Barak UpdatesHappeningsBreaking News

কেম্প্রাইর “দুঃখপ্রকাশে’ অনুতাপের লেশমাত্র নেই, ক্ষুব্ধ জনতার স্মারকলিপি এসএসপিকে

ওয়েটুবরাক, ৩১ অক্টোবরঃ ডিমাসা রাইটার্স ফোরামের সভাপতি মুক্তেশ্বর কেম্প্রাই তাঁর মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করলেন বটে, কিন্তু নিজের অবস্থান থেকে সরতে রাজি হলেন না। শুক্রবার সকালে সকলকে সুপ্রভাত জানিয়ে তিনি ফেসবুকে পোস্ট করেন, “আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, এই বিষয়ে আমার একটা ভুল ধারণা ছিল। তাই বরাক উপত্যকার সকল বাসিন্দাদের কাছে আমি এই তথ্য জানাচ্ছি যে, সকল বাঙালিরা বহিরাগত নন।”

কিন্তু এমন দুঃখপ্রকাশ মেনে নিতে নারাজ এই অঞ্চলের ভাষাপ্রেমী জনতা। সমাজ মাধ্যমে প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন উঠে আসে, দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমাপ্রার্থনা দুই পক্ষের মধ্যে হতে পারে। কিন্তু পুলিশের কাছে যে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে, এর কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে? এ ছাড়া, যে সব শব্দ প্রয়োগে ভাষাশহিদদের অপমানিত করা হয়েছিল, কেম্প্রাইর দুঃখপ্রকাশে সেই ভাষাশহিদদের কথার কোনও উল্লেখ নেই। দ্বিতীয়ত, সব বাঙালি বহিরাগত নন বলে তিনি বাঙালিদের বহিরাগত বলেই আরও একবার নিজের অবস্থান জানালেন।

বিকেলে এরই প্রতিবাদে সিনিয়র পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আন্দোলনকারী বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ। তাঁর হাতে স্মারকলিপি তুলে দিয়ে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুক্তেশ্বর কেম্প্রাইয়ের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এফআইআর-এর ভিত্তিতে অতি দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসএসপি তাঁদের জানান, “প্রশাসনিক চাপে মুক্তেশ্বর কেম্প্রাই প্রথম পোস্টটি দিয়েছিলেন, পরে তা মুছে দিলে আবার চাপে পড়ে দ্বিতীয়বার একই পোস্ট করেছেন।”

প্রতিনিধিরা তখন তাঁকে স্পষ্ট বলেন, এই ধরনের দুঃখপ্রকাশ আমরা বরাক উপত্যকার নাগরিক সমাজ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। বরাক উপত্যকার মানুষ ভাষা শহিদদের প্রতি অবমাননা কোনও অবস্থাতেই সহ্য করবে না। ভাষা শহিদদের অপমানের জন্য মুক্তেশ্বর কেম্প্রাই যেন নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চান।এসএসপি পার্থপ্রতিম দাস আশ্বাস দিয়েছেন, কেম্প্রাই যদি ক্ষমা না চান, তবে দায়েরকৃত এফআইআর-এর ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরে “অমর উনিশ”-কে নিয়ে মুক্তেশ্বর কেম্প্রাইয়ের নিন্দনীয় মন্তব্যের প্রতিবাদে জনমত গঠন সভার সভাপতি সুব্রত ভট্টাচার্য এক প্রেসবার্তায় জানান, সম্প্রতি “ডিমাসা রাইটার্স ফোরাম”-এর সভাপতি মুক্তেশ্বর কেম্প্রাই অসম সাহিত্য সভার সভাপতির উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে ১৯৬১ সালের ১৯শে মে-র ভাষা শহিদদের “বাংলাদেশি” ও “বহিরাগত” বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এই বিভেদমূলক ও ইতিহাস বিকৃতিমূলক মন্তব্য বরাক উপত্যকার মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও বেদনার সৃষ্টি করেছে। এটি শুধু ভাষা শহিদদের অপমান নয়, বরং বরাক উপত্যকার সম্প্রীতি ও ঐক্যের উপর এক গুরুতর আঘাত।গত কয়েক দিনের মধ্যে বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর দায়ের হয়েছে এবং কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছে।

এই প্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে গত ২৯ অক্টোবর এক জনমত গঠন সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বরাক উপত্যকার প্রায় ৫০টিরও বেশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নাট্য ও ক্রীড়া সংগঠন এবং বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এরপর ৩০ অক্টোবর সিনিয়র পুলিশ সুপারের আমন্ত্রণে সুব্রত ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এসএসপি আশ্বাস দেন যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর আজ সকালে মুক্তেশ্বর কেম্প্রাইর সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়সারা দুঃখপ্রকাশ। বিকেলেই তাঁরা গিয়ে এসএসপির সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি তুলে দেন। সুব্রত ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে এ দিনের এই কর্মসূচিতে অংশ নেন আশিস ভৌমিক, ডা. রাজীব কর, নীহাররঞ্জন পাল, নিখিল পাল, সীমান্ত ভট্টাচার্য ও সৌমিত্র দত্তরায়।

এ দিকে, আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন, “একটি প্রকৃত ক্ষমাপ্রার্থনা হতে হলে তা স্পষ্ট, নির্দিষ্ট এবং নিঃশর্ত হতে হয়, যেখানে নিজের ভুল কাজ বা বক্তব্যটি খোলাখুলিভাবে স্বীকার করতে হয়।” তাঁর কথায়, শুধু “ভুল ধারণা” বললেই দায় এড়ানো যায় না, কারণ এতে প্রকৃত ভুলের স্বীকৃতি বা আন্তরিক অনুতাপের প্রকাশ থাকে না। এছাড়া, যখন সেই তথাকথিত ক্ষমাপ্রার্থনার পোস্ট কিছু সময় পর মুছে ফেলা হয়, তখন তা ক্ষমাপ্রার্থীর আন্তরিকতা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। ধর্মানন্দ বলেন, “এমন আচরণ প্রকৃত অনুশোচনার প্রকাশ নয়, বরং সাময়িক আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা বলে মনে হয়, যার ফলে সেই ক্ষমাপ্রার্থনা তার নৈতিক মূল্য সম্পূর্ণ হারায়। আমি মনে করি, পুলিশ এ পর্যন্ত তাঁকে জামিন-অযোগ্য ধারায় গ্রেফতার না করে অযথা প্রশ্রয় দিচ্ছে। এমন অপরাধমূলক মন্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের বিভেদ সৃষ্টিকারী বক্তব্য দিতে সাহস না পায়।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker