Barak UpdatesHappeningsBreaking News
চলে গেলেন জন্মজিৎ স্যার: অন্ধকার প্রগাঢ় হল, লিখেছেন দীপক সেনগুপ্ত

//দীপক সেনগুপ্ত//
দৃশ্য জগৎ থেকে বিলীন হয়ে গেলেন কবি অধ্যাপক এবং ভাষাতাত্ত্বিক জন্মজিৎ রায়। এখন তিনি অন্তর্লোক নিবাসী হয়ে আমাদের স্মৃতিপটে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল মুখাবয়বে অনন্তকাল প্রতিভাস হয়ে থাকবেন। কালবেলার আবছায়ায় ঢেকে যাওয়া বরাক উপত্যকার এক একটি প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। ইমাদউদ্দিন বুলবুল গেলেন, জন্মজিৎ রায়ও চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কিন্তু অবয়বহীন তাঁরা বারবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবেন যে কোনও সভা সমিতিতে, প্রতিবাদী মিছিলে প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে। বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের মূল দর্শন তাঁদের যাপিত জীবনের প্রতিটি পরিসরে অনুরণিত হত। জন্মজিৎ স্যার বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের করিমগঞ্জ ( বর্তমান শ্রীভূমি) জেলার সভাপতি ছিলেন । কেন্দ্রীয় সভাপতির যোগ্য দাবিদার হিসাবে যার নাম সব মহলেই যখন উচ্চারিত হওয়া শুরু হল ঠিক তখনই ব্যাধি এসে শরীরে বাসা বাঁধলো। গত বছর করিমগঞ্জ জেলায় যে দ্বিবার্ষিক কেন্দ্রীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে তাঁকে ‘প্রেমেন্দ্র মোহন গোস্বামী ভাষা অকাদেমি’ পুরস্কারে সম্মানিত করা হল। অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা, মুখের হাসিতে সবাইকে কাছে নিতে পারতেন। কোনও বিরুদ্ধ মত ব্যক্ত করার ক্ষেত্রেও মুখের হাসি যার ছিল শানিত যুক্তির দোসর। বাংলার তৃতীয় ভুবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাতাত্ত্বিক হিসাবে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন নিজের আন্তরিক সাধনায় ও দায়বদ্ধতায়। ভাষিক আগ্রাসনের কূটচক্রান্তের বিরুদ্ধে সদাজাগ্রত প্রহরী তিনি প্রয়াত সুজিত চৌধুরীর যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে বিবেচিত হতেন । তৎসম শব্দের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসায় তাঁর লেখায় খুঁজে পাওয়া যেত বনেদি ঐতিহ্য । চলার পথে বাংলা ভাষা তদ্ভব বা অপিনিত শব্দকে গ্রহণ করে যখন নিজেকে হাল্কা করে নিয়েছিল তখনও তিনি সাবেকি ঘরানায় ঐতিহ্যের বুনিয়াদকে অটুট রাখার আন্তরিক প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। শমিক বন্দোপাধ্যায়, বারিদ বরণ ভট্টাচার্য, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মত প্রতিথযশা ব্যক্তিদের জন্য বরাক বঙ্গের পক্ষে তিনিই মানপত্র লিখতেন । সিলেটি উপভাষাকে স্বতন্ত্র ভাষা বলে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। বাংলা বানানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন বিশুদ্ধচারী। হাতের লেখার মধ্যে তাঁর শৈল্পিক সত্তা প্রকাশ পেত। তাঁর চলে যাওয়াতে তৈরি হওয়া শূন্যতা সহজে ভরাট হবে না। তবুও এই শূন্যতাকে মেনে নিতেই হবে। মাথার উপর থেকে একে একে ছাতাগুলো সরে যাচ্ছে, ভাষিক আগ্রাসনের তীব্র দহন কীভাবে সহ্য করব এই দুশ্চিন্তাই ভাবাচ্ছে।



