Barak UpdatesHappeningsBreaking News
উইমেনস কলেজে শারদোৎসব উদযাপন, বাংলা বিভাগের গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ
ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালার

ওয়েটুবরাক, ১৪ অক্টোবর: ভারতীয় ঐতিহ্য, নারীশক্তির মহিমা এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের বার্তা নিয়ে সোমবার শিলচরের উইমেন্স কলেজে উদ্যাপিত হল শারদোৎসব। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি কলেজের বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় আইএসবিএন-যুক্ত গবেষণাগ্রন্থ ‘প্রবহমান চেতনা: ঐতিহ্য ও আধুনিকতা’ প্রকাশ অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ভক্তিগীতি এবং ‘আইলো উমা বাড়িতে’ শীর্ষক নাট্যলেখ্য পরিবেশনা উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অতিথিদের প্রশংসা অর্জন করে।
সম্মানিত অতিথি উধারবন্দের বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা শারদোৎসব উপলক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন এবং কলেজের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জাতীয় পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত মূল্যবোধ ও জীবনবোধকে নবপ্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার কেবল অতীতের স্মারক নয়, বরং তা একটি জাতির আত্মপরিচয় ও সামাজিক চেতনার ধারক। তাই ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সাহিত্যচর্চা ও গবেষণামূলক প্রকাশনাকে একই মঞ্চে নিয়ে আসার জন্য তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষ, অধ্যক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষিকা, আয়োজক এবং শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান। তাঁর বক্তব্যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রজন্মান্তরে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে কলেজের অধ্যক্ষ ড. সুজিত তিওয়ারি পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনা এবং নবরাত্রিতে দেবী চন্দ্রঘণ্টার আরাধনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে নারীশক্তি, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। ভারতীয় সভ্যতাকে যথাযথভাবে অনুধাবনের জন্য ঐতিহাসিক গবেষণা, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও যুক্তিবাদী চিন্তার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের পাশাপাশি যুক্তি ও প্রমাণের নিরিখে তা বিচার করাও জরুরি।
কলেজের উপাধ্যক্ষ ড. শান্তনু দাস শরৎকালের প্রকৃতি ও উৎসবের পরিবেশগত তাৎপর্য তুলে ধরেন। শৈশবে মধুপুরে শরতের সকালে শিউলি ফুল কুড়ানোর স্মৃতিচারণ করে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে ঋতুচক্র এবং প্রকৃতির পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দুর্গাপূজার মতো উৎসব ধর্মীয় পরিসর অতিক্রম করে সামাজিক সংহতি, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সম্মিলিত অংশগ্রহণের ক্ষেত্র তৈরি করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কলেজের আইকিউএসি সমন্বয়ক ড. সরিতা ভট্টাচার্য শারদোৎসবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য তুলে ধরে সকলকে উৎসবের শুভেচ্ছা জানান।
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল বাংলা বিভাগের “প্রবহমান চেতনা: ঐতিহ্য ও আধুনিকতা”-র প্রকাশ। গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. সর্বাণী বিশ্বাস এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. সুষ্পিতা দাস। সময়, সমাজ, সাহিত্য, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার পারস্পরিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সংকলিত গ্রন্থটিতে ১৫টি গবেষণামূলক প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, সাহিত্য, ঐতিহ্যবাহী নাট্যচর্চা, ধ্রুপদি পাঠ এবং দেশভাগের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মতো বিবিধ বিষয় এতে আলোচিত হয়েছে।
ড. সর্বাণী বিশ্বাস তাঁর বক্তব্যে মানবচিন্তার বিবর্তন এবং সমকালীন সমাজে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক চেতনা ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের প্রভাব ব্যাখ্যা করেন। পরিবর্তিত সময় ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ঐতিহ্যকে পুনর্বিবেচনা এবং নতুনভাবে আবিষ্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, গ্রন্থের গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলি পাঠকদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে।
ড. সুষ্পিতা দাস গ্রন্থটির বিষয়বস্তু ও প্রকাশনার প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁর কথায়, মানুষের চেতনা একটি বিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। ঐতিহ্যকে তিনি গাছের শিকড়ের সঙ্গে তুলনা করেন, যা গাছকে ভিত্তি ও স্থিতি দেয়, আবার নতুন শাখা-প্রশাখার বিকাশেরও সুযোগ করে দেয়।


