Barak UpdatesAnalytics
শিলচর আসনে বাগানভোটই নির্ণায়ক এ বারTea Garden votes to decide the fate of Silchar seat
১৬ এপ্রিলঃ দল বেঁধে পাতা তুলছিলেন মহিলা শ্রমিকরা। পুরুষদেরও দেখা যাচ্ছিল ফাঁকে ফাঁকে। কাজের মাঝেই জবাব দিচ্ছিলেন তাঁরা। কখনও মুখ তুলে, কখনও না তুলে।
টুসুগান জানেন ? ‘সে তো মুখস্থ।’ করমপূজায় কী কী লাগে ? গড়গড়িয়ে বলতে লাগলেন সবাই। প্রধানমন্ত্রীর নাম? এ বার আটকে গেলেন আরকাটিপুর বাগানের প্রতিমা ভূমিজ, দশরথ বাগতি-রা। মুখ্যমন্ত্রী কে, এই প্রশ্নেও হা করে তাকিয়ে রইলেন। পাতা তুলতে তুলতেই পরে বললেন, ‘ও সবে হামাদের কী কাম বাবু!’
সকাল হলেই পাতা তোলার জন্য বেরিয়ে পড়া, আর বিকেল গড়ালে ঘরে ফেরা। সন্ধ্যা নামতেই নারী-পুরুষ মিলে হাড়িয়ায় টান। এর ফাঁকে রান্নাখাওয়া। শেষে সকালের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়া। এই তাদের দিনলিপি, বলা যায় জীবনলিপি।
এগিয়ে যাই সামনের দিকে। সেই একই অভিজ্ঞতা। দিলখুশ বাগানের সনাতন কালিন্দী, চণ্ডী মাল-রাও প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর নাম বলতে পারলেন না। তবে নরেন্দ্র মোদীকে তাঁরা চেনেন। কিন্তু এই ভোটেই যে মোদীর থাকা, না থাকা চূড়ান্ত হবে, জানেন না। সুস্মিতা দেবের নাম শুনেছেন। বলতে পারলেন না, তিনিই যে কংগ্রেস প্রার্থী। এটা লোকসভার ভোট বা বিধানসভার, উত্তর পাইনি শিলচর আসনের পাঁচ-ছয় বাগান ঘুরেও। তবে এরই মধ্যে তাঁরা জেনে গিয়েছেন, ১৮ তারিখ ভোট হবে। বাগানে ছুটি থাকবে। স্কুলের সামনে মেলা বসবে। কাকে ভোট দেবেন? স-লাজ জবাব মেলে, ‘সে এখনও আমরা জানি না বাবু।’
কাকে ভোট দেওয়া, চা বাগানে স্থির হয় নির্বাচনের আগের রাতে। এই ছবি মোটামুটি সব জেলার বাগানেই এক। তবু শিলচর আসনের বাগান ভোটাররা নিজেদের অজান্তেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন এ বার। এনআরসিতে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ভুগলেও নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল মেরুকরণটা পোক্তভাবেই করে দিয়েছে। হিন্দুদের অধিকাংশ বিজেপির পক্ষে, আর মুসলমানরা বিজেপি-কে ঠেকাতে কংগ্রেসকে জেতাতে চায়।
এই মেরুকরণে যাদের কিছু যায়-আসে না, তাঁরা হলেন চা শ্রমিক গোষ্ঠী। শিলচর আসনের ১১ লক্ষ ৯৩ হাজার ভোটার থেকে তাঁদের বাদ দিলে হিন্দু-মুসলমান সমানই বলা চলে। তাঁরা আবার ধর্মে হিন্দু হলেও উদ্বাস্তু বাঙালির নাগরিকত্ব নিয়ে অতশত ভাবেন না। এনআরসি-র নথি প্রমাণে নিজেদের ছাড় মিলেছে, এতেই খুশি। মনেপ্রাণে পূজা-পার্বণ করলেও অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ হবে কিনা, সে খোঁজ রাখেন না। তাই আডবাণীর রথযাত্রা বা প্রবল মোদি-হাওয়ার সময়েও শিলচরের বাগানভোট কংগ্রেসের বাক্সে গিয়েছে। সন্তোষমোহন দেব যতবার দাঁড়িয়েছিলেন, হারলেন কি জিতলেন, বাগানভোটে ফারাক পড়েনি। ২০১৪ সালে সুস্মিতা দেবকেও তাঁরা উজাড় করে ভোট দিয়েছিলেন।
এর পরই পরিস্থিতিটা বদলাতে শুরু করে। গত বিধানসভা নির্বাচনে বাগাননির্ভর উধারবন্দ আসনে কংগ্রেস হেরে যায়। লক্ষ্মীপুরে জিতলেও ব্যবধান কমে আসে। কয়েক মাস আগের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বাগানগুলিতে একেবারে ধস নামে তাদের। সুস্মিতা দেবের কথায়, পঞ্চায়েতের সঙ্গে লোকসভা নির্বাচনের ফারাক রয়েছে। কেরলে ন্যূনতম মজুরি ৩১০ টাকা, কর্নাটকে ২৬৩ টাকা। অসমে এখনও ১৬০ টাকা। তাও বরাক-ব্রহ্মপুত্রে মজুরি বৈষম্য মেটেনি। ফলে কাছাড়ের ৫২ বাগানের ২ লক্ষ পরিবার আজও বঞ্চিত। নেই পানীয় জলের বন্দোবস্ত, রাস্তাঘাট। এ সবের জবাব দেবেন তাঁরা, এমনই দাবি সন্তোষ-তনয়ার।
সুস্মিতা দেবের কথা জেনে হাসলেন বিজেপি প্রার্থী রাজদীপ রায়। ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে তাঁদের দুজনের মধ্যেই লড়াই হয়েছিল। সে বার সুস্মিতা তাঁকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। এ বার এরই বদলা নিতে চাইছেন অস্থি বিশেষজ্ঞ রাজদীপ। বললেন, সমস্যার কথা কংগ্রেস যত বলবে, বিজেপির তত লাভ। কারণ কোনও সমস্যাই এই ৫ বছরে সৃষ্টি হয়নি। সেগুলি তাদেরই তৈরি। পুরপ্রধান, বিধায়ক, সাংসদ থেকেও সুস্মিতা দেব কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারেননি। চা জনগোষ্ঠী ইস্যুতে তাঁর প্রশ্ন, এত বছরেও কেন বরাক-ব্রহ্মপু্ত্র মজুরি বৈষম্য দূর হল না? বরং বিজেপি আমলে সমস্ত চা শ্রমিক পরিবারকে বিনামূল্যে চাল দেওয়া হচ্ছে। বাগান সর্দারদের অ্যানড্রয়েড মোবাইল সেট দেওয়া হয়েছে, দাবি করেন বিজেপি প্রার্থী।
সরকারের দেওয়া মোবাইল সেট হাতেই বসেছিলেন ডার্বি-র এক বাগান সর্দার। ভোটের কথা বলতেই গম্ভীর গলায় শোনালেন, দিনদিনই আমাদের দায়িত্ব বাড়ছে। আগে যে বাগানে যার প্রভাব বেশি, সেই দলের মানুষ গিয়ে শ্রমিকদের চিহ্ন চিনিয়ে দিতেন। এখন খুব কড়াকড়ি। ভোটের আগের রাতে দলের মানুষের বাগানে ঢোকা বারণ। তাই এই কাজটা এখন বাগান সর্দারদেরই করতে হচ্ছে।