সংরক্ষণের প্রয়াস, উত্তর–পূর্ব ভারতের সংগ্রামী ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা এবং নতুন প্রজন্মকে সাহসিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার এক প্রতীক।

 রাঙিরখাড়ি চত্বরে নেতাজির পূর্ণাবয়ব মূর্তি উন্মোচন যেন উচ্চারণ করছে—এই জাতি নেতাজিকে ভোলেনি, আর কোনো দিন ভুলবেও না। তাঁর আদর্শ যুগ থেকে যুগে আলো ছড়িয়ে যাবে, উত্তর–পূর্ব ভারতের সংগ্রামী ঐতিহ্যকে যুক্ত করবে জাতীয় ইতিহাসের ধারায়, আর স্বাধীনতার শপথকে অমর করে তুলবে।

জয় হিন্দ। জয় ভারত।

(ড. মনোজ কুমার পাল উইমেন্স কলেজ, শিলচরের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ)

 

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker