Barak UpdatesHappeningsBreaking News

পিতৃপরিচয় নয়, এবার নিজের কাজে ডেকে টিকিট কণাদকে

ওয়েটুবরাক, ১৬ জুনঃ গত কয়েক দশকে বরাক উপত্যকায় বাঘা বাঘা যে সব নেতা রাজনীতি করেছেন, তাঁদের অধিকাংশকে নির্বাচনে পরাজয় বরণ করে পরিষদীয় বা সংসদীয় রাজনীতির জীবন থেকে অবসর নিতে হয়েছে। কেউ হেরে গিয়ে রাজনীতি থেকেই সন্ন্যাস নিয়েছেন, কেউ কেউ আমৃত্যু রাজনীতিতে ছিলেন বা আছেন বটে, কিন্তু পরাজয়ের দরুন শেষ দিনগুলিতে আর আগের মতো শ্রদ্ধা-সম্মান পাননি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ সন্তোষমোহন দেব ও গৌতম রায়। বীথিকা দেবকে দিলীপকুমার পালের সঙ্গে লড়ে পরাস্ত হওয়ার পর রাজনীতির ধারেকাছে দেখা যায়নি। ভোটে হেরে বিদায় নেওয়াদের পংক্তিতে আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যায়। তাঁরা হলেন রসিদা হক চৌধুরী, নীহাররঞ্জন লস্কর, সুখেন্দুশেখর দত্ত, বিমলাংশু রায়, কমলেন্দু ভট্টাচার্য, বদ্রীনারায়ণ সিং প্রমুখ। ব্যতিক্রমও কম নন। যেমন দীনেশপ্রসাদ গোয়ালা, শহিদুল আলম চৌধুরী, জগন্নাথ সিংয়ের মতো কয়েকজন, যাঁরা পদে থাকা অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন। আবার আর এক শ্রেণির নেতা রয়েছেন, যাঁরা এক কি দুইবার, সেই কোনকালে বিধায়ক হয়েছিলেন, কিন্তু আমৃত্যু দলের কাছে, জনগণের কাছে সম্মান পেয়ে গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নিশীথরঞ্জন দাস, দীপক ভট্টাচার্য, গৌরীশংকর রায়, আলতাফ হোসেন মজুমদার।

উল্লিখিত কোনও শ্রেণিতে সীমিত করা যায় না যাঁকে, তিনি হলেন কবীন্দ্র পুরকায়স্থ। প্রথমবারের টিকিটের জন্য ধরাধরির প্রশ্নই ওঠে না, দলের নির্দেশে স্কুলের অধ্যক্ষের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন। বিধানসভা-লোকসভায় বহুবার দাঁড়িয়েছেন, তিন বার জিতেছেন, কেন্দ্রে মন্ত্রী হয়েছেন। পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তাঁরও নির্বাচনী রাজনীতির অবসান ঘটেছে। কিন্তু দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে একা বসে থাকতে হয়নি, তাঁকে দেখে দলের নেতা-কর্মীদের পালিয়ে বেড়ানোর মত ঘটনা ঘটেনি। বরং নবতিপর হয়েও তাঁর রাজনৈতিক জীবনে উল্টোটাই ঘটছে। দলের নেতাদের মধ্যে যিনিই মুখ্যমন্ত্রী হোন না কেন, বরাক সফরে এলে তাঁর আশীর্বাদ পেতে তাঁকে নতুনপট্টির বাড়িতে ছুটে যেতে হয়। স্থানীয় নেতাদের কারও কোনও পদপ্রাপ্তি ঘটলে মন্দিরে গিয়ে পূজা দেওয়ার আগে কি পরে, তাঁর পায়ের কাছে কিছু সময় বসেই যেতে হয়। এ কোনও বাধ্যবাধকতা নয়, না করলে দৃষ্টিকটু হবে, এমনটাও নয়। তবু আত্মতৃপ্তির জন্য, নিজের মনের সন্তুষ্টির জন্যই তাঁর কাছে অন্তত একটিবার যান সবাই।

এই জায়গাটি কবীন্দ্র পুরকায়স্থের কাছে মোটেও ঈশ্বরপ্রদত্ত নয়। কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে দলীয় কর্মীদের হৃদয়ে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। সে তুলনায় কণাদ পুরকায়স্থের রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার লড়াইকে হিসেবেই ধরা যায় না। টিকিট প্রাপ্তির পর থেকে একটা কথা বহুবার তাঁর মুখে শোনা গিয়েছে যে, বারবার টিকিট না পেয়েও চূড়ান্ত হতাশ হননি । কখনও মন খারাপ হলেও দলের নির্দেশ মেনে কাজ করে গিয়েছেন। সে জন্যেই তিনি আজ স্বীকৃতি পেয়েছেন।

কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এর ব্যাখ্যা ভিন্ন। আসলে দুইবার লোকসভা নির্বাচনে এবং দুইবার বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর নাম নিয়ে চর্চা হয়েছে। প্রতি বারই তাঁর প্রথম যোগ্যতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, তিনি কবীন্দ্র পুরকায়স্থের পুত্র। ওই যোগ্যতার দাবিটুকুই আসলে ছিল তাঁর প্রধান অযোগ্যতা। দলের জন্য তাঁর দিনরাতের খাটাখাটুনিকে নিজেই যেন গুরুত্বহীন করে রেখেছিলেন। কিন্তু এ বার রাজ্যসভার প্রার্থিত্বের জন্য সেই পরিচয়কে সামনে রেখে আবেদন-নিবেদন হয়নি বলেই দলের নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে কণাদ সাবালকত্বের সাক্ষর রাখতে পেরেছেন। এর ফলেই কবীন্দ্র পুরকায়স্থের পুত্রকে নয়, দলের একনিষ্ঠ কর্মী কণাদ পুরকায়স্থকে ডেকে টিকিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তাও এমন টিকিট যে, একেবারে ছয় বছরের জন্য, এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ভোটাভুটি হলেও সেখানে হারানো ছিল একেবারে অসম্ভব। কোনও অর্থব্যয় নেই, প্রচারে গলদঘর্ম হওয়ার ব্যাপার নেই।

কিন্তু এখন কণাদের সামনে মূল লড়াই। জায়গা ধরে রাখার লড়াই। শুধু নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে নয়, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার লড়াই। বরাক উপত্যকার রাজনীতিতে একসময়ের উজ্জ্বল তারকারা কেন আজ একেবারে হারিয়ে গেলেন, তা সাংসদ হিসেবে শপথ গ্রহণের দিন থেকেই ভাবতে হবে তাঁকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker