India & World UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story
জনদেবতা জগন্নাথ, লিখেছেন বকুলচন্দ্র নাথ

//বকুলচন্দ্র নাথ//
“রথস্থ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।”
এই শ্লোকটি বিভিন্ন শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্ত এর মূল উৎস হিসাবে ব্রহ্ম পুরাণ, স্কন্ধ পুরাণ,পদ্ম পুরাণ এবং কপিল সংহিতার মতো পুরাণ গুলিতেই বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়।
এই শ্লোকের অর্থ হচ্ছে, রথের উপর খর্বাকৃতি বামনরূপী শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবকে দর্শন করলে পুনর্জন্ম হয় না।
রথ এসে গেছে। আজ ১২ আষাঢ় ১৪৩২ সন শুক্রবার (২৭শে জুন ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ) শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এবারের রথযাত্রা। জগন্নাথদেব আমাদের জনদেবতা। তিনি শবরেরও দেবতা, রাজারও দেবতা। তিনি দারুব্রহ্ম। তিনি দ্রষ্টা পুরুষ। সাক্ষী পুরুষ। তিনি পুরুষোত্তম। তাঁর হস্ত পদাদি নাই। তিনি একই সঙ্গে স্থাবর ও জঙ্গম। ভক্তরাই তাদের প্রেম ও ভক্তির নয়নে তাঁর শ্রীশ্যামসুন্দর মুরলী বদন রূপে তাঁকে দর্শন করেন। রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে মহাপ্রভু জগন্নাথ নেমে আসেন রাজপথে তাঁর পরম প্রিয় ভক্তদের মধ্যে, তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে। ভক্তবৎসল ভগবান। ভক্তের দৃষ্টিতে ভক্তের বিশ্বাসে, জগন্নাথদেব ও শ্রীকৃষ্ণে কোনও ভেদ নেই। মহাপ্রভুর এই মূর্তি এক বিশেষ রসে স্নিগ্ধ করছেন। সেই রস হলো প্রেম ভক্তি মাধুর্য। সমাজতত্ত্ববিদদের চোখে, পুরুষোত্তম ভগবান জগন্নাথ হলেন এক অদ্ভুত প্রতিষ্ঠান। ওড়িশার এই শ্রীক্ষেত্রে অদ্ভুত এক সমন্বয় ঘটেছে — ধর্ম সমন্বয়। বৌদ্ধ, জৈন, শৈব, সৌর গাণপত্য ও বৈষ্ণব সব ধর্ম বিশ্বাস এক সমুদ্রে এসে মিলেছে। সেই সমুদ্রের নাম জগন্নাথ । সর্ব-ধর্ম সমন্বয়ের এমন একজন দেবতা আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে ওড়িশা, বঙ্গদেশ সহ বিশ্বের অনেক দেশে শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবের রথযাত্রা নানা অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে উদযাপন হয়। পশ্চিম বঙ্গের মাহেশের শতাব্দীপ্রাচীন রথযাত্রা এবং ইস্কন আয়োজিত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জগন্নাথের সুসজ্জিত রথযাত্রা ভক্তদের আকর্ষিত করছে বছরের পর বছর। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রা জগৎ বিখ্যাত। লক্ষাধিক ভক্তের সমাগমে অনুষ্ঠিত হয় পুরীর রথযাত্রা। তিনটি সুসজ্জিত রথে বলদেব, সুভদ্রা ও ক্ষেত্রাধিপতি জগন্নাথদেবকে নিয়ে পরম্পরাগত বিধিবিধান মেনে শুরু হয় রথযাত্রা।

পুরীধামকে পুরুষোত্তম ক্ষেত্র বলেও উল্লেখ করা হয়। এখানে মৃত্যু মানে মুক্তি। কারণ সাক্ষাৎ ভগবান দারুব্রহ্ম রূপে এখানে বিরাজ করছেন। জগন্নাথদেবকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ইতিহাস। গড়ে উঠেছে অর্থনীতি। রথের পরিকাঠামোগত দিক নিয়ে এরকম ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে : প্রভু জগন্নাথদেবের রথের নাম নন্দীঘোষ। ৮৩২টি কাঠ দ্বারা তৈরি। ১৬টি চাকা। এর রক্ষক হচ্ছেন গরুড় মহারাজ। ধ্বজায় বিরাজমান স্বয়ং হনুমান। দ্বারপাল জয়বিজয়। অনুরূপ ভাবে বলদেবের রথের নাম তালধ্বজ। ৭৬০টি কঠোর দ্বারা তৈরি। ১৬ টি চাকা। সুভদ্রা মহারাণীর রথের নাম দেবদলন। ৫৯৩টি কাঠের দ্বারা তৈরি। ১৪টি চাকা। রথে চড়ে ভক্তদের দর্শন দিয়ে চলেছেন মাসীর বাড়ি অর্থাৎ মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজার পত্নী গুণ্ডিচাদেবীর বাড়ি, তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে । রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবকে দারুব্রহ্ম রূপে নীলাচলে অর্থাৎ পুরীতে প্রতিষ্ঠা করে অপুত্রক হওয়ার একটা সাংঘাতিক বর প্রর্থনা করেছিলেন । কারণ তাঁর বংশের কেউ যেন শ্রীমন্দিরকে নিজের সম্পত্তি বলে দাবি করতে না পারে। শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব তথাস্ত বলে মহারাণী গুণ্ডিচাদেবীকে কথা দিয়েছিলেন, প্রতি বৎসর শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব আসবেন মাসীর বাড়ি, থাকবেন সাতদিন। অষ্টম দিবসে ফিরে যাবেন। আর একেই বলা হয় পূর্ণ যাত্রা।
শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর জীবনের শেষ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছিলেন নীলাচলে অর্থাৎ পুরীধামে।বেশিরভাগ সময়ই থাকতেন মহাভাবে। সাধন জীবনের চূড়ান্ত পর্যায় । গম্ভীরার একটি অপরিসর কক্ষে থাকতেন। লোকসমক্ষে আসতে চাইতেন না।
রথযাত্রার সময় বঙ্গদেশ থেকে অনেক ভক্ত দল বেঁধে আসতেন জগন্নাথ দর্শনে। তাঁদের দলপতি শিবানন্দ। দেখা করতেন শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গে।
খুব ভোরে স্নান করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীজগন্নাথ, বলদেব, সুভদ্রা মহারাণীর রথ দর্শন করতেন। এই অনুষ্ঠানটিকে বলা হত পাণ্ডুবিজয়। লক্ষীদেবীর অনুমতি নিয়ে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব রথে চড়ে রওয়ানা হলেন গুণ্ডিচা মন্দিরে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রথের অগ্রভাগে তাঁর ভক্তদের সাতটি সম্প্রদায়ে ভাগ করে চৌদ্দমাদলে কীর্তন আরম্ভ করলেন। রথাগ্রে মহাপ্রভু উদ্দণ্ড নৃত্য করে চলেছেন। ভক্তরা ভিড় সামলাতে প্রভুকে ঘিরে রয়েছেন, যাতে প্রভুর নৃত্যের ব্যাঘাত না হয়, তাঁর পবিত্র দেহে কোনও আঘাত না লাগে। মহাপ্রভু ভাবে দর্শন করছেন দারুব্রহ্মে তাঁর অনিন্দ্যরূপ সঙ্গে দরবিগলিত নয়ন ও স্তোত্র পাঠ।
হর ত্বং সংসারং দ্রুততরমসারং সুরপতে
হর ত্বং পাপানাং বিততিমপরাং যাদবপতে।
অহো দীননাথং নিহিতচরণো নিশ্চিতমিদং
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।।
হে সুরপতে! অতি শীঘ্র আমাকে এ অসার সংসার থেকে উদ্ধার কর,হে যদুপতে! আমার দুঃসহ পাপভার বিমোচন কর। অহো! দীন ও অনাথ ব্যক্তিগণকে যিনি নিশ্চিতরূপে নিজ শ্রীচরণ সমর্পণ করে থাকেন, সেই প্রভু জগন্নাথদেব আমার নয়নপথের পথিক হোন।
চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। ভক্তির এমন প্রকাশ এমন উচ্ছ্বাস এ চরাচরে বিরল।
মহাপ্রভুকে পুরীর শ্রীমন্দিরে, শুধু শ্রীমন্দিরে নয় এই শ্রীক্ষেত্রে আজও দেখা যায়– যিনি দেখতে চান।
“অদ্যাবধি সেই লীলা করে গৌররায় ,
কোন কোন ভাগ্যবান দিখিবারে পায়।”
জগন্নাথমন্দিরের ভিতরে প্রবেশদ্বারে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর আজানুলম্বিত হাত প্রসারিত করে। দুই চোখে বইছে প্রেমাশ্রু। তাঁর অতি মৃদু ও সুরেলা কণ্ঠে অবিরাম গীত হচ্ছে সেই আকুল প্রার্থনা-
জগন্নাথ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।
তথ্যসূত্র: রত্নাকর শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত ও আন্তর্জাল।



