Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

রাজনীতিতে থেকেও আত্মপ্রচারে ছিলেন না কবীন্দ্র পুরকায়স্থ, লিখেছেন উত্তমকুমার সাহা

//উত্তমকুমার সাহা//

“১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি সঙ্ঘের নির্দেশে চাকরি থেকে ইস্তফা দিই। পরিবারের সবাই বলছিলেন, সরকারি স্কুলের অধ্যক্ষের চাকরি ছেড়ে দেবে! সংসার চলবে কী করে? সে সব ভাবনা দূরে সরিয়ে জনতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়ি। জিততে পারিনি বটে। কিন্তু বিজেপির জন্মলগ্ন থেকে জড়িয়ে থাকার এটা একটা যোগসূত্র।”

এক সাক্ষাৎকারে কবীন্দ্র পুরকায়স্থ নিজেই সেকথা জানিয়েছিলেন। পাঁচের দশকেই তিনি এই অঞ্চলে আরএসএসের বিশিষ্ট সংগঠক। সে সময় অটলবিহারী বাজপেয়ী শিলচরে এলে যে কয়েকজন তাঁর সফরের যাবতীয় ব্যবস্থা করতেন, কবীন্দ্রবাবু ছিলেন তাঁদের অন্যতম। সেই সুবাদেই দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

১৯৮০ সালে আরএসএসকে নিয়ে জনতা পার্টিতে বিতর্ক দেখা দিলে বাজপেয়ী-আডবাণীরা বেরিয়ে আসেন। ৫-৬ এপ্রিল ফিরোজশাহ কোটলা ময়দানে কনভেনশন ডাকা হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে কবীন্দ্র পুরকায়স্থ সেই কনভেনশনে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানেই ৬ এপ্রিল ১৯৮০ তারিখে ভারতীয় জনতা পার্টির জন্ম হয়। বাজপেয়ী কবীন্দ্রবাবুকে কাছে ডেকে বললেন, অসমে নতুন দলকে সংগঠিত করতে হবে। ওই নির্দেশেই তিনি দিল্লি থেকে শিলচরে না এসে গুয়াহাটিতে নেমে পড়েন। কিন্তু মাত্র চার মাস আগে চৌধুরী চরণ সিং সরকারের পতন ঘটে। সাধারণ নির্বাচনে ৩৫৩ সাংসদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন ইন্দিরা গান্ধী। তখন এই নতুন দলে কে আর নাম লেখান! রাজনীতিতে অত্যন্ত সজ্জন কবীন্দ্রবাবু বিভিন্ন আলোচনায় ইঙ্গিত দিয়েছেন, অসমে যারা পরবর্তী সময়ে দলের নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন, তাঁদের অনেকেই বিজেপিতে যোগদানের প্রস্তাব সেদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এককালের শিক্ষক এই মানুষটি কিন্তু সেইসব নেতাদের নাম কোনওদিন কারও কাছে প্রকাশ করেননি। স্থানে স্থানে প্রত্যাখ্যাত হয়েও ভেঙে পড়েননি। বরং যোগাযোগের পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। উত্তরপূর্বের সবকটি রাজ্যে সফর করতে থাকেন। নেতা বেরিয়ে না এলেও সব জায়গাতেই তিনি দলের কর্মী তৈরিতে সফল হন। তবে যথেষ্ট সাড়া মেলে বরাক উপত্যকাতে। শিক্ষক এবং সঙ্ঘী হিসেবে পূর্ব পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে এখানেই সংগঠন বিস্তারে বিশেষ মনোযোগ দেন। ফল পেতেও দেরি হয়নি। তাঁর কঠোর শ্রম ও অধ্যবসায়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অসম বিধানসভায় মোট নয়জন বিজেপি বিধায়ক নির্বাচিত হন। সকলেই বরাক উপত্যকার।

সে সময়কার দলীয় ইনচার্জ সুন্দর সিং ভাণ্ডারি তাঁকেও বিধানসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু দলের কথা ভেবে তিনি সে-বার বিধানসভায় দাঁড়াননি। বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচন একসঙ্গে হওয়ায় তিনি লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর যুক্তি ছিল, তিনি লোকসভায় দাঁড়ালে তাঁর সমসংখ্যক ভোট বিধানসভার প্রার্থীরাও পাবেন। ওই অঙ্কেই সে-বার বরাকের দুই লোকসভা আসন যেমন বিজেপি জেতে, তেমনি নয়জন বিধায়কও পায়। সেই থেকে দলে নেতা-কর্মীর ভিড় বাড়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও। প্রদেশ কমিটি গঠনে মুখ্য ভূমিকা নেন, কিন্তু সভাপতি হননি। তাঁর হাত ধরেই অন্যান্য প্রদেশেও বিজেপির কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়।

উত্তর পূর্ব জুড়ে তখন কবীন্দ্রবাবুর যে কী ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তা টের পাই ১৯৯৯ সালে মিজোরাম বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সফরসঙ্গী হয়ে। পদ্মনাভ আচারিয়া, (যিনি ২০১৪ থেকে পাঁচ বছর নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল ছিলেন), তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওই কয়েকদিন কবীন্দ্রবাবুর সঙ্গে থেকে তাঁর হৃদয়ের ছোঁয়া অনুভব করি। পথে খেতে নামলেন, কিন্তু হোটেলে খাওয়ার মতো কিছুই নেই। আমাদের সঙ্গে বসে শুধু রাই পাতা সেদ্ধ দিয়েই তৃপ্তি সহ খেলেন। নির্বাচনী আচরণবিধির জন্য সকলের থাকার ব্যবস্থা হয় কর্মীদের বাড়িঘরে। আমি, বিজয় কুমার ভট্টাচার্য ও হিমাংশু দে ছিলাম এক জায়গায়। তিনি রাতে খবর নিতে এলেন, আমাদের বিছানাপত্র দেওয়া হয়েছে কিনা। যতবার যেখানে খেতে বসেছেন, নিরাপত্তা রক্ষী সহ সকলের খবর নিয়েছেন।

ভি সন্মুগনথন তাঁর ‘দ্য রিমার্কেবল পলিটিক্যাল মুভমেন্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন, “কবীন্দ্র পুরকায়স্থ ছিলেন স্কুলের অধ্যক্ষ, দুই সন্তানের পিতা। কিন্তু রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প নিয়ে চাকরি ছাড়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেননি। প্রথমে ছিলেন জনসঙ্ঘের সর্বক্ষণের কর্মী। পরে বিজেপির ভিত গড়েন।”

কেশব বলিরাম হেডগাওয়ারের ওপর ডাকটিকিট প্রকাশের ঘটনার বিবরণ দিয়ে ওই বইয়ে সন্মুগনথন লিখেছেন, “অটলবিহারী বাজপেয়ী ওই ডাকটিকিট প্রকাশের জন্য একবার কংগ্রেস সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছিলেন। যোগাযোগ মন্ত্রী অর্জুন সিং তাঁর সেই প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে কবীন্দ্র পুরকায়স্থ বাজপেয়ী মন্ত্রিসভায় সেই যোগাযোগ মন্ত্রকের দায়িত্ব পেলে বাজপেয়ীর পুরনো চিঠিটি তাঁর হাতে পড়ে। তিনি তখন হেডগাওয়ারের ডাকটিকিট প্রকাশের উদ্যোগ নেন এবং প্রথমদিনেই ৩৩ লক্ষ ডাকটিকিট বিক্রি হয়। এর আগে কখনও প্রকাশের দিনে এত ডাকটিকিট বিক্রি হয়নি।”

রাজনীতি করলেও কবীন্দ্রবাবু কতটা আত্মপ্রচারবিমুখ ছিলেন, সাফল্যের এই পরিসংখ্যানই এর বড় প্রমাণ। তাঁর এমন রেকর্ড ডাকটিকিট বিক্রির কথা তিনি মোটেও ঢাকঢোল পিটিয়ে কোথাও বলেননি, যা বলেছেন সন্মুগনথন তাঁর বইয়ে।

যশোবন্ত সিনহা তাঁর আত্মজীবনী ‘রিলেন্টলেস’-এ কবীন্দ্র পুরকায়স্থের আরেকদিকের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “যেদিন হাওলা কেলেঙ্কারির চার্জশিটে সিবিআই আমাকে ও আডবাণীকে অভিযুক্ত করে, সেদিন আমি ছিলাম শিলচরে। সন্ধ্যার পর সে খবর জানতে পাই। এও জানি, বিরোধী দলনেতা পদে আডবাণী ইস্তফা দিয়েছেন। লোকসভার সদস্যপদও ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু দল আমাকে এমন কিছু না করতে নির্দেশ দিয়েছে। সে রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি। ভাবছিলাম, আমার পরিবার-বন্ধুবান্ধবদের সামনে মুখ দেখাব কী করে। শিলচর সার্কিট হাউসে সেই রাতে আত্মহত্যার কথাও ভেবে নিয়েছিলাম। সেই অসহ্য মুহূর্তগুলোতে কবীন্দ্রবাবু আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পরদিনই ফিরে আসব, ভেবেছিলাম। কিন্তু বিমান বাতিল হওয়ায় তা সম্ভব হলো না। কবীন্দ্রবাবুকে বললাম, আমার পূর্বনির্ধারিত সভাগুলো বাতিল করে দিতে। কিন্তু তিনি অনেকটা জোর করে আমাকে সভাসমিতিতে নিয়ে গেলেন। তাঁর কথামতোই দেখতে পেলাম, কারও চোখেমুখে আমার প্রতি সন্দেহ, ঘৃণা বা অবিশ্বাস নেই। পরদিন প্রাণ নিয়ে ফিরে আসি দিল্লিতে, এর পূর্ণ কৃতিত্ব কবীন্দ্র পুরকায়স্থের।”

এমন কত পত্রপত্রিকা, কত গ্রন্থে যে কবীন্দ্রবাবুর শ্রম, নেতৃত্ব, অভিভাবকত্বের কত কাহিনি ছড়িয়ে রয়েছে, তিনি নিজে সে সবের ইয়ত্তা করেননি, আমরাও খুঁজে দেখার তেমন চেষ্টা করিনি।

আজ তাঁর প্রয়াণে তাঁকে নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে কত তথ্য যে সামনে এলো!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker