India & World UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

এপস্টেইন ফাইল ও পশ্চিমা নৈতিকতার স্বরূপ, লিখেছেন মাহতাব মুহাম্মদ

//মাহতাব মুহাম্মদ//

পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের মানবাধিকার, নারী অধিকার, শিশু সুরক্ষা ও নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তারা প্রায়ই ‘সভ্যতা বনাম বর্বরতা’, ‘মানবিকতা বনাম নৃশংসতা’, ‘নারী অধিকার বনাম ইসলাম’ কিংবা ‘আইনের শাসন বনাম স্বৈরতন্ত্র’ এই দ্বান্দ্বিক বয়ানের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

 

কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি মোড়েই দেখা যায়, তাদের এই নৈতিকতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ক্ষমতা, লোভ, শোষণ ও নৈতিক দ্বৈতনীতির এক ভয়ংকর জগৎ। জেফরি এপস্টেইনকাণ্ড সেই গোপন জগতের দরজায় সবচেয়ে ভয়াবহ ধাক্কা দিয়েছে, যেখানে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা পশ্চিমারা শিশু নির্যাতন, মানব পাচার ও যৌন শোষণের মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আর তথাকথিত সভ্য রাষ্ট্রগুলো তা ঢেকে রাখার ক্ষেত্রে চাতুর্যের আশ্রয় নিয়েছে। ফাঁস হওয়া এপস্টেইন ফাইলস পশ্চিমাদের নৈতিক অবক্ষয় ও সভ্য সাজার মুখোশ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।

 

এপস্টেইনকাণ্ড কেবল একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি একটি ব্যবস্থাগত সংকট। জেফরি এপস্টেইনকে অনেকেই একজন ধনী যৌন অপরাধী হিসেবে জানেন। কিন্তু এপস্টেইন ছিলেন তারচেয়েও বেশি কিছু। তিনি ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানকারী এক ‘গেটকিপার’, যিনি রাজনীতি, অর্থনীতি, রাজপরিবার, নাস্তিক-সেক্যুলার কমিউনিটি, ধর্মবিদ্বেষী বিজ্ঞানী এবং মিডিয়া ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে যুক্ত ছিলেন।

 

নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, নিউ মেক্সিকো, প্যারিস ও ক্যারিবীয় দ্বীপে তার বিলাসবহুল সম্পত্তিগুলো কেবল ব্যক্তিগত ভোগবিলাসের স্থান নয়, বরং ক্ষমতাবানদের গোপন মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল, যেখানে নৈতিকতা ও আইন থমকে যেত। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় শিশু যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এপস্টেইন মাত্র ১৩ মাসের একটি ‘কাজের দিনভিত্তিক’ সাজা পান, যেখানে তিনি বেশিরভাগ সময় বাইরে কাজ করতে পারতেন কিংবা কারাগারের ব্যক্তিগত শাখায় কাটাতে পারতেন।

 

এই অবিশ্বাস্য রায় কোনো বিচ্ছিন্ন ভুল ছিল না বরং এটি ছিল একটি পরিকল্পিত আইনি রক্ষাকবচ। প্রসিকিউশন চুক্তির মাধ্যমে তাকে ফেডারেল অভিযোগ থেকে রক্ষা করা হয়, যা ভুক্তভোগীদের না জানিয়েই সম্পন্ন হয়েছিল। এটি ছিল আইনের শাসনের মুখোশের আড়ালে ক্ষমতার শাসনের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

 

এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা যতই উন্মোচিত হতে থাকে, ততই পরিষ্কার হয় এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ চক্র নয় বরং একটি বৈশ্বিক ক্ষমতার নেটওয়ার্ক। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের শীর্ষ ধনকুবের বিল গেটস, ইলন মাস্ক, নাস্তিক বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, নাস্তিকদের কাছে পরম পূজনীয় বিবর্তনবাদী রিচার্ড ডকিন্স, নাস্তিক পদার্থবিদ লরেন্স ক্রাউস, নাস্তিক ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কি, ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বহু একাডেমিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বের নাম বারবার উঠে এসেছে এপস্টেইনের নথি, সাক্ষ্য ও সাক্ষাৎকারে।

 

এখানে প্রশ্নটি কেবল কে এপস্টেইনের সঙ্গে ছবি তুলেছেন বা তার বিমানে চড়েছেন তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কীভাবে এত ক্ষমতাবান, নারী অধিকার-মানবাধিকারের বয়ান দিয়ে বেড়ানো ইসলামবিদ্বেষী মানুষগুলো একটি শিশু নির্যাতনকারীকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, এমনকি ‘এলিট সার্কেল’-এর অংশ বানিয়ে রেখেছিলেন? কীভাবে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ ও মিডিয়া একযোগে এই অপরাধ নেটওয়ার্ককে বছরের পর বছর কার্যকরভাবে আড়াল করেছে? এটি ক্ষমতার সেই পুরোনো সূত্রকে আবার সামনে আনে, ক্ষমতা নিজেকে রক্ষা করে আর ক্ষমতাবানরা রক্ষা করে একে অন্যকে।

 

পশ্চিমা গণতন্ত্রে যাকে বলা হয় ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’, এপস্টেইনকাণ্ডে তা পরিণত হয়েছে ‘চেক অ্যান্ড প্রোটেক্ট’-এ। এই কুখ্যাত পেডোফাইল যৌন অপরাধী এপস্টেইনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার থেকে, যা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে। সরকারিভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও এর চারপাশে এত প্রশ্ন ও অসংগতি রয়েছে যে এটি পশ্চিমা বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এপস্টেইনের মৃত্যুকালে কারাগারের ক্যামেরা অকেজো ছিল, রক্ষীরা নিয়মমাফিক পর্যবেক্ষণ করেননি, সেলে সহবন্দি ছিল না, সব মিলিয়ে এটি যেন রহস্য, সংশয়, সন্দেহ, অবিশ্বাস ও ব্যর্থতার একটি সমন্বিত নাট্যরূপ।

 

এই মৃত্যু কেবল একজন অভিযুক্ত অপরাধীর পরিণতি নয়; এটি ছিল বহু সম্ভাব্য সত্যের মৃত্যু। কারণ এপস্টেইন বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি এমন অনেক নাম প্রকাশ করতেন, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাজকীয় কাঠামোর ভিত্তিকেই কাঁপিয়ে দিত। তার মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে কারা? ভুক্তভোগীরা নয়, সাধারণ মানুষ নয়, ন্যায়বিচার নয়Ñ বরং সেই ক্ষমতাবান গোষ্ঠী, যাদের নাম তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে পারত।

 

এখানেই পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থার ভয়ংকর দ্বৈতনীতি উন্মোচিত হয়। যখন অন্য কোনো দেশে বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা ঘটে, ইসলামি শরিয়াহ আইনমাফিক কোনো বিচার সম্পন্ন হয়, তখন পশ্চিমা মিডিয়া ও সরকারগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সোচ্চার হয়। দিন-রাত নারীর অধিকার, মানবাধিকারের বয়ান তুলে ইসলামকে কোণঠাসা করার কাজে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু যখন তাদের নিজেদের ঘরেই এমন একটি বর্বর কাণ্ড ঘটে, তখন তারা সেটিকে ‘প্রশাসনিক ত্রুটি’ বা ‘দুঃখজনক দুর্ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করে দায় এড়াতে চায়।

 

এদিকে এপস্টেইনকাণ্ডে মূলধারার পশ্চিমা মিডিয়ার ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। শুরুতে কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও দ্রুতই বিষয়টি মিডিয়া এজেন্ডা থেকে সরে যেতে থাকে। এপস্টেইনের মৃত্যুর পর কয়েক সপ্তাহ আলোচনা চললেও তার নেটওয়ার্ক, সহযোগী ও কাঠামোগত দায় নিয়ে গভীর অনুসন্ধান প্রায় থেমে যায়। এখানে মিডিয়ার স্বাধীনতার সেই বিখ্যাত পশ্চিমা দাবির মুখোশ খসে পড়ে। বাস্তবে দেখা যায়, পশ্চিমা বড় মিডিয়া করপোরেশনগুলো ইসলামোফোবিক। তারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিজ্ঞাপন, করপোরেট স্বার্থ, রাজনৈতিক অ্যাক্সেস এবং জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে তারা এমন বিষয়গুলোকে সীমিত পরিসরে আটকে রাখে, যা ক্ষমতার কাঠামো ও বিশেষ গোষ্ঠীকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।

 

এটি একটি বৃহত্তর সমস্যার অংশ যাকে বলা যায় ‘নিয়ন্ত্রিত সত্য’। পশ্চিমা সমাজ ও দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের জনগণকে সত্য থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা হয় না বরং তাদের এমনভাবে সীমিত ও পরিমিত সত্য দেওয়া হয়, যাতে তারা মূল কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে। এপস্টেইনকাণ্ডে জনগণ জানে যে একটি অপরাধ ঘটেছে কিন্তু জানে না সেটি কীভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে প্রোথিত ছিল।

 

পশ্চিমা বিশ্ব প্রায়ই মানবাধিকার, নারী অধিকার ও শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে অন্য দেশগুলোকে নৈতিক উপদেশ দেয়। আন্তর্জাতিক ফোরাম, জাতিসংঘ, এনজিও ও মিডিয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের ‘নৈতিক অভিভাবক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। পাশাপাশি রিচার্ড ডকিন্স, লরেন্স ক্রাউস, স্টিফেন হকিংদের মতো সেক্যুলার, সংশয়বাদী নাস্তিকরা ইসলামে নারীর অধিকার, নবী ও শরিয়াহ আইন নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে, মিথ্যাচার করে মানবাধিকারের ছবক দিয়ে বেড়ালেও নিজেরা এপস্টেইনের মতো পেডোফাইল যৌন অপরাধীর আতিথ্য গ্রহণ করতে কোনো কার্পণ্য করেননি।

 

এপস্টেইনকাণ্ড এটাই দেখিয়ে দেয়, পশ্চিমা বিশ্ব ও তথাকথিত সেক্যুলার মানবতাবাদীদের নৈতিক অবস্থান কতটা ভঙ্গুর, সুবিধাবাদী ও ছলচাতুরীপূর্ণ। যদি সত্যিই শিশু সুরক্ষা ও নারীর মর্যাদা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কাছে অগ্রাধিকার পেত তবে এপস্টেইনের মতো একজন ব্যক্তিকে এত বছর ধরে রক্ষা করা সম্ভব হতো না। যদি সত্যিই মানবাধিকার তাদের নীতির কেন্দ্রবিন্দু হতো তবে ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও অভিযোগ এত সহজে উপেক্ষিত হতো না।

 

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মানবাধিকার সেখানে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে তা ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুবিধা বা রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, যেখানে মুসলিম ও ইসলাম ধর্মকে মানবাধিকার ও নারীর অধিকারের অজুহাতে কোণঠাসা করা যাবে। এই দ্বৈতনীতি শুধু এপস্টেইনকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরাকযুদ্ধ, আফগানিস্তান দখল, গুয়ান্তানামো বে, মধ্যপ্রাচ্যে হামলা, পুলিশি সহিংসতা, অভিবাসী নির্যাতন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায় পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো নিজেরা যে নীতির প্রচার করে, নিজেরাই তা নিয়মিত লঙ্ঘন করে। এপস্টেইনকাণ্ড এই দ্বৈতনীতির সবচেয়ে নগ্ন ও নৈতিকভাবে ঘৃণ্য উদাহরণগুলোর একটি।

 

অনেকে ভাবতে পারেন এপস্টেইনকাণ্ড তো পশ্চিমা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়; দক্ষিণ এশিয়া বা বাংলাদেশের মানুষের এতে আগ্রহ দেখানোর কী আছে? কিন্তু বাস্তবে এ ঘটনায় আগ্রহ থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোই বিশ্বব্যাপী নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে, উন্নয়ন সহায়তা, মানবাধিকার প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে অন্য দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

 

তাই যখন সেই রাষ্ট্রগুলো নিজেরাই এমন ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের নৈতিক কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তখন উন্নয়ন, গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের নামে দেওয়া পশ্চিমাদের উপদেশ আর নিছক নীতিগত ব্যাপার থাকে না বরং তা হয়ে ওঠে চূড়ান্ত ভণ্ডামির দৃষ্টান্ত।

 

তাই এপস্টেইনকাণ্ড আমাদের শেখায়, কোনো রাষ্ট্র বা পশ্চিমা সভ্যতাকে অন্ধভাবে নৈতিক আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক। আমাদের প্রয়োজন নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ড, নিজস্ব বিচারবোধ ও নিজস্ব সমালোচনামূলক চেতনা, যা কোনো ভূরাজনৈতিক ব্লকের ওপর নির্ভরশীল নয়।

 

আরও শেখায়, পশ্চিমাদের মানবাধিকার, নারী অধিকার, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার বুলি কেবল মুখোশ, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে শোষণ, অপরাধ ও দ্বৈতনীতি। এই কাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতা কেবল প্রযুক্তি, অর্থনীতি বা সামরিক শক্তিতে মাপা যায় না বরং তা মাপতে হয় একটি সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্যদের কীভাবে রক্ষা করে এবং ক্ষমতাবানদের কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনে, তা দিয়ে।

 

(সৌজন্যে : সময়ের আলো)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker