India & World UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story
বিজেপির নবীন বাছাই: রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ওয়েটুবরাক, ২২ ডিসেম্বর: বিজেপির কার্যনির্বাহী সভাপতি পদে নীতিন নবীনের নিযুক্তিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তো বটেই, বিজেপির শীর্ষ নেতাদেরও অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। ৪৫ বছর বয়সী এই বিহারি নেতা দিল্লির ক্ষমতা কেন্দ্রে, বলতে গেলে, একেবারে অপরিচিত ৷ এমনকী গত ১৫ ডিসেম্বর জেপি নাড্ডা এবং অমিত শাহ যখন তাঁকে স্বাগত জানিয়ে মঞ্চে নিয়ে গেলেন, জাতীয় রাজনীতিতে তখনই তাঁর প্রবেশ ঘটে৷ কার্যনির্বাহী সভাপতি হিসেবে আপাতত মনোনীত হলেও তিনিই যে কিছুদিনের মধ্যে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হতে চলেছেন, তা রাজনীতির অ-আ জানা সকলেই বুঝতে পারছেন৷ সে ক্ষেত্রে নবীনই হবেন বিজেপির সর্বকনিষ্ঠ সর্বভারতীয় সভাপতি৷ এ পর্যন্ত এই অভিধার অধিকারী নীতীন গাডকারি৷ তিনি যখন ওই পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৫২ বছর৷
পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী বা পিছিয়ে পড়াদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব তুলে আনার প্রয়াস বেশ কিছুদিন ধরে বিজেপিতে পরিলক্ষিত হচ্ছিল। নবীনের ক্ষেত্রে তাও কার্যকর হয়নি ৷ তিনি বিহারের কায়স্থ সম্প্রদায় ভুক্ত৷
গত ১৫ ডিসেম্বর পটনা থেকে নবীন যখন দেশের রাজধানীতে উড়ে এলেন, বিজেপির সদর দফতরে তাঁকে বরণের জন্য সকলে প্রস্তুত, তখন তাঁকে দলের শীর্ষ নেতাদের সামনে বেশ আড়ষ্ট দেখাচ্ছিল৷ তিনি প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায়েরই চেষ্টা করছিলেন৷ বিশাল মালা পরানো হয়েছিল, অনেকে তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে চাইছিলেন, তখনও তার কাছে মুহূর্তগুলো যেন অবিশ্বাস্য ঠেকছিল ৷
তবে এটা স্পষ্ট, নীতিন নবীনের মনোনয়নের মধ্য দিয়ে নাড্ডার উত্তরসূরি খোঁজার যে প্রয়াস চালিয়েছিলেন মোদি-শাহ, এর অবসান ঘটল৷ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সভাপতি পদে নাড্ডার মেয়াদ ফুরিয়ে যায়৷ সে থেকে এক্সটেনশনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি৷ তাঁর পছন্দসই উত্তরসূরি খুঁজে না পাওয়ার প্রধান কারণ অবশ্য মোদি-শাহের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নীরব সংঘাত ৷ ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে ওই সংঘাত অনেকটাই প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসে৷ খোদ নাড্ডা আরএসএসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন৷ সে নির্বাচনে ৪০০-র লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করে বিজেপিকে ২৪০ আসনে সন্তুষ্ট থাকতে হয়৷ পরে ক্ষমতা হারানোর আতঙ্ক-আশঙ্কায় বিজেপি নেতৃত্বকে আরএসএসের উপস্থিতি মেনে নিতে হয়, বিকল্প না পেয়ে হিন্দুত্বের প্রকল্প ধরেই এগোন তাঁরা৷ পরে সংঘের হাত ধরেই বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনী বৈতরণী পার হন মোদি-শাহ৷
গত কয়েক মাস ধরেই নতুন বিজেপি সভাপতির নাম নিয়ে দলের অভ্যন্তরে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল৷ বহু নাম নেতাদের মুখে মুখে ঘুরছিল। অনেকে অনুমান করছিলেন, এবার বিজেপির সভাপতি হবেন দক্ষিণ ভারতীয়৷ কারণ ওই অঞ্চলে দল তার ভিত শক্ত করতে চাইছে৷ আবার অনেকে অনুমান করছিলেন পরবর্তী সভাপতি হবেন কোনও মহিলা নেত্রী৷ কারণ নির্বাচনী সংস্কারের মধ্য দিয়ে মহিলাদের গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলা হয়েছে ৷
তবে মুখ্যমন্ত্রী বা প্রদেশ সভাপতি মনোনয়নেও মোদি-শাহ স্বল্প পরিচিতদেরই তুলে আনেন, তা ইদানিংকালের নানা সিদ্ধান্তে ধরা পড়ে। ছত্তিশগড় এবং রাজস্থানে মুখ্যমন্ত্রী বাছাইয়েও একই তত্ত্ব কাজ করে৷
জাতীয় রাজনীতিতে অচেনা মুখ হলেও বিহারে নবীন দলের কাছে অনেকটাই ভরসাযোগ্য ৷ কারণ সাতবারের বিধায়ক নবীন কিশোর প্রসাদ সিংহের পুত্র তিনি৷ পিতার মৃত্যুর পরে তাঁরই পশ্চিম পটনা আসনের উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২০০৬ সালে প্রথমবার বিধায়ক হন ৷ ডিলিমিটেশনের দরুন পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তিনি বাঁকেপুর বিধানসভা আসনে লড়েন৷ ২০১০, ২০১৫, ২০২০ এবং ২০২৫ সালে ওই আসনে বিজয়ী হন৷ নীতীশ কুমারের নতুন মন্ত্রিসভায় সড়ক নির্মাণ, গ্রাম উন্নয়ন, আবাসন এবং আইন ও বিচার দফতরের মন্ত্রী হন৷ নবীনকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হবে বলেও অনুমান করা হচ্ছিল৷
এমন অনুমানের কারণ অবশ্য তার প্রতি অমিত শাহের অত্যধিক স্নেহ ৷ গত ২৫ অক্টোবর ছটপূজায় নবীনের বাসভবনে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন শাহ৷ এর আগে তিনিই তাঁকে ছত্তিশগড়ের বিধানসভা নির্বাচনে ইনচার্জ হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। ৯০ আসনের বিধানসভায় ৫৪টি দখল করে কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন তিনি৷
নবীনের নিযুক্তিতে অভিনন্দন জানিয়ে মোদি বললেন, তিনি একজন পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ ৷ যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর৷ বিহারে তিনি বহুবার বিধায়ক হয়েছেন, ছিলেন মন্ত্রীও৷ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করে গিয়েছেন তিনি৷ অমিত শাহ বললেন, মানুষের মধ্যে থেকে কাজ করার বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে নবীনের ৷ তাঁর নিযুক্তির মধ্য দিয়ে দল যুবপ্রজন্মের কর্মীদের মধ্যে যারা দিনরাত কাজ করে চলেছেন, তাদের সম্মান জানিয়েছে দল।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত,ওইসব অতি ছেঁদো যুক্তি৷ আসলে নবীনকে বিজেপির শীর্ষ পদে অভিষিক্ত করে মোদি-শাহ দলের নিয়ন্ত্রণ আগামী দিনেও নিজেদের হাতে রাখতে চাইলেন। ওই বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা, এ নতুন নয়, ২০১৪ সাল থেকেই বিজেপি সভাপতি পদের মর্যাদা হ্রাস পেতে চলেছে ৷ ১৯৯০ থেকে মোদিভক্ত হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত অমিত শাহ সভাপতি হয়ে নরেন্দ্র মোদির রিমোটে দল চালিয়েছেন৷ পরে জেপি নাড্ডা এসেও দলকে মোদির নিয়ন্ত্রণ থেকে বার করতে পারেননি বা সে চেষ্টাও করেননি৷ এখন মোদি-শাহের বাছাই করা নবীনের কাছে খুব বেশি কিছু আশা করছেন না তাঁরা৷ বরং ওই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, মোদি-শাহ যাঁদের চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছিলেন, এবার যে তারা ছাঁটাই হবেন, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বিজেপি সভাপতি পদে গত কয়েক মাস ধরে যাদের নাম শোনা যাচ্ছিল, শীর্ষ নেতৃত্বের তালিকা থেকে বাদ পড়বেন তাঁরাও৷



