Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story
৪৭-এ সবাই চলে এলেও বৃত্তি পরীক্ষা না দিয়ে দেশ ছাড়লেন না কবীন্দ্র পুরকায়স্থ, লিখেছেন কান্তি পুরকায়স্থ

//কান্তি পুরকায়স্থ //
গত দুই বছরে আমরা একে একে চার ভাইকে হারিয়েছি। দাদা কিরীটভূষণ প্রয়াত হয়েছেন ২০২৩-র ডিসেম্বরে, কুমুদবন্ধু (ওরফে বাদল) পুরকায়স্থ এর ঠিক এক বছরের মাথায়, কল্যাণ পুরকায়স্থ (ওরফে বিশু)-র মৃত্যু হয় গত বছরের এপ্রিলে, আর এ বার ৭ জানুয়ারি আক্ষরিক অর্থেই অভিভাবকহারা হলাম, প্রয়াত হলেন কবীন্দ্র পুরকায়স্থ, আমাদের সকলের প্রিয় ধনদা।
ঠাকুরদা কৈলাশ চন্দ্র পুরকায়স্থের ছিল তিন ছেলে কালীপদ, কামিনী কুমার ও কৃপাসিন্ধু। কালীপদ ও কৃপাসিন্ধু দুইজনেই মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। কামিনী কুমার অবশ্য ৮০ বছর বেঁচেছিলেন। আমার জেঠামশায় কালীপদ পুরকায়স্থ ছিলেন শিলচর আদালতের মোক্তার। তাঁর চার পুত্রের মধ্যে দ্বিতীয় হলেন কবীন্দ্র ওরফে বকুল । অন্য তিনজন যথাক্রমে কৃষ্ণচরণ, কিরীটভূষণ ও কিংশুক। এক কন্যা খেলা। কামিনী কুমারেরও চার পুত্র। কনককান্তি, কুমুদবন্ধু, কুসুমেশু ও কল্যাণ। তাঁর দুই কন্যা প্রয়াতা বেলা ও শ্রীমতী মালবিকা।
অন্যদিকে, কৃপাসিন্ধু পুরকায়স্থের একমাত্র পুত্র আমি —– কান্তি। আমার পাঁচ বোন প্রয়াতা মঞ্জুশ্রী, শ্রীমতী শেফালি, শ্রীমতী শুক্লা, শ্রীমতী লক্ষ্মী ও শ্রীমতী কৃষ্ণা। ছোটবেলা থেকেই শিখে এসেছি, আমরা নয় ভাই, আট বোন। ভাইদের মধ্যে এই সময়ে শুধু আমরা দুইজনই বেঁচে আছি। কুসুমেশু পুরকায়স্থ ও আমি।
রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ। ধনদার বাবা কালীপদ পুরকায়স্থ রাজনীতি না করলেও তাঁর কাকা কামিনী কুমার পুরকায়স্থ পূর্ব পাকিস্তানে সক্রিয় রাজনীতি করতেন। কিন্তু দেশভাগ তিনি মেনে নিতে পারেননি। ফলে ১৯৪৭ সালেই সিদ্ধান্ত নেন, পাকিস্তানে থাকবেন না। ছোটভাই কৃপাসিন্ধু আগে থেকেই উধারবন্দের নগর চা বাগানে চাকরি করতেন। সে ভরসাতেই একদিন সবাই কামারখোলা থেকে চলে আসেন উধারবন্দে।
তখন অবশ্য উধারবন্দে আমাদের বাড়ি ছিল না৷ কামারখোলা থেকে এসে বাড়িটি কেনা হয়৷ শুধু কি আর বাবা-রা এসেছিলেন! সে দেশের আত্মীয়স্বজন, চেনা-আধ চেনা কত মানুষ তখন একটু মাথা গোঁজার জন্য আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন৷ তবে ছেলেবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি অদম্য আগ্রহের জন্য ধনদা সকলের সঙ্গে দেশ ছাড়লেন না৷ দেশভাগ হয়ে গেল, সব ছেড়েছুঁড়ে চলে আসতে হল৷ কখন কোথায় কী হয়, এক অভাবনীয় পরিস্থিতি ! কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা না দিয়ে নড়লেন না তিনি৷ এখানে এসে ডিএনএইচএস-এ সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন৷ ১৯৫০ সালে ধনদা-রাই এই স্কুলের মেট্রিকের প্রথম ব্যাচ৷ ভালো ফল করেই পাশ করলেন৷ ওই সময়েই সঙ্ঘের কাজে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন৷ বসন্তজি এখানে প্রচারকের দায়িত্বে ছিলেন৷ বর্তমানে যেখানে ক্যাপিটেল ট্র্যাভেলস, সেখানেই ছোট্ট একটা ঘরে ছিল সঙ্ঘের কার্যালয়৷ আইএসসি পড়তে ধনদা নরসিং স্কুলে ভর্তি হলেন, কার্যালয়েও যেতে লাগলেন৷ আইএসসি শেষ করতেই চাকরি পেয়ে গেলেন বটে, কিন্তু না ছাড়লেন পড়াশোনা, না সঙ্ঘের কাজকর্ম৷ শিক্ষকতা করতে করতেই বিএ, এমএ, বিটি করলেন৷
১৯৬৪ সালে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হলেন ৷ আমাদের বৌদি (গায়ত্রীদেবী)-র কথা বিশেষভাবে উল্লেখ না করলে চরম অকৃতজ্ঞতা হবে৷ তিনি যখন আমাদের বাড়িতে এলেন, তখন আমি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি৷ বৌদি স্নান করিয়ে গায়ে তেল মাখিয়ে দিতেন৷ তাঁর স্নেহের আঁচলেই আমার বেড়ে ওঠা৷ ধনদারও সঙ্ঘের কাজে ছুটে বেড়ানো, বিজেপিকে প্রতিষ্ঠিত করা এ সব সম্ভব হয়েছিল বৌদির জন্য৷ ভোটে দাঁড়াতে ধনদা চাকরি ছাড়লেন বটে, কিন্তু বৌদি ঝুঁকিটা নিতে সম্মত হয়েছিলেন বলেই তাঁর ১৯৯১ সালে সাংসদ হওয়া৷ কিন্তু চাকরি তো তিনি ছেড়েছেন সেই ১৯৭৭ সালে! সে থেকেই বাইরে ধনদা পরিশ্রম করলেন একটা অপ্রতিষ্ঠিত পার্টিকে সকলের কাছে পরিচিত করানোর জন্য, ঘরে কষ্ট করলেন আমাদের বৌদি। অত্যন্ত কষ্ট করলেন৷ কিন্তু পরে সুখের দিনগুলোতে তাঁকে আর আমরা পাইনি। এর আগেই পরপারে পাড়ি দিলেন বৌদি।
আজ ধনদাকে স্মরণ করতে গিয়ে বৌদির কথাও খুব মনে পড়ছে। তোমরা আমার প্রণাম গ্রহণ করো।



