Barak UpdatesHappeningsBreaking News

আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ও অসম চুক্তি: সমাজ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া

ওয়েটুবরাক, ২২ মে : গত ১৯ মে তারিখে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ভাষাশহিদ দিবসের অনুষ্ঠানে অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তী বলেছিলেন, অসম চুক্তির ফলেই বরাক উপত্যকায়  আসাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

এ নিয়ে সমাজ মাধ্যমে দুদিন ধরে লেখালেখি চলছে। এর মধ্যে কয়েকজনের লেখা এখানে তুলে ধরা হলো।

//ধর্মানন্দ দেব //

আপনি অধ্যাপক, আপনি বুদ্ধিজীবী, আপনি প্রভুভক্ত—তাই আপনি সমন্বয়ের বার্তা নিয়ে এসেছেন। ভালো কথা। তবে সেই বার্তা বরাক উপত্যকায় নয়, বরাক উপত্যকার বাইরে বিক্রি করুন। বরাক উপত্যকা সমন্বয়ের পাঠশালা নয়।

এই ভূমি রক্ত দিয়ে, আত্মবলিদানে শিখিয়েছে —কীভাবে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা রক্ষার জন্য লড়াই করতে হয়।

বরাককে সমন্বয় শেখানোর ধৃষ্টতা দেখাবেন না।

সমন্বয় শুধু বরাকে কেন? কারণ বরাক উর্বরভূমি? আপনারা ক্ষেত খুঁজছেন, যেখানে লাঙল চালিয়ে ‘সমন্বয়’ নামে ফসল ফলাবেন? — এটা হবে না। বরাক মাঠ নয়, আর বরাকবাসীও চাষের গরু নয়।

 এই জমিতে আপনার মতাদর্শের বীজ ফলানোর অধিকার আপনাদের কেউ দেয়নি। প্রয়োজনে গোপাল কৃষ্ণ গোখলের সেই উক্তি মনে করিয়ে দিতে হবে কি আজ আবার ? আপনাদের উদ্দেশ্য বাস্তব রূপ দিতে চাইছেন — লক্ষ্য করছেন সেই অঞ্চলগুলোকে, যাদের প্রতিরোধ দুর্বল বলে মনে হয়। আপনাদের এই গোপন এজেন্ডা বরাকবাসী বুঝে ফেলেছে। মনে রাখুন — ইতিহাস চুপচাপ থাকলেও ভুলে না। লিখে রাখুন — আপনার ভবিতব্যও সেই প্রাক্তন বাঙালি বিধায়কের মতোই হবে, যিনি নিজের শিকড় ভুলে প্রভুদের খুশি করতে গিয়ে আজ সমাজে এক তুচ্ছ নাম হয়ে রয়েছেন।

বরাকবাসীর যেসব দালালদের সৌজন্যে আজ এই অপমান আমাদের সহ্য করতে হচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এক দুর্নীতিপরায়ণ নেতা দূর থেকে এই নাটক মঞ্চস্থ করাচ্ছেন—সাবধান আপনিও! বরাকবাসী এখন জেগে উঠছে। বরাকের মানুষ ক্ষমা করতে জানে, কিন্তু ভুলে না। সময় এলে জবাব দেয়—কড়া ভাষায়, কঠিনভাবে, অমোচনীয়ভাবে।

//কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য //

কত দিন ধরে বরাক উপত্যকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি চলে আসছে! ১৯৭৭ সালে,আমরা যখন গ্রাজুয়েশন করি-তখন (এর আগে থেকেই দাবি ছিল) আমরা তদানীন্তন কাছাড় জেলার বিধায়ক, সাংসদদের কাছে বরাক উপত্যকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য মেমোরেন্ডাম দিয়েছিলাম। পরবর্তী সময়েও এই দাবি আরও জোরদার হতে থাকে, বিভিন্ন মহল থেকে দাবি সোচ্চার হয়। তারই ফসল এই বিশ্ববিদ্যালয়।প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি, আমরা যখন ১৯৭৭-১৯৭৯–সময়ে আমাদের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করছিলাম গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তখন আসাম আন্দোলনের জন্য আমাদের শিক্ষাবর্ষ একবছর পিছিয়ে যায়। আমরা তদানীন্তন কাছাড় জেলার সব ছাত্রছাত্রী মিলে একটি কমিটি গঠন করেছিলাম এবং আমাদের কয়েকটি মিটিংও হয়েছিল । খুব সম্ভবত কাছাড় কলেজে। আমি সেই কমিটির কনভেনার ছিলাম।আমাদের ভবিষ্যৎ তখন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়েছি। ফলে আমরা একটি প্রস্তাব গ্রহণ করি এবং অচিরেই কাছাড় জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার দাবি নিয়ে তৎকালীন সাংসদ এবং বিধায়কদের কাছে গিয়ে এই দাবি রাখি। এই প্রসঙ্গে দুজন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, যাঁদের সঙ্গে আমরা দেখা করে এই প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম, তাঁদের নাম আমি উল্লেখ করতে চাই। একজন আমাদের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ শ্রদ্ধেয় নুরুল হুদা এবং আরেকজন সাংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রদ্ধেয় রাণা দেব। তাঁরা দুজনেই খুব সংবেদনশীলতার সঙ্গে আমাদের প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছিলেন।

//রাজু দাস//

বরাকের মানুষের আন্দোলন, আত্মত্যাগকে ছোট করার প্রয়াস? বরাকের মানুষ ইতিহাস গড়তে এখনও ভুলেনি, তাই সাধু সাবধান—

১৯ মে, ভাষা শহিদ দিবসে শিলচরে অনুষ্ঠিত এক আলোচনাসভায় উঠে এসেছে এক বিতর্কিত মন্তব্য, যা বরাক উপত্যকার ইতিহাস ও আবেগকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন এক বাঙালি সংগঠনের শীর্ষ নেতা ও গুয়াহাটির এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ভাষাশহিদদের স্মরণে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় নাকি অসম চুক্তির ফল! সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে অসমিয়া ভাষা বিভাগ খোলারও দাবি জানান ইতিহাস বিকৃত করে বরাক উপত্যকার মানুষ এবং তাঁর গণ-আন্দোলনকে ছোট করার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রয়াসে ওই আমন্ত্রিত বক্তা ।

এই মন্তব্য বরাক উপত্যকার বহু মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। কারণ, এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ভুল নয়, বরং এই অঞ্চলের সংগ্রামের ইতিহাসকে ছোট করে দেখানোর প্রচেষ্টা হিসেবেই ধরা যায়।

শহরের বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রণবানন্দ দাশ মহাশয় ইতিমধ্যেই সেই বক্তাকে মনে করিয়ে দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লিখতে গিয়ে লিখেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি কোনও রাজনৈতিক চুক্তির ফসল নয়। এটি ছিল বরাক উপত্যকার দীর্ঘদিনের গণআন্দোলনের সাফল্য, যার প্রেরণা ছিল ১৯৬১ সালের ১৯ মে ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগ। যে চেতনা থেকে বরাকবাসী অধিকার আদায়ের সাহস ও প্রেরণা পেয়েছিল, সেই চেতনার ধারক হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন।

বিভিন্ন সময়ে দাবি তোলা হয়, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অসমিয়া ভাষা পড়ানো হয় না। বাস্তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিফু ক্যাম্পাসে বহু বছর আগেই অসমিয়া বিভাগ চালু হয়েছে। কাজেই, এই অভিযোগ যে তথ্যভিত্তিক নয়, তা সহজেই প্রমাণযোগ্য।

এদিকে বক্তব্যদাতা যে হঠাৎ করে এসব বলেননি, তা স্পষ্ট হয়েছে তাঁর পরদিনের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে। সেখানে তিনি সর্বানন্দ সোনোয়ালের একটি বক্তব্যের সূত্র দিয়ে দাবি পুনরায় করেছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে —একটি অঞ্চলভিত্তিক গণআন্দোলনের ইতিহাসকে কি কোনও রাজনীতিকের মন্তব্যের ভিত্তিতে ঢেকে দেওয়া যায়?

বরাক উপত্যকার মানুষ ইতিহাস জানেন। তাঁরা জানেন কিভাবে রক্ত, আত্মত্যাগ ও দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। তাই বাইরের কোনো স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী এসে সেই ইতিহাসের পাঠ তাঁদের দিতে পারেন না—বিশেষ করে ঊনিশের পবিত্র দিনে।

উক্ত আলোচনায় বক্তা অসম আন্দোলনের শহিদদের স্মরণ করেন, অথচ ১৯৬১ সালের আগে ও পরে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাঙালিদের ওপর ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় ঘটনার কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন। সেই স্মৃতি বরাকবাসীর হৃদয়ে আজও অমলিন। বর্বরতা, দাঙ্গা, নিপীড়নের সেই ইতিহাস ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

 সব বিষয় একত্রিত করে,একটি প্রশ্নে ওঠে আসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে —স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ঊনিশে মে-র মতো এক তাৎপর্যপূর্ণ দিনে, ভাষাশহিদদের স্মরণে, এমন একজনকে কীভাবে আমন্ত্রণ জানানো হল যাঁর বক্তব্য এই অঞ্চল এবং নিজ রক্তের বিনিময়ে বক্ষে ধারণ করা আন্দোলনকে আঘাত করে? বরাক বা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় কি এমন কোনও বাঙালি শিক্ষাবিদ ছিলেন না যাঁরা আরও সংবেদনশীল, ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ বক্তব্য রাখতে পারতেন?

সমন্বয় বরাক উপত্যকার মানুষ সর্বদা চায়। কিন্তু তা ইতিহাস বিকৃতির বিনিময়ে নয়। বরাকের মানুষ শান্ত, সহনশীল, কিন্তু আত্মসম্মানহীন নন। ভাষার জন্য তাঁদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে রক্ত দিয়ে। সেই ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না। বরং এমন অপচেষ্টা আগামীতে আরও প্রতিরোধ তৈরি করবে।

শেষে একটি কথা বক্তার জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি— বরাক দেখছে, শুনছে, স্মরণ করছে এবং প্রয়োজনে আবারও সাড়া দেবে, শান্ত, দৃঢ় প্রয়োজনে বুক পেতে । বরাকের মানুষের রক্তে আন্দোলন প্রতিবাদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এখনো সজীব,সতেজ আছে। তাই সাধু সাবধান….

//শান্তনু সূত্রধর//

১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলন এবং শিলচরে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আন্দোলনের মধ্যে যোগসূত্র খুবই গভীর। যারা এটিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে তারা উপত্যকার মানুষের অনুভূতি নিয়ে খেলছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker